খুলনাসহ বিভাগের ১০ জেলায় হঠাৎ করে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে বিভাগে নতুন করে তিন হাজার ৩৭৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। শুধু সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন প্রায় সাড়ে ৪০০ ডেঙ্গু রোগী। বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালে আরও অসংখ্য রোগী ভর্তি রয়েছেন। খুলনার নাগরিক প্রতিনিধিরা এমন পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতাকে দায়ী করেছেন। বলেছেন, ডেঙ্গু নিধনে সিটি করপোরেশন তাদের কার্যক্রম আলোচনা সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। বাস্তবে তারা কোনো কাজ করে না।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর বিভাগের ১০ জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল চার হাজার ৯২১ জন। এরপরই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হারে বাড়তে থাকে। ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন সাত হাজার ৬৫১ জন। গড়ে প্রতি সপ্তাহে আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজারের বেশি।
এর মধ্যে খুলনা জেলায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ১৩৯ জন। এর বাইরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন আরও ৮৫২ জন। খুলনায় চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১৫ জন। সর্বশেষ ১২ নভেম্বর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খুলনায় স্কুল শিক্ষিকা হাবিবা খানম মারা যান। তিনি মহানগর বিএনপি নেতা চৌধুরী হাসানুর রশিদ মিরাজের স্ত্রী।
এ ছাড়া খুলনা বিভাগের মধ্যে যশোরে এক হাজার ৪৬, কুষ্টিয়ায় ৮০৩, নড়াইলে ৫৫৩, মেহেরপুরে ৫৫০, ঝিনাইদহে ৪৬৯, মাগুরায় ২৩৭, সাতক্ষীরায় ৩৫৮, চুয়াডাঙ্গায় ১৫৩ ও বাগেরহাটে ৯৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন।
এদিকে নাগরিক নেতারা বলছেন, মশক নিধনে খুলনা সিটি করপোরেশন বড় অংকের বাজেট ব্যয় করলেও সুফল মিলছে না। খুলনায় দিনে-রাতে মশার অত্যাচারে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন স্থানে চলমান ড্রেন ও রাস্তার সংস্কার কাজে আটকে থাকা পানিতে মশার বংশ বিস্তার হচ্ছে। মশার কয়েল, স্প্রে ও ইলেকট্রিক ব্যাট ব্যবহার করেও কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
জানা গেছে, মশক নিধনে সিটি করপোরেশন চলতি অর্থবছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার বাজেটে ওষুধ, কালো তেল ছিটানো, ফগার মেশিন কেনা-মেরামতসহ ক্রাশ প্রোগ্রাম চালানোর কথা বললেও মশা দমন করা যাচ্ছে না। এতে ভয়াবহ আকারে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে।
নগরীর শেখপাড়ার হাজি ইসমাইল লিংক রোডের বাসিন্দা সাইদুর রহমান জানান, অধিকাংশ এলাকায় চলছে ড্রেন-রাস্তার সংস্কার কাজ। এ কাজের সময় ড্রেনের মুখ বন্ধ রেখে কাজ করতে হয় শ্রমিকদের। সেখানে জমে থাকে নোংরা পানি। আর বদ্ধ নোংরা পানি থেকে জন্ম নেয় মশা। তিনি বলেন, আগে দিনের বেলায় মশা দেখা না গেলেও এখন সব সময়ই মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হতে হয়। কয়েল, ইলেকট্রিক ব্যাট ব্যবহার করেও মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, চলতি অর্থবছরে মশক নিধনে লার্ভিসাইড, অ্যাডাল্টিসাইড, ডিজেল, কেরোসিন কেনা বাবদ দুই কোটি ১০ লাখ টাকার বরাদ্দ রয়েছে। এ ছাড়া ফার্নেস অয়েল, ফগার মেশিন কেনা, হ্যান্ড স্প্রে মেশিন কেনা-মেরামত বাবদ আরও এক কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতায় সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ড্রেনগুলোতে পলিথিন, কাগজ ও বিভিন্ন ধরনের ময়লা জমে রয়েছে। এগুলো পরিষ্কারের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের উদাসীনতার কথা বলছেন এলাকার বাসিন্দারা।
নগরীর সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে মশার উপদ্রব বাড়ছে। ঘরের জানালা খুললে ঘরে মশা প্রবেশ করে, শুরু হয় অত্যাচার। মঝেমধ্যে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ওষুধ ছিটানো হয়। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয় না।
নাগরিক সংগঠন খুলনা নাগরিক সমাজের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেসিসি মাঝেমধ্যে আলোচনা সভা করলেও বাস্তবে তারা কোনো কাজ করে না। মশক নিধনে মানসম্মত ওষুধ ছিটানোরা পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংস্কার প্রয়োজন।
সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান আব্দুল আজিজ বলেন, লার্ভা ধ্বংস করার জন্য ড্রেনে কালো তেল ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া হয়েছে। মশার উপদ্রব থেকে বাঁচার জন্য তিনি বাড়ির আশপাশের জঙ্গল ও ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করাসহ নগরবাসীকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।