শিক্ষা গবেষক ও উদ্যোক্তা ফারহানা মান্নান বিশ্বাস করেন, শিশুর শেখার শুরু হয় খেলাধুলা থেকে। নিজের সন্তানদের অনুপ্রেরণায় তিনি গড়ে তুলেছেন ‘শৈশব লার্নিং সেন্টার’। শিক্ষা ও শিশু বিকাশ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও দর্শন সম্প্রতি এক আলাপচারিতায় তুলে ধরেছেন তিনি।
শৈশব মানে শুধু বয়স নয়, এক ধরনের বেড়ে ওঠার অনুভূতি। যেখানে খেলা, কৌতূহল, ভালোবাসা আর শেখা মিলেমিশে একাকার হয়। এই দর্শন নিয়েই কাজ করছেন ফারহানা মান্নান; ‘শৈশব লার্নিং সেন্টার’-এর প্রতিষ্ঠাতা। শিক্ষা গবেষক ও লেখক হিসেবে তিনি বিশ্বাস করেন, ‘খেলাই হলো শিশুর শেখার সবচেয়ে প্রাকৃতিক মাধ্যম।’ বিশেষ করে স্পিচ ডিলে, অটিজম বা এডিএইচডিতে থাকা শিশুদের জন্য তিনি তৈরি করেছেন এক ভিন্ন ধরনের শিক্ষাঙ্গন। যেখানে শেখার শুরু হয় খেলার ছলেই।
অনুপ্রেরণার শুরু
ব্যক্তিগত বেড়ে ওঠার গল্প বলতে গিয়ে ফারহানা মান্নান ফিরে গেলেন শৈশবে। “আমি মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছি। বাবা ছিলেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র, মা সংসার পরিচালনায় পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছেন। আমাদের বাড়িতে ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক আবহ- বাবা গিটার বাজাতেন, মা গান গাইতেন। বোন গান শিখেছে, এরপর ভাই গিটার শিখেছে। আমাদের বাসায় ছোট একটা লাইব্রেরি কর্নার ছিল, নাম ‘মনন’। হয়তো বই পড়ার সেই অভ্যাসই আমার মধ্যে চিন্তার বীজ বপন করেছিল” বললেন তিনি।
তবে শিশুদের নিয়ে কাজ করার ভাবনা তখনো আসেনি। সেটা আসে জীবনের এক গভীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। ‘আমার দুই মেয়ে- চিনি ও মধু; আমার অনুপ্রেরণা। ওদের সঙ্গে খেলা, ওদের খেলা দেখা, এই ছোট ছোট মুহূর্ত থেকেই আমার মনে প্রশ্ন জাগে, শিশুর খেলা নিয়ে আমরা কি যথেষ্ট ভাবি?’
‘শৈশব লার্নিং সেন্টার’-এর জন্ম
প্রায় তিন বছর আগে যাত্রা শুরু হয় শৈশব লার্নিং সেন্টারের। তবে এর বীজ রোপিত হয়েছিল আরও আগে। ‘কোভিডের সময় অনলাইনে শিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। তারপর মনে হলো- একটা জায়গা দরকার যেখানে শিশুরা খেলবে, আর সেই খেলাতেই থাকবে শেখার আয়োজন। তাই ফিজিক্যাল সেন্টার করার সিদ্ধান্ত নিই।’
তিনি বলেন, ‘আমরা খেলার মাধ্যমে শিক্ষা (Play-based Learning) ধারণাটাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছি। এখানে শিশুর ভাষা, সামাজিকতা, আবেগ, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সবকিছুর সমন্বয় হয়। শহরে শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার জায়গা নেই। মাঠ আছে, কিন্তু মেয়েদের বা বিশেষ শিশুদের দেখা যায় না। তাই আমরা এমন একটি পরিসর তৈরি করেছি, যেখানে দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা পরিবারসহ খেলতে পা রে।’
খেলতে খেলতে শেখা
শৈশব লার্নিং সেন্টারে খেলার মধ্য দিয়েই শেখানো হয় বিজ্ঞান, শিল্প, ভাষা ও সামাজিক দক্ষতা। ‘আমরা STEAM (Science, Technology, Engineering, Art & Mathematics) ভিত্তিক লার্নিং অ্যাপ্রোচ ব্যবহার করি’ জানান ফারহানা মান্নান।

“প্রতিটি প্রোগ্রামই এমনভাবে ডিজাইন করা যে, শিশুরা প্রশ্ন করতে শেখে, পর্যবেক্ষণ করে, নতুন কিছু ভাবতে শেখে। এমনকি অভিভাবকরাও আমাদের সঙ্গে অংশ নেন। শুক্রবার ও শনিবার আমরা ‘প্যারেন্ট-চাইল্ড প্লে সেশন’ রাখি, যাতে বাবা-মা শিশুর শেখার অংশ হন।”
চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
একটি নতুন ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করা সব সময় সহজ নয়। ‘খেলার মাধ্যমে শেখা এই কনসেপ্টটা প্রথমে সবাই বুঝতে পারেনি। অনেকে বলত, খেলবে নাকি পড়বে! অভিভাবক কেন খেলায় অংশ নেবে? কিন্তু ধীরে ধীরে আমরা বুঝিয়েছি, শেখার প্রক্রিয়া শুরু হয় খেলাতেই’ বললেন ফারহানা। তবে বড় কোনো বাধার মুখে পড়তে হয়নি। বরং তিনি বললেন, ‘আমি সব সময় আমার কাজকে ব্যক্তিগত লাভ বা ব্যবসায়িক জায়গা থেকে দেখি না। আমার লক্ষ্য শিশুদের জন্য কাজ করা। তারা যদি শিখে, আত্মবিশ্বাসী হয়, সেটাই আমার সাফল্য।’
অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া নিয়েও তিনি আশাবাদী। ‘অনেক অভিভাবকই শুরুতে বুঝতে পারেন না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরো বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেন। তাছাড়া অনেকেই তাদের সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত থাকেন। মনে করেন, তাদের শিশু হয়তো পিছিয়ে আছে। কিন্তু এখানে এসে তারা দেখেন শিশুর ভেতরে আসলে কত সম্ভাবনা! একটু সুযোগ দিলেই ওরা ফুলে ফোটে। ওরা দেখেন কত রকমের খেলা! সুযোগ পেলে ওরা খেলার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে পারে।’
নারী উদ্যোক্তা হিসেবে অভিজ্ঞতা
নারী উদ্যোক্তা হিসেবে অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্নে ফারহানা মান্নান বিনম্রভাবে বলেন, “এখন পর্যন্ত বড় কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হইনি। আমার সবচেয়ে বড় সমর্থন এসেছে পরিবার থেকে। ‘শৈশব’-এর জায়গাটা আমি পারিবারিক পরিসরেই গড়ে তুলেছি।”
তার মতে, উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মনোভাব। ‘শিশুদের নিয়ে কাজ করতে হলে শেখার মানসিকতা থাকতে হবে। আগে নিজে শিখতে হবে, তারপর শেখাতে হবে। এখানে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে কাজ করতে হবে। কারণ শিশুর মানসিক জগৎ খুব সূক্ষ্ম, সংবেদনশীল।’

সাক্ষাৎকারের শেষে ফারহানা মান্নান বলেন, ‘আজকের শিশুই আগামী দিনের সমাজ তৈরি করবে। তাই শিশুর মানসিক বিকাশ, খেলা, আবেগ- এসব নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার সবারই দায়িত্ব। শিশুর হাসি যদি টিকিয়ে রাখতে পারি, তবেই আমরা সত্যিকারের উন্নত সমাজ গড়তে পারব।’
সর্বোপরি, ফারহানা মান্নানের মতো নারীরা আমাদের সমাজে এক আলোকবর্তিকা। যারা প্রমাণ করেন, শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জীবনের প্রতিটি খেলায়, প্রতিটি কৌতূহলে, প্রতিটি স্পর্শে লুকিয়ে আছে। শিশুর বিকাশ নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি শুধু একাডেমিক নয়, বরং গভীর মানবিক। ‘শৈশব লার্নিং সেন্টার’-এর মাধ্যমে তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা শুধু একটি শিক্ষাকেন্দ্র নয়, এটি এক ধরনের মানসিক বিপ্লব, যেখানে শেখা ও খেলা হাত ধরাধরি করে চলে। এমন নারী উদ্যোক্তারা সমাজে পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি, যারা নিজের অভিজ্ঞতাকে রূপ দেন সামাজিক দায়িত্বে। ফারহানা মান্নান আমাদের মনে করিয়ে দেন—একটি শিশুর হাসি, আত্মবিশ্বাস আর কৌতূহলই আগামী সমাজের ভিত্তি। তাই তার কাজের মূল বার্তা আমাদের সবার জন্য ‘শৈশবকে বুঝতে শিখুন, কারণ এখান থেকেই শুরু হয় ভবিষ্যৎ।’
/এস লুপিন
.jpg)