তানিয়া পারভীন কিশোরগঞ্জের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশবের বড় একটি সময় কেটেছে বগুড়ায়, যেখানে তিনি প্রথম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরে পরিবারের সঙ্গে নিজ জেলা কিশোরগঞ্জে ফিরে সেখানেই বাকি শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিন বোনের মধ্যে বড় হওয়ায় পরিবারে দায়িত্ববোধ, শাসন আর ভালোবাসা–সবকিছুর সমন্বয়েই বড় হয়েছেন তিনি।
ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল একটি সরকারি চাকরি করার। সে লক্ষ্যেই পড়াশোনার পাশাপাশি কোচিং সেন্টার ও কিন্ডারগার্টেনে কাজও করেছেন। তবে জীবনের মোড় ঘুরে যায় বিয়ের পর–সেখান থেকেই শুরু হয় তার উদ্যোক্তা হওয়ার পথচলা।
শুরুর যাত্রা
তানিয়ার উদ্যোক্তা জীবনের শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ। বাবার দেওয়া ঈদের কেনাকাটার ৫০০০ টাকা দিয়ে তিনি কিনেছিলেন একটি সেলাই মেশিন। সেই ছোট্ট সিদ্ধান্তই আজকের বড় যাত্রার ভিত্তি।
প্রথমদিকে বড় কোনো বাধার মুখোমুখি না হলেও এক বছর পরই তিনি বুঝতে পারেন ব্যবসার বাস্তবতা। লোন-সংক্রান্ত জটিলতা এবং সঠিক বাজার খুঁজে পাওয়া–এ দুই চ্যালেঞ্জ তাকে ভাবিয়ে তোলে। বিশেষ করে দলিলের অভাবে ব্যাংক ঋণ না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।
তবে এ বাধাই তাকে আরও দৃঢ় করে তোলে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এমন অবস্থানে নিজেকে নিয়ে যাবেন যেখানে কোনো দলিল তার অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।
গার্মেন্ট থেকে নিজের ব্র্যান্ড
তানিয়ার বর্তমান সফলতার বড় অংশ জুড়ে আছে তার গার্মেন্ট উদ্যোগ। শুরুতে এটি তার স্বামীর এক্সপোর্টমুখী ব্যবসা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারিতে সব অর্ডার বাতিল হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন তারা। এ সংকটেই তিনি নতুন পথ খুঁজে নেন—এক্সপোর্ট ছেড়ে স্থানীয় বাজারে মনোযোগ দেন। বিভিন্ন পণ্যের মধ্যে লেডিস প্লাজো দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর তিনি পুরোপুরি এ পণ্যের দিকেই মনোনিবেশ করেন।

বর্তমানে তার কারখানায় প্রায় ১০ জন কর্মী কাজ করেন, যাদের বেশির ভাগই স্থানীয় নারী। কাটিং থেকে শুরু করে সেলাই, ফিনিশিং–সবকিছুই নিজস্ব কারখানায় সম্পন্ন হয়। উৎপাদনভিত্তিক পারিশ্রমিকের কারণে নারীরা নিজের সুবিধামতো কাজ করে আয় করতে পারছেন, যা তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়িয়েছে।
বাজারে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে তিনি সব সময় ক্রেতাদের সমস্যাকে গুরুত্ব দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি প্রশ্ন করে তিনি গ্রাহকদের চাহিদা বোঝেন এবং সে অনুযায়ী পণ্য উন্নয়ন করেন, যা তার ব্র্যান্ডকে আলাদা করেছে।
কৃষিভিত্তিক ও ফুড প্রসেসিং উদ্যোগ
গ্রামের পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে কৃষির প্রতি তার টান ছিল ছোটবেলা থেকেই। শহরে এসে তিনি দেখেন কৃষকরা অনেক সময় ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ফসল নষ্ট করতে বাধ্য হন। এই বাস্তবতা তাকে নাড়া দেয়।
পরবর্তী সময়ে কৃষি বিপণন অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি ফুড প্রসেসিং খাতে কাজ শুরু করেন। তার তৈরি জ্যাম, আচার, কুকিজ বা অন্যান্য পণ্যের মূল বৈশিষ্ট্য হলো–ফ্রেশনেস।
স্থানীয় জমি থেকে সংগৃহীত কাঁচামাল ব্যবহার করার কারণে তিনি পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারেন। বর্তমানে তিনি অনলাইনের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করছেন এবং অর্ডার পাওয়ার পরই প্রস্তুত করেন, ফলে পণ্য থাকে একদম তাজা।
ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ও হস্তশিল্প
তানিয়ার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ও হস্তশিল্প। ছোটবেলা থেকেই ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে কিছু তৈরি করার অভ্যাস ছিল তার। উদ্যোক্তা হওয়ার পর তিনি এটিকে একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসা হিসেবে দেখেন। তিনি মূলত পাটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ডেকোরেটিভ পণ্য তৈরি করছেন। পাট বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশবান্ধব উপাদান। এটি সহজে পচনশীল এবং পরিবেশের ক্ষতি করে না।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে, অন্যদিকে পাটচাষিদের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তানিয়ার মতে, কৃষি, পোশাক ও পাট–এ তিনটি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি, আর তিনি সেই ভিত্তির ওপর নতুনভাবে কাজ করছেন।
প্রশিক্ষণ ও সামাজিক অবদান
তানিয়ার সাফল্যের পেছনে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ বড় ভূমিকা রেখেছে। বিসিক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, এসএমই ফাউন্ডেশনসহ নানা প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় তিনি নিজের দক্ষতা বাড়িয়েছেন।
ইউনিসেফের অর্থায়নে একটি প্রকল্পে ‘মাস্টারক্রাফট পার্সন’ হিসেবে কাজ করার সময় তিনি ঝরে পড়া শিশুদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে মানবিকভাবে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমানে তিনি গাজীপুর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে হস্তশিল্প প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে সব বয়সের মানুষ পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। এ পর্যন্ত তিনি ১০০-এর বেশি নারীকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছেন, যাদের অনেকেই এখন নিজে আয় করছেন বা কর্মসংস্থানে যুক্ত।
নারী উদ্যোক্তার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
তানিয়ার মতে, একজন নারী মানেই প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া। বিশেষ করে ব্যবসার ক্ষেত্রে পুঁজি ও ঋণ পাওয়ার সীমাবদ্ধতা নারীদের বড় বাধা।
তবে তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। ঘরে বসেই ছোট উদ্যোগ শুরু করা সম্ভব, আর সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা এখন অনেক বেশি সহজলভ্য।
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য তানিয়ার বার্তা স্পষ্ট ‘শুরু করুন’। তার মতে, পথ নিজেই তৈরি হয়ে যায়, যদি ধৈর্য ও অধ্যবসায় থাকে। সমালোচনা, ব্যর্থতা–সবকিছুকে সঙ্গী করেই এগিয়ে যেতে হয়। কারণ, সফলতা কখনোই একদিনে আসে না।
তানিয়া পারভীনের গল্প তাই শুধু একজন উদ্যোক্তার গল্প নয়; এটি সাহস, ধৈর্য এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক অনন্য উদাহরণ।
/এসএল
.jpg)