কক্সবাজারের পেকুয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর-কিশোরীদের মাঝে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তা দিয়ে পালিয়ে বিয়ের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এই সুযোগে কিছু অসাধু কম্পিউটার দোকানদার জাল জন্মনিবন্ধন তৈরি করছেন। আবার কিছু কাজি ভুয়া রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে অনৈতিক বিয়ে-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। আবেগের বশবর্তী হয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে নারীরা চরম আইনি ও সামাজিক ঝুঁকিতে পড়ছেন। এটি রোধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি জরুরি বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঘরছাড়া এই তরুণ-তরুণীদের অধিকাংশই নবম, দশম বা একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী কিংবা এই বয়সের।
গত ৫ মে উখিয়ার পালংখালী এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় মোশারাফা নামের এক কিশোরী। পরে সে অনলাইন মিডিয়ায় ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জানায়, সে স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়ে বিয়ে করেছে। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দেয়, তার স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কোনো ক্ষতি করা হলে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে। একই দিনে সাইফুল ও জান্নাতুল ফেরদৌস নামের অন্য এক যুগলও ভিডিও বার্তায় দাবি করে, পরিবার সম্পর্ক মেনে না নেওয়ায় তারা পালিয়ে গেছে।
গত ৫ মে পিএমখালী এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া জেসমিন আক্তার ও জাকির হোসেন এবং ২ মে নাফিসা নামের আরেক কিশোরী ভিডিও বার্তায় একই ধরনের বক্তব্য প্রচার করে। এর আগে ৩০ এপ্রিল চকরিয়ার কৈয়ারবিল এলাকার সুমাইয়া এবং আবিদ দম্পতিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজির হয়ে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির পক্ষে সাফাই গেয়ে ভিডিও বার্তা দেয়।
জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে মেয়ের পরিবার অপহরণ বা ধর্ষণ মামলা করতে চাইলেও ভিডিও বার্তার কারণে আইনি জটিলতায় পড়ছে। লোকলজ্জা আর সামাজিক সম্মানের ভয়ে অনেক বাবা-মা শেষ পর্যন্ত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকছেন। অন্যদিকে ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছেলের পরিবার বিষয়টি জানলেও মেয়ের পরিবার কিছুই জানে না। এ ছাড়া ভিডিওর নিচে সাধারণ মানুষের বাজে মন্তব্য ও ট্রল অভিভাবকদের মানসিক যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া ও ইন্টারনেটের অপব্যবহারই এই সমস্যার অন্যতম কারণ। অপ্রাপ্ত বয়স্কদের এমন অবাধ্যতা রোধে এবং সামাজিক অবক্ষয় ঠেকাতে এখনই পরিবার ও সমাজকে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে পেকুয়ায় কিছু অসাধু কম্পিউটার দোকানে অবৈধভাবে জন্মনিবন্ধন তৈরি ও সংশোধনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করছেন কিছু ইউনিয়নের উদ্যোক্তা। তারা বিভিন্ন ব্যক্তির বয়স কমিয়ে বা বাড়িয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন তৈরি করে দিচ্ছেন।
সাধারণত জন্মনিবন্ধন সংশোধনের ক্ষেত্রে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তার সত্যায়ন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র লাগে। কিন্তু এই অসাধু চক্রটি জাল সিল ও নকল স্বাক্ষর ব্যবহার করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করছে, যা দিয়ে বয়স পরিবর্তন করে নতুন জন্মনিবন্ধন বানানো হচ্ছে।
অন্যদিকে কিছু অসাধু কাজির ভুয়া নিকাহ রেজিস্ট্রার ও অনৈতিক বাণিজ্যের কারণে চরম ঝুঁকিতে পড়ছে বহু মেয়ের দাম্পত্য জীবন। আইন অনুযায়ী, বিয়ের সময় বর ও কনের সরকার স্বীকৃত জন্মনিবন্ধন সনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে সরকারি পোর্টালে অনলাইনের মাধ্যমে বিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বর বা কনের বয়স কম থাকায় কাজিরা একটি লিখিত বা মৌখিক মুচলেকা নেন। তারা বলেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে জন্মনিবন্ধন এনে দিতে হবে। তরুণ-তরুণীরা এই শর্তে রাজি হয়ে বিয়ে সম্পন্ন করে খুশি হন। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও যখন পরিবারগুলো জন্মনিবন্ধন দিতে ব্যর্থ হয়, তখন কাজি অফিসে থাকা ওই বিয়ের তথ্য আর সরকারি অনলাইন সার্ভারে ওঠে না। ফলে খাতা-কলমে বিয়েটি অবৈধ থেকে যায়।
পরবর্তীতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হলে বা নির্যাতন করলে মেয়েরা আইনি প্রতিকার চাইতে গিয়ে দেখে তাদের বিয়ের কোনো বৈধ কাবিননামাই নেই। কাবিননামার মূল কপি বা অনলাইন কপি দেখাতে না পারায় সবচেয়ে বেশি ঠকছে মেয়েরা ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিছু অসাধু কাজি সরকারি কর্মকর্তাদের পরিদর্শন থেকে বাঁচতে সমান্তরালভাবে দুটি রেজিস্ট্রার খাতা তৈরি করেন। একটি খাতা থাকে সম্পূর্ণ বৈধ ও ফ্রেশ, যা সরকারি অডিটের সময় দেখানো হয়। আর অন্য একটি লুকানো খাতায় অবৈধ, বাল্যবিবাহ কিংবা ত্রুটিপূর্ণ কাগজের বিয়েগুলো সাময়িকভাবে টুকে রাখা হয়। পরবর্তীতে সুবিধা বুঝে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সেগুলো মূল খাতায় তোলা হয়, অন্যথায় তা গায়েব করে দেওয়া হয়।
তবে সব কাজি এই অনৈতিক চক্রের সঙ্গে জড়িত নন। পেকুয়ার উজানটিয়া ইউনিয়নের কাজি আজিজুল হক বলেন, ‘আমি অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করি। এই ধরনের কোনো দুই নম্বরি খাতা আমি রাখি না। অন্য কেউ যদি অডিট ফাঁকি দিতে এই অনৈতিক কাজ করে, সেটি আমার জানা নেই।’
অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ রোধে আইন অনুযায়ী ছেলেদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর ও মেয়েদের ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে পালিয়ে বিয়ে করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে মেয়ের বয়স ১৮ বছর হলেও ছেলের বয়স ২১ বছর না হওয়ায় কাজি বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন না। তখন কেউ কেউ ভুয়া বা ডুপ্লিকেট এনআইডি ব্যবহার করে বয়স বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করে। অল্প বয়সে সংসার শুরু করার কারণে এরা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। ফলে দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি হয় ও সংসার টেকে না।’
পেকুয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বিষয়টি তিনি গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। তিনি বলেন, ‘ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি, জাল জন্মনিবন্ধন সরবরাহ এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সহযোগিতাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।’
ইউএনও আরও বলেন, ‘শুধু আবেগের বশবর্তী হয়ে এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে করলেই সেটি পূর্ণাঙ্গ ও বৈধ বিয়ে হিসেবে গণ্য হয় না। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।’
পেকুয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এতিমখানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে উঠান বৈঠক করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজে গিয়ে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হবে। কারণ বর্তমানে অনেকেই পালিয়ে বিয়ে করছেন ও ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি করে কোর্ট ম্যারেজ করছেন। অবক্ষয় রোধে এই সামাজিক প্রতিরোধ আরও জোরদার করা হবে।