সমাজে বহু পুরোনো একটি বিতর্ক হলো–নারী বেশি বুদ্ধিমান, নাকি পুরুষ? চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি পারিবারিক আলোচনাতেও প্রায়ই এই প্রশ্ন উঠে আসে। কেউ বলেন পুরুষ যুক্তিবাদী, তাই তারা বেশি বুদ্ধিমান। আবার কেউ বলেন নারীরা একসঙ্গে অনেক কাজ সামলাতে পারেন, তাই তাদের মস্তিষ্ক বেশি কার্যকর।
কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, ‘কে বেশি বুদ্ধিমান’–এভাবে নারী ও পুরুষের মস্তিষ্ককে তুলনা করা আসলে সঠিক নয়। কারণ, বুদ্ধিমত্তা একমাত্রিক কিছু নয়। ভাষা দক্ষতা, আবেগ বোঝার ক্ষমতা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ, স্মৃতিশক্তি–সবকিছু মিলিয়েই মানুষের বুদ্ধিমত্তা গড়ে ওঠে। আর এই জায়গায় নারী ও পুরুষের মস্তিষ্ক ভিন্নভাবে কাজ করলেও, একজন অন্যজনের চেয়ে ‘কম’ বা ‘বেশি’ নয়। বরং তারা আলাদা শক্তির অধিকারী।
মস্তিষ্কের গঠন কি সত্যিই আলাদা?
বিভিন্ন স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণায় দেখা গেছে, গড় হিসাবে পুরুষের মস্তিষ্ক আকারে কিছুটা বড় হয়। তবে এর মানে এই নয় যে, পুরুষ বেশি বুদ্ধিমান। কারণ, মানুষের বুদ্ধিমত্তা মস্তিষ্কের আকার দিয়ে নির্ধারিত হয় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হাতির মস্তিষ্ক মানুষের চেয়েও বড়, কিন্তু তাই বলে হাতি মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান নয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মস্তিষ্কের কোন অংশ কীভাবে কাজ করছে এবং নিউরনের সংযোগ কতটা কার্যকর–সেটিই আসল বিষয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের মস্তিষ্কে ডান ও বাম অংশের মধ্যে যোগাযোগ তুলনামূলক বেশি সক্রিয় থাকে। ফলে তারা আবেগ, ভাষা ও যুক্তিকে একসঙ্গে সমন্বয় করতে দক্ষ হন। অন্যদিকে পুরুষদের মস্তিষ্কে সামনের ও পেছনের অংশের সংযোগ তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী হওয়ায় তারা নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর মনোযোগ ও বিশ্লেষণে পারদর্শী হন।
ভাষা ও আবেগে নারীরা এগিয়ে
ছোটবেলা থেকেই দেখা যায়, মেয়েরা তুলনামূলক দ্রুত কথা বলা শেখে এবং অনুভূতি প্রকাশে বেশি স্বচ্ছন্দ হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের মস্তিষ্কের ভাষা-সম্পর্কিত অংশ বেশি সক্রিয় থাকে। এজন্য তারা যোগাযোগ, সম্পর্ক রক্ষা এবং অন্যের আবেগ বোঝার ক্ষেত্রে সাধারণত বেশি দক্ষ হন।
অনেক নারী একই সময়ে পরিবার, অফিস, সন্তান, সামাজিক সম্পর্ক–সবকিছু সামলে নিতে পারেন। এটিকে অনেকেই ‘মাল্টিটাস্কিং’ দক্ষতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। যদিও বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ প্রকৃত অর্থে একই সময়ে একাধিক জটিল কাজ করতে পারে না; তবে নারীরা দ্রুত কাজ বদলাতে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে তুলনামূলক পারদর্শী।
এছাড়া আবেগ নিয়ন্ত্রণেও নারীদের দক্ষতা লক্ষ করা যায়। একজন মা সন্তানের কান্না, পরিবারের চাপ ও নিজের কাজ–সব একসঙ্গে সামলে নেন। এর পেছনে কাজ করে আবেগ ও যুক্তির সমন্বিত ব্যবহার।
বিশ্লেষণ ও স্থানিক দক্ষতায় পুরুষদের শক্তি
পুরুষদের ক্ষেত্রে গবেষণায় দেখা যায়, তারা সাধারণত স্থানিক চিন্তাতে ভালো করেন। যেমন–মানচিত্র বোঝা, রাস্তা মনে রাখা, জটিল যন্ত্র পরিচালনা কিংবা ত্রিমাত্রিক ধারণা বিশ্লেষণে তারা এগিয়ে থাকতে পারেন।
একই সঙ্গে অনেক পুরুষ দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট সমস্যার গভীরে মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন। প্রকৌশল, পদার্থবিজ্ঞান বা জটিল বিশ্লেষণধর্মী কাজে এই বৈশিষ্ট্য উপকারী হয়। তবে এর মানে এই নয় যে, নারীরা এসব ক্ষেত্রে পিছিয়ে। বর্তমানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় অসংখ্য নারী বিশ্বজুড়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সমাজের ধারণা বনাম বাস্তবতা
দীর্ঘদিন ধরে সমাজে ধারণা ছিল, পুরুষরাই বেশি মেধাবী এবং নেতৃত্বের যোগ্য। কারণ, নারীরা শিক্ষা ও কাজের সুযোগ কম পেয়েছেন। কিন্তু সুযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীরাও চিকিৎসা, বিজ্ঞান, রাজনীতি, ব্যবসা, প্রযুক্তি–সব ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। আবার অনেক সময় ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই ‘শক্তিশালী’ ও ‘যুক্তিবাদী’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়, আর মেয়েদের শেখানো হয় ‘নরম’ ও ‘সংবেদনশীল’ হতে। ফলে সামাজিক পরিবেশও নারী-পুরুষের আচরণ ও দক্ষতার পার্থক্য তৈরি করে।
আসলে নারী ও পুরুষের মস্তিষ্ক আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করে। একজন যেখানে বিশ্লেষণে দক্ষ, অন্যজন সেখানে আবেগ ও সম্পর্ক পরিচালনায় পারদর্শী হতে পারেন। পরিবার, সমাজ ও কর্ম ক্ষেত্রে এই ভিন্ন দক্ষতাগুলো একে অপরকে পরিপূরক করে।
একজন নারী যেমন পরিবারকে আবেগের বন্ধনে ধরে রাখেন, তেমনি একজন পুরুষও দায়িত্ব ও সুরক্ষার জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে এই ভূমিকাগুলো একে অপরের সঙ্গে বদলও হয়। আধুনিক সমাজে যোগ্যতা আর দক্ষতাই মূল বিষয়, লিঙ্গ নয়।
সুতরাং নারী না পুরুষ–কে বেশি বুদ্ধিমান, এই প্রশ্নের সরল কোনো উত্তর নেই। কারণ, মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক। বিজ্ঞান বলছে, নারী ও পুরুষের মস্তিষ্কের কাজের ধরনে কিছু পার্থক্য থাকলেও, বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে কেউ কারও চেয়ে কম নয়।
বরং প্রকৃতি নারী ও পুরুষকে আলাদা শক্তি দিয়ে তৈরি করেছে, যাতে তারা একসঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে পারে। প্রতিযোগিতা নয়, পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতাই মানবজীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
/এসএল
.jpg)