ফরিদপুরে ভোগান্তির আরেক নাম অবৈধ অটোরিকশা। নিয়মকানুন না মেনে যত্রতত্র এসব অটোরিকশার অবস্থানের কারণে যানজট সৃষ্টি-দুর্ঘটনাসহ নানা দুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে। শহর এখন ঠিকমতো শ্বাস-প্রশ্বাসও নিতে পারছে না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের দাপটে অস্থিরময় থাকে ফরিদপুর শহর। ফলে অবৈধ এসব অটোরিকশার কারণে শহরবাসী এখন অতিষ্ঠ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শহরের জনতা ব্যাংকের মোড়ে অটোরিকশা মোড়ের মাঝখানে তারা গাড়ি রেখে অবস্থান করছেন। আবার কেউ কেউ তো মোড়ের ওপর থেকেই যাত্রী ওঠাচ্ছেন ও নামাচ্ছেন। ট্রাফিক পুলিশের সামনেই তারা এই কাজটি করছেন। লাভলু মিয়া সড়কের সামনে ঢুকতেই দেখা যায় সড়কজুড়ে অটোরিকশা রেখে চালকরা অবস্থান করছেন। ফলে সংকুচিত রাস্তা দিয়ে অন্য গাড়িগুলো চলাচলের সময় এখানে নিত্যযানজট লেগেই থাকছে।
ফরিদপুর পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ৩ হাজার ৯০০ অটোরিকশা পৌরসভা থেকে নিবন্ধন করে অনুমোদন পেলেও প্রায় ৫০ হাজারের ওপর অটোরিকশার কোনো অনুমোদন নেই। সকাল ১০টার পর থেকে জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে, এমনকি আশপাশের জেলা থেকেও অটোরিকশা শহরে চলে আসে। শহরটি মাত্র ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এতটুকু এলাকায় দিন-রাত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নিবন্ধনহীন প্রায় ৫০ হাজার থেকে এক লাখ অটোরিকশা! অনিয়ন্ত্রিত এসব অটোরিকশার সীমাহীন দৌরাত্ম্য ও এসবের কারণে সৃষ্ট তীব্র যানজটে শহরবাসীর জীবন এখন অতিষ্ঠ।
শহরবাসীর এই সমস্যা দূরীকরণে জেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা বারবার কেবল আশ্বাসই দিয়েছেন। কিন্তু অবস্থা রয়ে গেছে সেই আগের মতোই। তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বুলি হয়েই থেকে গেছে বছরের পর বছর। অন্যদিকে শহরজুড়ে অটোরিকশার বহর ক্রমাগত বেড়েছে। এর ফলে যানজট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে আর ভোগান্তি পোহাচ্ছেন নাগরিকরা।
শহরের রাজবাড়ী রাস্তার মোড় থেকে নতুন বাসস্ট্যান্ড হয়ে হাজি শরীয়তুল্লাহ বাজার, আলীপুর ব্রিজ হয়ে জনতা ব্যাংক মোড়, জনতা ব্যাংক মোড় থেকে থানা রোড হয়ে ঝিলটুলী অনাথের মোড়, ভাঙা রাস্তার মোড় থেকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, টেপাখোলা থেকে নিউ মার্কেট, শহরের কেবল এই চার-পাঁচ বর্গকিলোমিটার রাস্তায়ই চলে ২০ থেকে ২৫ হাজার অবৈধ অটোরিকশা।
শহরের ব্যবসায়ী চুন্নু কাজী জানান, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা, আবার বেলা ৩টা থেকে রাত ৮-৯টা পর্যন্ত অটোরিকশার চাপে শহরে ভালোভাবে চলাফেরা করাই দায়।
স্বর্ণকারপট্টির ব্যবসায়ী রাম জানান, ভাঙা রাস্তার মোড় থেকে জনতা ব্যাংক মোড় হয়ে মুজিব সড়কের স্বর্ণকারপট্টিতে যেতে মাত্র এক কিলোমিটার পথ পেরোতেই ২০-৩০ মিনিট সময় লেগে যায়। অনেক সময় এর থেকেও বেশি সময় যানজটে পড়ে থাকতে হয়। যানজট না থাকলে মাত্র ২ মিনিটেই এটুকু পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব হতো।
চাকরিজীবী ফাহাদ রহমান বলেন, ছেলেকে নিয়ে আলীপুর থেকে ঝিলটুলী মাত্র এক কিলোমিটার দূরের স্কুলে যেতে ১৫ মিনিট সময় লেগে যাচ্ছে। জনতা ব্যাংক মোড়ে অটোরিকশার কারণে সাধারণ মানুষ চলাফেরাই করতে পারেন না। অটোরিকশাজনিত যানজটের কারণে ৪০ ফুটের এই রাস্তা পার হতে সুস্থ-সবল মানুষেরই ৪-৫ মিনিট লেগে যায়। সেখানে শিশু, নারী ও বয়স্করা তো আরও অসহায়! এ শহরে অটোকে একটি পাশ দিয়ে লাইন ধরে যাওয়ার জন্য অনুমতি দেওয়া উচিত। লাইন করা থাকলে তারা যত্রতত্রভাবে চলাফেরা করতে পারবে না। এ ব্যাপারে প্রশাসনকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।
ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক খুরশিদ আলম বলেন, ‘অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে যানজট ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন সকাল না হতেই বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার অটোরিকশা শহরে প্রবেশ করে। এসব অটোরিকশাচালকদের বেশির ভাগেরই কোনো রকম প্রশিক্ষণ নেই। এরা যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠায়-নামায়। অটো ঘোরানো প্রয়োজন হলে যেখানে আছে সেখান থেকেই ইউটার্ন নিয়ে নেয়। এর ফলে বেঁধে যায় যানজট এবং ঘটে দুর্ঘটনা। আমরা পৌর মেয়র (প্রশাসক) ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তাদের কাছে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছি। এ ছাড়া মাসিক মিটিংয়ে আমি এ ব্যাপারে প্রস্তাব দিয়েছি।’
ফরিদপুর পৌরসভার প্রশাসক চৌধুরী রওশন ইসলাম বলেন, ‘পৌরসভা একা এখানে কাজ করছে না। পৌরসভা, জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে একটি কার্যনির্বাহী দল কাজ করছে। আমরা পৌরসভার পক্ষ থেকে যেসব লাইসেন্স দিয়েছি, তাদের পৌরসভার ভেতরে গাড়ি চালানোর কথা বলছি। যেসব যাত্রীরা বাইরে থেকে শহরে আসছেন, তাদের পৌরসভার শুরুতেই আটকে দেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে পৌরসভার অনুমোদন পাওয়া অটোরিকশায় যাত্রীরা শহরে ঢুকতে পারবেন। যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। যাতে শহরবাসী ভালো থাকে।’