বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিডব্লিউডিবি) বগুড়ায় ছোট নদী ও খালের নতুন করে যে তালিকা তৈরি করেছে তার অনেকগুলোই দখল আর ভরাট হয়ে যাওয়ায় অস্তিত্ব হারিয়েছে। তবে সরকারি ম্যাপে এখনো অস্তিত আছে রেলওয়ে, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমিতে থাকা ওই সব খাল-নদীর। প্রভাবশালীরা দখল হওয়া খাল বা ছোট নদীর জায়গায় নির্মাণ করেছেন স্থায়ী-অস্থায়ী ভবন আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বগুড়ায় সব মিলিয়ে খাল ও ছোট নদী রয়েছে ১১৫টি।
বগুড়ায় বিডব্লিউডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, নতুন তালিকা অনুযায়ী বগুড়ায় এখন খনন প্রয়োজন তিনটি ছোট নদী ও ৭৪টি খাল। ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে পানিপ্রবাহ নেই ওই সব খালে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন খনন না করায় অনেক খাল ভরাট হয়ে অস্তিত্ব হারিয়েছে।
মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি ভরাট খাল খনন করা হয়েছে। আরও খনন করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং সে জন্য কাজও শুরু হয়েছে।’
অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এ প্রশ্নের উত্তরে মো. আরিফুর রহমান বলেন, ‘খননের আগেই চিহ্নিত করা হবে দখলদারদের। আর খনন শুরু হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে উচ্ছেদ করা হবে। ইতোমধ্যেই অবৈধ দখলদারদের বেশ কয়েকজনকে উচ্ছেদও করা হয়েছে।
৭৪টি খাল ও তিনটি ছোট নদী খননের ফলে কী কী সুবিধা হবে– এ প্রশ্নের উত্তরে মো. আরিফুর ইসলাম বলেন, ‘কৃষিসহ অন্যান্য খাতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমবে, বগুড়া শহরসহ অনেক এলাকা দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে। সুযোগ সৃষ্টি হবে প্রাকৃতিক পরিবেশে মাছ চাষের। সেই সঙ্গে জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য পরিবর্তনে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে।’
বগুড়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যেই ১৩টি খালের ১১১ কিলোমিটার খনন শেষ করেছে। খননকাজ চলছে আরও ১৫টি খালের।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, বগুড়ার ১২টি উপজেলায় তিনটি ছোট নদী ও ৭৪টি খালে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি অবৈধ দখলমুক্ত করতে খনন করা হবে প্রায় ৪৭৮ কিলোমিটার। আর বালি-মাটি অপসারণ করতে হবে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ২৪ হাজার ৮৬১ ঘনমিটার। প্রস্তাবিত খনন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ২৪৭ কোটি টাকা–এমন ধারণা দিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, বগুড়া শহর ও শহরতলির ভরাট খালগুলো খনন করা সম্ভব হলে বগুড়া পৌর এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী কোনো জলাবদ্ধতা থাকবে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বগুড়া পৌর এলাকা বাদুড়তলা, খান্দার, নামজাগড়, সেইজগাড়ী, চেলোপাড়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় দখল অথবা ভরাট হয়ে গেছে বড় বড় খাল। ফলে বর্ষায় বগুড়া শহরের কেন্দ্রস্থল সাতমাথাসহ সম্প্রসারিত এলাকায় জলাবদ্ধতা নাগরবাসীকে ভোগান্তিতে রাখে দিনের পর দিন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড যে তালিকা তৈরি করেছে তাতে দেখা যায়, শাহজাহানপুর উপজেলায় খাল আছে ১৬টি। কিন্তু ওই উপজেলার ১৬টি খালের নাম কেউ বলতে পারেন না। কথা হয় শাহজাহানপুর উপজেলার পূর্বপাড়া গ্রামের আল আমিনের সঙ্গে। এলাকার খালগুলোর নাম বলতে পারবেন–এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি হেসে বলেন, ‘শুধু আমি কেন? উপজেলার কোনো বাসিন্দাই জানেন না সব খালের নাম। আমার বাড়ির কাছে যে খাল আছে সেটার নাম কোদাল ধোয়া, ওই খালটি ভরাট হয়ে গেছে অনেক আগেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্প্রতি যে তালিকা তৈরি করেছে, সেখানে শাহজাহানপুর উপজেলায় এ নামে কোনো খাল নেই। অর্থাৎ শুধু খাল নয়, অনেক খালের নাম হারিয়ে গেছে।’
একই উপজেলার জোড়া দক্ষিণ পাড়া গ্রামের রেজাউল হক জানান, তার গ্রামে খাল আছে দুটি, কিন্তু খালের বেশির ভাগ অংশই ভরাট হয়ে গেছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য খুবই গুরুত্বপুর্ণ খাল ভদ্রাবতী। সাড়ে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ খালটি কয়েক বছর আগে খনন করা হলেও আবারও ভরাট হয়ে গেছে। কিন্তু খননের পর ভদ্রাবতী খালের অনেকাংশ আবারও ভরাট হয়ে গেছে।