সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক সময় ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের জায়গা। এখন এটি মতপ্রকাশ, পেশাগত পরিচিতি তৈরি, ব্যবসা পরিচালনা এবং সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু এই একই জায়গা নারীদের জন্য প্রায়ই অপমান, কটূক্তি ও হয়রানির ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন হলো, অনলাইনে নারীরা কেন এত সহজ টার্গেট? এর উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু প্রযুক্তির দিকে তাকালে হবে না; দেখতে হবে সমাজ, সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার কাঠামোকেও।
অনেকেই মনে করেন, অনলাইন হয়রানি একটি নতুন সমস্যা। বাস্তবে এটি পুরোনো বৈষম্যেরই নতুন রূপ। সমাজে নারীদের পোশাক, চলাফেরা, পেশা বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্তব্য করার যে প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেটিকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
ক্ষমতার রাজনীতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন কটূক্তি অনেক সময় ক্ষমতার রাজনীতির অংশ। সমাজে যখন নারীরা শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন, তখন কিছু মানুষ সেটিকে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত অবস্থানের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।
ফলে নারীদের চুপ করিয়ে দেওয়া, আত্মবিশ্বাস নষ্ট করা কিংবা জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি উপায় হয়ে দাঁড়ায় অনলাইন আক্রমণ। এ কারণেই নারী সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, রাজনীতিবিদ কিংবা জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতারা তুলনামূলক বেশি ঘৃণামূলক মন্তব্যের শিকার হন।
অজ্ঞাত পরিচয়ের সাহস
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, অজ্ঞাত পরিচয়ে সক্রিয় থাকার সুযোগ। অনেকেই নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে কটূক্তি করেন। বাস্তব জীবনে যেটি বলার সাহস পান না, সেটিই অনলাইনে নির্দ্বিধায় লিখে ফেলেন।
মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে ‘অনলাইন ডিসইনহিবিশন’ বলে থাকেন। অর্থাৎ পর্দার আড়ালে থাকার কারণে মানুষ নিজের আচরণের সামাজিক দায়বদ্ধতা কম অনুভব করে। ফলে সহানুভূতি কমে যায় এবং আক্রমণাত্মক আচরণ বেড়ে যায়।
অ্যালগরিদম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সাধারণত বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া কনটেন্টকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। দুঃখজনকভাবে বিতর্ক, বিদ্বেষ ও উত্তেজনাপূর্ণ মন্তব্য অনেক সময় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বেশি সম্পৃক্ততা তৈরি করে।
ফলে একটি নারীবিদ্বেষী মন্তব্য বা অপমানজনক পোস্ট অল্প সময়ের মধ্যে হাজারও মানুষের সামনে পৌঁছে যায়। এতে শুধু একজন নারী নন, পুরো অনলাইন পরিবেশই নারীদের জন্য কম নিরাপদ হয়ে ওঠে।
অনেকের ধারণা, অনলাইনের মন্তব্যকে গুরুত্ব না দিলেই হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নিয়মিত কটূক্তি, অপমান বা হুমকির শিকার হলে উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। অনেক নারী নিজের মতামত প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে সরে যান। আবার অনেকের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত সম্পর্কেও পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনলাইন হয়রানি অনেক সময় ভার্চুয়াল জগতের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতেও রূপ নিতে পারে।
পরিবর্তন কোথা থেকে শুরু হবে?
অনলাইনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে সমানভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ঘৃণামূলক বক্তব্য শনাক্ত ও অপসারণে আরও কার্যকর হতে হবে। একই সঙ্গে নারীদের জন্য অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ ও নিরাপদ করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, অনলাইনে নারীদের বিরুদ্ধে কটূক্তিকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘মজা’ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ প্রতিটি অপমানজনক মন্তব্য শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, নারীদের জনপরিসরে অংশগ্রহণের অধিকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
/এসএল
.jpg)