পহেলা বৈশাখকে ঘিরে নড়াইলের বিভিন্ন জায়গায় বৈশাখী মেলা বসে। এ মেলায় মাটির তৈরি জিনিসপত্রের বেশ চাহিদা রয়েছে। তাই বাহারি সব মাটির খেলনাসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিস তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার মৃৎশিল্পীরা। চৈত্রের এ মাঝামাঝি সময়ে মাটির তৈরি খেলনায় শেষ মুহূর্তে রংতুলির আঁচড় দিচ্ছেন তারা।
সরেজমিনে সদর উপজেলার রতডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, বৈশাখী মেলা উপলক্ষে বিভিন্ন মাটির খেলনাসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গ্রামের নারী-পুরুষরা।
রতডাঙ্গা গ্রামের তারক পাল বলেন, ‘বছরের এই একটা উৎসব ঘিরে আমাদের অনেক আশা থাকে। এমনিতে সারা বছর মৃৎশিল্পের তেমন চাহিদা থাকে না। এখন আর মাটির জিনিসের তেমন কদরও নেই। সারা বছর টানাপোড়েনে চলতে হয় আমাদের। পূর্বপুরুষের পেশা ধরে রাখার চেষ্টা মাত্র। বৈশাখ মাস এলে মেলায় মাটির তৈরি খেলনা ও সামগ্রীর চাহিদা থাকে। তাই এ সময়টায় ভালো আয় হয়।’
অর্চনা রানী পাল একটি কাঠের পিড়িতে বসে আপন মনে তার নিপুণ হাতের শৈল্পিক ছোঁয়ায় তৈরি করছেন এক একটি মাটির সামগ্রী। যার মধ্যে রয়েছে, মাটির হাঁড়ি-পাতিল, এসএম সুলতান, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বিভিন্নজনের প্রতিকৃতি। এ ছাড়া রয়েছে দোয়েল পাখি, ময়না পাখি, টিয়া পাখি, পুতুল, হাতি, ঘোড়া, হাঁস-মুরগি, নৌকা, ফুল, মাটির ব্যাংক, প্লেট, মগ, গ্লাস, চায়ের কাপ, পিঠা তৈরির ছাঁচ, নানা জাতের ফুল, ফল ও ফুলদানি।
অর্চনা পাল বলেন, ‘পহেলা বৈশাখে বিভিন্ন জায়গায় মেলা বসে। এই মেলায় শখের বসে অনেকেই মাটির সামগ্রী কেনেন। তাই এই সময়ে আমাদের কিছুটা কর্মব্যস্ততা বাড়ে। এ কাজের জন্য প্রয়োজন হয় এঁটেল মাটির। কিন্তু এখন মাটির অভাব। তার ওপরে রঙের দাম বাড়তি। সে অনুযায়ী পণ্যের দাম ততটা বাড়েনি। এসব মাটির খেলনা ২০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।’
মৃৎশিল্পী রাজকুমার পাল বলেন, ‘বাজারে এখন মাটির তৈরি পণ্যের কদর অনেক কম। মূল্য কম হওয়ায় প্লাস্টিকের পণ্য কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন ক্রেতারা। ঐতিহ্যের এই শিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। তবে পহেলা বৈশাখে জেলার বিভিন্ন জায়গায় বৈশাখী মেলা বসে। তাই এ সময়টা আমাদের কাজটা বেশি করা হয়।’
একই গ্রামের জগদীশ পাল ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘বাপ-দাদার পেশাকে টিকিয়ে রাখতে আমরা এ পেশায় এখনো আছি। বেচাকেনা কম থাকায় এ কাজ করতে অনাগ্রহ সবার। ছেলে-মেয়েকে এ পেশায় আনতে চাই না। মানুষ এখন মাটির তৈরি জিনিসের চেয়ে মেলামাইন, প্লাস্টিককে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যদি এ পেশাকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেন, তাহলে মৃৎশিল্প হারিয়ে যাবে।’
নড়াইল বিসিক কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সোলায়মান হোসেন বলেন, ‘সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনবদ্য রূপ মৃৎশিল্প। এর সঙ্গে একদিকে জড়িয়ে আছে জীবনের প্রয়োজন আর অন্যদিকে নান্দনিকতা ও চিত্রকলার বহিঃপ্রকাশ। যে কারণে এ শিল্প বাঙালির নিজস্ব শিল্প, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের অংশ। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বিসিকের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা করা হবে।’