সমাজে নারীদের নিয়ে নানা প্রচলিত ধারণা এখনো দৃঢ়ভাবে বিদ্যমান যেমন–নারীরা বড় প্রতিষ্ঠান চালাতে পারে না, প্রযুক্তিতে দক্ষ নয় কিংবা নেতৃত্বের আসনে তারা পিছিয়ে। এ ধারণাগুলোকেই ধারাবাহিকভাবে ভেঙে দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী সোনিয়া বশির কবির।
ঢাকায় জন্ম নেওয়া সোনিয়ার পথচলা শুরু হয়েছিল একেবারেই ভিন্ন পরিসরে। শৈশবে তিনি যেমন পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন, তেমনি ক্রীড়াক্ষেত্রেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন। জাতীয় পর্যায়ে ভলিবল খেলোয়াড় হিসেবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, যা তার দৃঢ়তা ও নেতৃত্বগুণের প্রাথমিক ইঙ্গিত বহন করে। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি ও সান্তা ক্লারা ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন।
ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি সিলিকন ভ্যালিতে কাজ করেছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যেমন সান মাইক্রোসিস্টেমস ও ওরাকলে। এই অভিজ্ঞতা তাকে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতাই দেয়নি, বরং বড় প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত পরিচালনা, ব্যবসা উন্নয়ন এবং নেতৃত্বের সূক্ষ্ম দিকগুলো শেখায়। এখানেই ভেঙে যায় সেই প্রচলিত ধারণা।
দেশে ফিরে সোনিয়া শুধু করপোরেট চাকরিতে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন একজন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী হিসেবে। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এসবিকে টেক ভেঞ্চারস, যা উদীয়মান প্রযুক্তি স্টার্টআপগুলোকে সহায়তা করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ উইমেন ইন টেকনোলজি গঠন করে নারীদের প্রযুক্তি খাতে এগিয়ে আসার পথ তৈরি করেন।
নারীরা বড় প্রতিষ্ঠান চালাতে পারে না–এ ধারণাকেও তিনি দৃঢ়ভাবে চ্যালেঞ্জ করেছেন। মাইক্রোসফট বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তিনি একাধিক দেশের দায়িত্ব সামলেছেন। ডেল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবেও সফলতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার এই অবস্থান প্রমাণ করে, নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নারীরা কোনো অংশে পিছিয়ে নয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সোনিয়ার অবদান উল্লেখযোগ্য। জাতিসংঘের প্রযুক্তি ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি স্বল্পোন্নত দেশগুলোর প্রযুক্তিগত উন্নয়নে কাজ করেছেন। ইউনেসকোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব ভূমিকা দেখায়, একজন নারী কেবল জাতীয় নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।
তার অর্জনগুলোও কম নয়। মাইক্রোসফট ফাউন্ডার’স অ্যাওয়ার্ড (বিল গেটস প্রদত্ত), এসডিজি পাইওনিয়ার অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন সম্মাননা তার কাজের স্বীকৃতি বহন করে। তবে এসব পুরস্কারের চেয়েও বড় বিষয় হলো–তিনি নতুন প্রজন্মের নারীদের জন্য একটি পথ তৈরি করেছেন।
তাই সোনিয়া বশির কবিরের গল্প শুধু একজন সফল নারীর গল্প নয় বরং এটি সমাজের গৎবাঁধা ধারণার বিরুদ্ধে এক শক্ত অবস্থান। তিনি দেখিয়েছেন, সুযোগ ও সাহস পেলে নারীরা প্রযুক্তি, ব্যবসা কিংবা নেতৃত্ব–সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে সফল হতে পারে।
আজকের সমাজে যখন এখনো নারীদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন সোনিয়ার মতো ব্যক্তিত্বরা হয়ে ওঠেন অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাদের সাফল্যই প্রমাণ করে–সমস্যা নারীর নয়, সমস্যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। তবে সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময় এখনই।
/এসএল
.jpg)