চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দুর্গম ধোপাছড়ি ইউনিয়নের সাঙ্গু নদী। তার পাশে ধোপাছড়ি খালের ওপর ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে তৈরি হয়েছে কাঠের একটি সেতু। এক বছরও পূর্ণ হয়নি। এরই মধ্যে পাহাড়ি ঢলে ভেসে আসা কয়েক হাজার বাঁশের ধাক্কায় ভেঙে গেছে সেটি। ভেঙে যাওয়ার ২১ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলে কাঠের সেতুটির ঠিক মাঝখানে ভেঙে যায়। সে সময় খালটিতে পানি বেশি থাকায় স্থানীয়রা নৌকায় পারাপার করেছিল। কিন্তু বর্তমানে খালটিতে রয়েছে এক হাঁটু পরিমাণ পানি। কম পানির কারণে নৌকা চলাচলও করতে পারছে না। বরং হেঁটে পারাপার হচ্ছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও রোগীরা। এ ছাড়া স্থানীয় সবজি চাষিরা কাঁধে বোঝায় করে বাজারে নিয়ে আসছেন। এতে তাদের শ্রম ও অর্থ দুই-ই বেশি ব্যয় হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা খালের উভয় পাশের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে সেতুটি মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছেন। ভেঙে যাওয়া অংশে বেশ কয়েকটি খুঁটি দিয়েছেন। তবে অর্থের অভাবে এখন মেরামতের কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বর্ষাকালে নৌকা ও গ্রীষ্মকালে বাঁশের সাঁকোতে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতো খালটির দুই পারের ধোপাছড়ি বাজার, শঙ্খরকুল ও চেমিরমুখ এলাকার কয়েক হাজার মানুষ। স্বাধীনতা-পরবর্তী দীর্ঘসময় পেরিয়ে গেলেও এ খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতু না হওয়ায় আক্ষেপ ছিল এলাকাবাসীর। তারই পরিপ্রেক্ষিতে চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় ১০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৭ ফুট প্রস্থের একটি কাঠের সেতু। সেই থেকে সেতুটি দিয়ে মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। কিন্তু ধোপাছড়িবাসীর দুঃখ যেন তাদের ছাড়তে নারাজ। গত ১৩ সেপ্টেম্বর কাঠের সেতুটি নির্মাণের বছর না ঘুরতেই পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ভেসে আসা কয়েক হাজার বাঁশ একযোগে সেতুটির খুঁটিতে ধাক্কা লাগলে সেটির ঠিক মাঝখানে ভেঙে যায়।
ধোপাছড়ি শীলঘাটা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া সোলতানা বলেন, ‘দুঃখ এবং দুর্ভোগ যেন আমাদের ছাড়ছে না। কাঠের সেতুটি নির্মাণের ফলে দুর্ভোগ কিছুটা লাঘব হলেও সেটি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। প্রতিদিন হেঁটে খালটি পারাপার হয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে। কাঠের সেতুটি ভেঙে গেছে প্রায় ১ মাস হতে চলল। তবে এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
স্থানীয় বাসিন্দা ওচমান চৌধুরী বলেন, ‘কাঠের সেতুটি উদ্বোধনের পর সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল পারাপার হতো। কিছুদিন যেতে না যেতেই সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এরপর থেকে সব প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে শেষ পর্যন্ত পাহাড়ি ঢলে সেতুটি ভেঙে গেছে। এতে খালের দুই পাশের কয়েক হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। এ খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।’
শঙ্খরকুল গ্রামের সবজি চাষি আবছার উদ্দিন বলেন, ‘ধোপাছড়ি খালটি পার হয়ে বাজারে যাতায়াত করতে হয়। এত দিন কাঠের সেতুটি দিয়ে নির্বিঘ্নে পারাপার হয়ে সবজি বাজারে নিয়ে গেলেও এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। এতে বাড়তি অর্থ ও সময় ব্যয় হচ্ছে। দ্রুত সরকারিভাবে সেতুটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
ধোপাছড়ি ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মুজিবুল হক খোকা বলেন, ‘এ এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ধোপাছড়ি খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে এলেও তা এখনো পর্যন্ত তৈরি হয়নি। সর্বশেষ উপজেলা পরিষদের বরাদ্দে একটি কাঠের সেতু তৈরি হয়। নির্মাণের এক বছর পূর্ণ না হতেই কাঠের সেতুটি ভেঙে গেছে। তবে এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে সেতুটি মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছি। খুঁটি স্থাপনের পর অর্থের সংকট দেখা দেওয়ায় আপাতত কাজ বন্ধ আছে।’
চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদের প্রশাসক মাহমুদা বেগম খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে অর্থ ছাড়ের নির্দেশনা এলে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সেতুটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আমরা জানতে পেরেছি সেতুটির সঙ্গে এক ব্যবসায়ী কয়েক হাজার বাঁশ বেঁধে রেখেছিলেন। পাহাড়ি ঢলে বাঁশগুলো সেতুটির খুঁটিতে ধাক্কা লাগে। এতে সেতুটি ভেঙে গেছে। তদন্ত করে ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চন্দনাইশ উপজেলার একমাত্র দুর্গম ইউনিয়ন ধোপাছড়ি। সড়ক যোগাযোগের দিক থেকে এই ইউনিয়নটি অন্য ইউনিয়নের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। ধোপাছড়ি বাজারের এক পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা সাঙ্গু নদী। আর অপর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ধোপাছড়ি খাল। এ ধোপাছড়ি খালের পানি সরাসরি সাঙ্গু নদীতে গিয়ে মিশেছে। খালটি ধোপাছড়ি ইউনিয়নকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে।