দিনের শুরুতেই আকাশজুড়ে ছিল মেঘের আস্তরণ। থেমে থেমে পড়ছিল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। প্রকৃতির এই শান্ত সৌন্দর্যের মাঝেও থেমে নেই মানুষের যুদ্ধ।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) ভোর হতেই মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরের বিস্তীর্ণ ধানখেতে নেমে পড়েন কৃষকরা। কোথাও বাবা-ছেলে মিলে ধান কাটছেন, কোথাও ধানের আঁটি গুছিয়ে রাখছেন স্ত্রী। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া ও পাহাড়ি ঢলের শঙ্কায় ফসল বাঁচাতে পুরো পরিবার নিয়েই মাঠে সময় পার করছেন তারা।
গতকাল সকালে সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপাড় ঘুরে দেখা যায়, ধান কাটার মৌসুম এলেও এবার কৃষকের মুখে নেই স্বস্তি। আকাশে মেঘ জমলেই বাড়ছে দুশ্চিন্তা। শ্রমিক সংকট, বাড়তি মজুরি আর অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়েই নেমেছেন ধান কাটার কাজে। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে তাদের লড়াই। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাওরজুড়ে এখন একটাই ভয়–আবার যদি পানি বাড়ে! পাকা ধানের খেত তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কেটে আনা ধানও রোদ না থাকায় শুকানো যাচ্ছে না। কোথাও ধান পচে গেছে, কোথাও আবার অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে।
বিরইমাবাদ গ্রামের কৃষক আবদুল কাদির আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের এখন আর কোনো শান্তি নাই। ১০ কিয়ার জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে। অনেক কষ্ট করে চার কিয়ার মতো ধান তুলছি। শ্রমিক পাই না, নৌকাও পাই না। যা পাই, খরচ অনেক বেশি। তাই পরিবারের সবাই মিলে মাঠে কাজ করছি। এই ধান যদি বাঁচাতে না পারি, তাহলে সারা বছরের কষ্টই শেষ।’
আরেক কৃষক রমেন দাস জানান, পানির নিচে যাওয়া খেত থেকে যা ধান তোলা গেছে, তা খুবই সামান্য। তার ওপর সময়মতো শুকাতে না পারায় অনেক ধান নষ্ট হয়ে গেছে। রমেন দাসের পাশে দাঁড়িয়ে ধানের আঁটি বাঁধছিলেন তার স্ত্রী সুমি রানী দাস। ক্লান্ত চোখে তিনি বলেন, ‘ভোর হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠেই থাকি। বাপ-পুতে ধান কাইটা নৌকায় করে আনে, আমি আঁটি বাঁধি আর গুছাই। এখন একদিন দেরি মানেই বড় ক্ষতি। আকাশে মেঘ দেখলেই ভয় লাগে, আবার যদি বৃষ্টি নামে।’
শুধু পুরুষরাই নন, হাওরের মাঠে নারীদের অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো। কেউ ধান শুকাচ্ছেন, কেউ গুছিয়ে রাখছেন। কেউ আবার নৌকায় ধান তুলতে-নামাতে সাহায্য করছেন। অনেক জায়গায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরও দেখা গেছে পরিবারের সঙ্গে মাঠে কাজ করতে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, জেলার হাওরাঞ্চলে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৩৮ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে। কাউয়াদীঘি হাওরে ৪০০ হেক্টরের মতো হতে পারে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে আমাদের জরিপের কাজ চলছে। জরিপ শেষ হলে চূড়ান্ত ক্ষতিটা জানা যাবে।
ডুবে গেছে রীতা-ভূষণ দম্পতির স্বপ্ন
কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরে ডুবেছে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান। হাওরে এ বছর বৈশাখে ঘরে ধান তোলার আনন্দ নেই। ঘরে-ঘরে ভেজা ধানে গজিয়েছে অঙ্কুর। হাওরের বাতাসে পচা ধানের গন্ধ। কেউ বুক পানিতে, কেউ কোমর পানিতে নেমে ভেজা ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টায় আছেন। গতকাল বিলমাকশা খালে গিয়ে দেখা গেছে পানির নিচ থেকে ধান কেটে ঘরে তোলার শেষ চেষ্টা করছেন অনেক কৃষক।
এদের মধ্যে রয়েছেন অষ্টগ্রাম উপজেলার হালালপুর গ্রামের রীতা-ভূষণ দম্পতিও। অতি যত্নের ফসলগুলো আস্তে আস্তে নষ্ট হচ্ছে চোখের সামনে। তাই ভোরের আলো ফোটার আগেই পানিতে নেমে ধান কাটছিলেন তারা। এই দম্পতির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভূষণ চন্দ্র দাস নিজের এলাকা হবিগঞ্জের বুল্লা ইউনিয়নের হেলারকান্দি গ্রাম থেকে সুদে টাকা নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে এসে স্ত্রীর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। অষ্টগ্রামের কলমা ইউনিয়নের আলালপুর গ্রামে দুই একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন তিনি।
পানিতে নেমে অষ্টগ্রামের বাইলাকান্দি হাওরে পানিতে নিমজ্জিত ধান কাটতে কাটতে তিনি বলেন, ‘ধান কাটার শ্রমিক পাই না। যে মজুরি চায়, তা দেওয়ার মতো সামর্থ্য নাই। তাই নিজেরাই পানিতে নেমে ধান কাটতেছি। আমার কষ্ট দেইখা বউও বুক পানিতে ধান কাটতে নামছে। ছোট তিন বাচ্চা বাড়িতে রাইখা আমরা দুইজন ধান তুলি পানি থেকে।’
কাঁদতে কাঁদতে রীতা রানী দাস খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার সব স্বপ্ন পানিতে ডুবে গেছে। এ বছর আমি সংসার কীভাবে চালাব। তিন বাচ্চা নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে। সব ধান ডুবে গেছে। ভোরবেলা ধান পানি থেকে কাটার জন্য দুইজন বের হয়েছি। দুপুরের খাবারও খেতে পারিনি। আর কিছুই নাই। এ বছরটা ছেলেমেয়ে নিয়ে বাঁচব কীভাবে, ভগবানই জানে।’
এদিকে অষ্টগ্রামের কলমা ইউনিয়নের গাঙ্গিনা, করানি, উগলি, মইচচুরা, জলঢোপ, টোকেরখলা, কইলাকান্দি, কান্তা হাওরের ধান পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এই ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষক চরম আর্থিক সংকটে পড়বে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার কিশোরগঞ্জে ধান পানিতে তলিয়ে কৃষকের ২৫৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এ ছাড়াও হাওরের ৫৯ হাজার ৭১৫ জন কৃষকের ১৩ হাজার ২৮৭ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত হাওরে প্রায় ৭৩ শতাংশ ও নন হাওরে ৪০ শতাংশ জমি কর্তন করা হয়েছে।
অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি বিভাগ ও পাশাপাশি ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে। সেই কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সদস্য ও কর্মী রয়েছে। তাদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। আশা করি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরাই সরকারি সুবিধা পাবে। অষ্টগ্রামে মোট ২ হাজার ৭০৩ হেক্টর জমি সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলায় এক লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু হাওর এলাকার তিন উপজেলা–ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামেই আবাদ হয়েছে এক লাখ ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমি। এ বছর জেলায় প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।