বিবাহবিচ্ছেদ এখন আর অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এই বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গে একটি বিষয় প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে গেলে এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশ্নের মুখে পড়েন নারীরাই। কেন সংসার টিকল না, কোথায় ভুল হলো, দায়িত্বে ঘাটতি কার?
বিচ্ছেদ ব্যক্তিগত বিষয় হলেও সেলিব্রেটিদের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই জনসমক্ষে বিচারাধীন ঘটনায় পরিণত হয়। মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মিলিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের ‘মিডিয়া ট্রায়াল’—যেখানে আদালতের রায় নয়, জনমতই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়। এই ট্রায়ালের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হন নারীরা। ঘটনা আলাদা হলেও দায় চাপানোর প্যাটার্ন প্রায় একই থাকে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগীতশিল্পী তাহসান খান ও মেকওভার আর্টিস্ট রোজার আলাদা থাকার খবর সামনে আসার পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে রোজা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠতে থাকে—তিনি কি তাহসানের জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি? বয়সের পার্থক্য, জীবনধারা, বিদেশে থাকা—সবকিছুই রোজার বিপক্ষে যুক্তি হিসেবে হাজির করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোজার নীরবতাকেই অনেকেই অপরাধ হিসেবে দেখেছেন। যা মিডিয়া-ট্রায়ালের একটি পরিচিত কৌশল—নারী চুপ থাকলে তাকে সন্দেহভাজন বানানো।
এর আগ তাহসান-মিথিলা বিচ্ছেদের সময়ও দৃশ্যটা ছিল প্রায় একই। মিথিলার ব্যক্তিগত জীবন, নতুন সম্পর্ক, কাজ—সবকিছু নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একজন নারী হিসেবে তার ‘চয়েস’ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, একই পুরুষের জীবনে একাধিক সম্পর্ক ভাঙলেও সামাজিক বিশ্লেষণ বারবার নারীকেন্দ্রিক হয়েছে। এটি স্পষ্ট করে দেয়, আমাদের সমাজ বিবাহবিচ্ছেদকে যৌথ ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে শেখেনি। পুরুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি ‘হয়ে যায়’, আর নারীর ক্ষেত্রে বলা হয় ‘কেন এমন হলো’।
ইনফ্লুয়েন্সার রাফসান সাবাব ও তার প্রথম স্ত্রীর এশার বিচ্ছেদের ঘটনাও মূলত সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক ছিল। তখনো অনেকেই আঙুল তুলেছিল এশার দিকে। এখানে আদালতের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে অনলাইন জনমত। রাফসানের জনপ্রিয়তা, তার ভ্লগ, তার বক্তব্য—এসব মিলিয়ে এক ধরনের সহানুভূতির বৃত্ত তৈরি হয়।
সংগীতশিল্পী সালমার বিচ্ছেদের খবর প্রকাশের পর আলোচনায় আসে তার ব্যক্তিগত জীবন ও সিদ্ধান্ত। তিনি কেন আবার বিয়ে করলেন, কেন সংসার টিকল না—এই প্রশ্নগুলোই প্রধান হয়ে ওঠে। এখানেও পুরুষ পক্ষ প্রায় অনুল্লেখিত। সালমার শিল্পী পরিচয়, তার সংগ্রাম, তার মানসিক অবস্থা—এসবের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ‘নারী হিসেবে তিনি কেন ব্যর্থ’ এই দৃষ্টিভঙ্গি। মিডিয়া আলোচনায় সহানুভূতির চেয়ে কৌতূহল ও বিচার বেশি কাজ করেছে।
তবে এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয় বরং পশ্চিমা বিশ্বেও একই চিত্র দেখা যায়। ডোয়াইট হাওয়ার্ডের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তার স্ত্রীর ডিভোর্স ফাইল করার সিদ্ধান্তকে মিডিয়া নাটকীয় ও সন্দেহজনক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কেন তিনি এত তাড়াতাড়ি ডিভোর্স চাইলেন—এই প্রশ্নটাই মুখ্য হয়েছে। পুরুষ তারকার অতীত, আচরণ বা দায় নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। এখানেও নারী হয়ে ওঠেন সম্পর্ক ভাঙার প্রধান ‘কারণ’।
নিকোল কিডম্যান একজন প্রতিষ্ঠিত, অভিজ্ঞ অভিনেত্রী। তবু বিচ্ছেদের গুঞ্জনে তার মানসিক অবস্থা, বয়স, ক্যারিয়ার—সবকিছু বিশ্লেষণের টেবিলে উঠে আসে। যা প্রমাণ করে যে খ্যাতি বা সফলতা নারীদের এই কাঠগড়া থেকে মুক্তি দেয় না। মিডিয়া-ট্রায়ালের কাঠামো এমন যে, নারীকেই ব্যাখ্যা দিতে হয়, প্রমাণ দিতে হয়, নিজেকে নির্দোষ দেখাতে হয়।
এই সামাজিক মানসিকতাকে আরও জোরালো করে তোলে মিডিয়া ট্রায়াল। বিশেষ করে পরিচিত মুখ, তারকা বা পাবলিক ফিগারদের ডিভোর্সের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও প্রকটভাবে দেখা যায়। তাহসান-মিথিলা, সৃজিত-মিথিলা কিংবা রাফসান সাবাব ও এশার ঘটনায় দেখা গেছে, আলোচনার কেন্দ্রে বেশি থেকেছে নারীর সিদ্ধান্ত, তার ব্যক্তিগত জীবন ও চরিত্র বিশ্লেষণ। সম্পর্ক ভাঙার যৌথ দায় বা পুরুষ পক্ষের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে আড়ালেই থেকে গেছে।
মিডিয়া অনেক সময় তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের বদলে ফ্রেমিংয়ের পথে হাঁটে। শিরোনাম, উপস্থাপন ভঙ্গি ও আলোচনা এমনভাবে সাজানো হয়, যেন দর্শক বা পাঠক আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই প্রক্রিয়া আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। গুজব, অনুমান ও ব্যক্তিগত আক্রমণ মিলিয়ে একজন নারীকে কার্যত জনসমক্ষে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। অথচ তার বক্তব্য, তার অভিজ্ঞতা কিংবা তার ভোগান্তি খুব কমই গুরুত্ব পায়।
সুতরাং ডিভোর্স কোনো নারীর ব্যর্থতার সার্টিফিকেট নয়। বরং অনেক সময় এটি একটি অমানবিক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সাহসী সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তকে বিচার নয়, বোঝার চোখে দেখাই একটি সুস্থ সমাজের পরিচয়। মিডিয়াকে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে রায় দেওয়া থেকে সরে এসে প্রেক্ষাপটভিত্তিক, সংবেদনশীল ভাষা ব্যবহার করতে হবে।
উল্লেখযোগ্য যে, কোনো বিচ্ছেদেই নারী বা পুরুষ—একপক্ষকে সম্পূর্ণ দায়ী করা যায় না। একটি সম্পর্ক ভাঙার পেছনে সাধারণত দুজনেরই সীমাবদ্ধতা, ভুল ও পারস্পরিক ব্যর্থতা কাজ করে। অনেক সময় ব্যক্তিগত ভুলের বাইরেও মানসিক চাপ, সামাজিক বাস্তবতা, জীবনযাপনের ভিন্নতা কিংবা পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাবের মতো নানা কারণ যুক্ত থাকে। তবু বাস্তবতা হলো, তুলনামূলকভাবে এসব ঘটনায় পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। তাদের সিদ্ধান্ত, আচরণ ও ব্যক্তিগত জীবনই বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এই অসম দোষারোপের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা নারীকেন্দ্রিক সমালোচনাকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
/এসএল
.jpg)