সুদানে চলমান যুদ্ধ চতুর্থ বছরে পা রাখতেই সামনে এসেছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা–এই সংঘাতে নারীর শরীরকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে। ইউএন উইমেনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়ে সহায়তার প্রয়োজন এমন নারী ও কন্যাশিশুর সংখ্যা চারগুণ বেড়েছে।
এই যুদ্ধ নারীদের জন্য কেবল জীবনসংকট নয়, বরং মর্যাদা ও নিরাপত্তারও লড়াই। নিজের ঘর, পালানোর পথ কিংবা খাবার ও পানির সন্ধান–কোথাও তারা নিরাপদ নন। ধর্ষণ, নির্যাতন ও সহিংসতা এখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ভয় সৃষ্টি, অপমান এবং পুরো সমাজকে নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বর্তমানে সুদানে প্রায় ১ কোটি ৭১ লাখ নারী ও কন্যাশিশু মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে ৪৩ লাখের বেশি নারী ও কন্যাশিশু বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছেন। নিরাপত্তার খোঁজে ঘর ছেড়ে বের হলেও তাদের ঝুঁকি কমেনি—বরং বেড়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র, রাস্তাঘাট কিংবা অস্থায়ী বসতিতেও তারা যৌন সহিংসতা, অপহরণ ও প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়ছেন।
পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের মতো মৌলিক জিনিসের অভাব। যুদ্ধ, অবরোধ এবং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার কারণে বহু অঞ্চল এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন। ফলে নারীরা কখনো দিনের পর দিন না খেয়ে থাকছেন, আবার কখনো পরিবারের জন্য খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজেদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন। এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু আলো আছে–আর সেই আলো তৈরি করছেন নারীরাই। নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলো সুদানের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ২ কোটি মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে। তারা খাদ্য সরবরাহ, চিকিৎসাসেবা, মানসিক সহায়তা প্রদান এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংঘাত নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে যেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পৌঁছাতে পারছে না, সেখানে এই নারীরাই জীবন বাজি রেখে কাজ করে যাচ্ছেন।
তবে তাদের এই লড়াইও সহজ নয়। প্রায় সব নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠনই অর্থসংকট, নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রশাসনিক বাধার মুখে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থায়ন কমে যাওয়ায় অনেক জরুরি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ে কাজ করা নারীরা সরাসরি হুমকি ও হামলার শিকার হচ্ছেন, তবু থেমে নেই তাদের কাজ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শান্তি প্রক্রিয়ায় এই নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় নেই বললেই চলে। গত তিন বছরে কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনায় সুদানের নারীরা আলোচক হিসেবে কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারেননি। অথচ বাস্তবতা হলো, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে সক্রিয় সহায়তাদানকারীরা তারাই।
এই প্রেক্ষাপটে ইউএন উইমেন আহ্বান জানিয়েছে, নারী ও কন্যাশিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোর উদ্যোগে জরুরি ভিত্তিতে অর্থায়ন বাড়ানোর। পাশাপাশি, টেকসই শান্তির জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে নারীদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
সুদানের এই সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধ শুধু ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়, এটি মানবতারও পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছেন নারীরা। তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে কোনো শান্তিই টেকসই হবে না।
তথ্যসূত্র: ইউএন উইমেন
এসএল/
.jpg)