বরিশালে শহীদ সুকান্ত বাবু শিশু হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলেও প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি। এতে হাসপাতালটি চালু নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা এই বিশেষায়িত হাসপাতাল চালু না হওয়ায় বাড়তি চাপ পড়ছে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে স্বল্প শয্যার বিপরীতে কয়েকগুণ বেশি শিশু রোগী ভর্তি হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। এ অবস্থায় নতুন হাসপাতালটি দ্রুত চালুর দাবি জোরালো হচ্ছে।
ইতোমধ্যে হাসপাতালটি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধীনে পরিচালনার জন্য হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে জনবল নিয়োগ ও সরঞ্জাম সরবরাহ ছাড়া চালু করা সম্ভব হবে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু রোগীর চাপ অনেক বেড়েছে। ৪৫ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ শিশু ভর্তি হচ্ছে। রোগীদের সঙ্গে থাকা স্বজনদের মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার মানুষের উপস্থিতি থাকছে। চিকিৎসক ও নার্স সংকটের কারণে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এ পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালুর দাবি জানান স্থানীয়রা। দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। পরে গত ২৯ এপ্রিল হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার খলিলুর রহমান।
পরিদর্শনের সময় তিনি এক সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এসব কাজ সম্পন্ন করেছে। তবে এখনো জনবল নিয়োগের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতিও স্থাপন করা হয়নি।
স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, ২০০ থেকে ২৫০ শয্যার একটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল পরিচালনার জন্য চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও প্রশাসনিক কর্মী মিলিয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ জন জনবল প্রয়োজন। কিন্তু এখনো জনবল কাঠামো অনুমোদন পায়নি। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামও চূড়ান্ত হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অবকাঠামো নির্মাণ শেষে গণপূর্ত বিভাগ সেটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিত প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করে থাকে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু জনবল নিয়োগ ও সরঞ্জাম সংগ্রহ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধীনে শিশু হাসপাতাল পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা। সেই সক্ষমতা না থাকলে হাসপাতাল চালুর উদ্যোগ নিয়ে কোনো লাভ হবে না; ভবনটি ব্যবহারহীনভাবে পড়ে থাকবে।’
গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে প্রায় ১৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০ তলা ভিত্তির ওপর এই হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। প্রথম ধাপে চারতলা ভবন নির্মাণের কাজ করে ২০১৯ সালে সেবা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। অবশেষে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর গত বছরের শেষ দিকে ভবনটি ঠিকাদারের কাছ থেকে বুঝে নেয় গণপূর্ত অধিদপ্তর। বর্তমানে এটি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
নকশা অনুযায়ী, হাসপাতালের প্রথম তলায় জরুরি বিভাগ, রেডিওলজি, ডায়াগনস্টিক ও ওষুধ সরবরাহ ইউনিট থাকবে। দ্বিতীয় তলায় আউটডোর পেশেন্ট ডিপার্টমেন্ট (ওপিডি), থেরাপি, ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি বিভাগ। তৃতীয় তলায় নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), অপারেশন ব্লক ও অপারেশন-পরবর্তী সেবা ইউনিট। চতুর্থ তলায় প্রশাসনিক ব্লক, সাধারণ শিশু ওয়ার্ড, নবজাতক পরিচর্যা ইউনিট ও ক্যান্টিনসহ অন্যান্য সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম বলেন, ‘সাবস্টেশন স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আপাতত অস্থায়ীভাবে থ্রি-ফেজ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি চলছে।’ তিনি জানান, আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে হাসপাতালটি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মুশিউল মুনীর বলেন, শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসকও নেই। সীমিত জনবল দিয়ে এত রোগীর চাপ সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিশু হাসপাতালের জন্য আলাদা জনবল নিয়োগ না হলে সীমিত জনবল দিয়ে এই রোগীদের সেবা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। পাশাপাশি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শিশু হাসপাতালের দূরত্ব বেশি হওয়ায় চিকিৎসকদের যাতায়াতও কষ্টসাধ্য হবে।