রোদে পোড়া তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে যখন ভারী ঝুড়ি মাথায় নিয়ে সোহানা বেগমরা হেঁটে যান, তখন পায়ের তলার বালু আর শরীরের ঘাম যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গোমতী সেতুর নিচে এই বালুমহালে শ্রমিকদের প্রতিটি মুহূর্তই যেন বেঁচে থাকার লড়াই। তাদের কারও কাছেই আজকের দিনের আলাদা কোনো গুরুত্ব নেই। দূরে কোথাও হয়তো ‘মে দিবস’ উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে, কিন্তু জীবিকার কঠিন লড়াইয়ে দিন কাটানো এসব শ্রমিক জানেনই না শ্রমিক দিবস কী, কিংবা কেন এটি পালন করা হয়।
ভোর ৬টা। দিনের আলো ফুটতেই কুমিল্লার দাউদকান্দির নতুন ফেরিঘাটে বালুমহালের কর্মব্যস্ততা শুরু হয়। সিলেট ও সুনামগঞ্জ থেকে নদীপথে বোল্ডগেট করে আনা বালু আনলোডে ব্যস্ত ওঠে একদল মানুষ। দুপুর ২টা পর্যন্ত শ্রমিকরা টুকরি দিয়ে মাথায় বালু বহন করে নামান। প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম করে পুরুষরা মজুরি পান ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। আর নারীরা পান ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এই আয়ে কোনোমতে চলে তাদের সংসার।
এই শ্রমিকদেরই একজন সোহানা বেগম। তার বাড়ি সিলেটের হবিগঞ্জে। অসুস্থ স্বামী ও তিন মেয়েকে নিয়ে তিনি এখন দাউদকান্দির দোনারচরে ভাড়া বাসায় থাকেন। দেশে কাজ না থাকায় এক বছর আগে দুই মেয়ে ও মেয়ের জামাইকে নিয়ে এখানে এসে বালু শ্রমিকের কাজ শুরু করেন।
তিনি জানান, প্রতিদিন যা আয় হয় তা দিয়ে স্বামীর ওষুধ কেনা এবং দুই মেয়ে নিয়ে কোনোরকমে সংসার চালান। অনেক কষ্টে অর্থ জোগাড় করে বড় মেয়ের বিয়ে দিতে পারলেও অর্থাভাবে ছোট মেয়ের বিয়ে দিতে পারছেন না। অল্প আয়ে টিকে থেকে দেশেও টাকা পাঠাতে হয় তাকে।
একইভাবে সংগ্রাম করছেন সন্ধ্যা রানী। স্বামীর মৃত্যুর পর এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তিনি দাউদকান্দিতে আসেন। পাঁচ বছর ধরে বালুমহালে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, ‘আগে দিনে ২০০ টাকা আয় করেও সংসার ভালোভাবে চলে যেত। এখন সারা দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় করেও সংসার চলে না। তাই দিবসের চিন্তা করে লাভ নেই। কাজ না করলে না খেয়ে থাকতে হবে।’
পৌর সদরের সাহাপাড়া গ্রামের সজীব সরকার প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন।
তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন যা আয় হয় তা দিয়ে নিজে চলি, সংসার চালাই। অসুস্থ হলে বা কাজ না থাকলে আয় বন্ধ হয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘শ্রমিক দিবস কী এটাই আমি জানি না।’
একই কষ্টের কথা বলেন শহীদনগরের আকবর হোসেন। পাঁচ বছর ধরে বালুশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। তার আয়ের ওপরই পুরো সংসার নির্ভরশীল। নিজে শ্রমিক হয়েও শ্রমিক দিবসের কথা জানেন না তিনি।
আকবর বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে সংসার চালাতে হয়। প্রতিদিনের ইনকাম দিয়ে প্রতিদিন চলতে হয়। অসুস্থ হলে মানুষের কাছে হাত পেতে চলতে হয়। খুব কষ্টে চলতে হয়। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আমাদের কষ্ট দেখার মতো কেউ নেই।’
মরনশীল নামে আরেক শ্রমিক বলেন, ‘মে দিবস কী জানি না। কাম করে খেতে হয়। এখন কাম একদমই কম। অসুস্থ হলে দেশে চলে যাই, তখন ইনকাম থাকে না। তিন বেলার জায়গায় দুই বেলা খেতে হয়।’ একইভাবে সুমন বলেন, ‘কাজ করলে খাবার, নয় তো পেটে মাটিচাপা দিয়ে বসে থাকতে হয়। দিবস-টিবস কী জানি না।’
দিন দিন আয় কমে যাওয়ায় এসব শ্রমিক আরও বেশি সংকটে পড়ছেন। একই অভিযোগ করেছেন সোহানা, সন্ধ্যা, সজিব, আকবর, মরনশীল ও সুমনের মতো অনেকেই। পরিবারের খরচ মেটাতে তারা প্রতিদিন সংগ্রাম করেন। তাদের কাছে শ্রমিক দিবসের ছুটি বা অধিকার আদায়ের প্রশ্ন নয়, সবচেয়ে বড় বিষয় বেঁচে থাকা।