রংপুরে জমে উঠেছে গরুর আবাসিক হোটেল। বিশেষ করে আসন্ন কোরবানিকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকারি গরু ব্যবসায়ীরা কোনো রকম ঝুটঝামেলা ছাড়াই নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে বাজার থেকে কেনা গরু রাখতে পারছেন। তবে এ ধরনের গরুর আবাসিক হোটেল হাতে গোনা কয়েকটি হওয়ায় ব্যবসায়ীদের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।
১০-১২ বছর আগের কথা। বাবা আনছার আলীর সঙ্গে গরুর হাটে যেতেন আশানুর ইসলাম। গরু কেনার পর সেগুলো রাখার জায়গা থাকতো না। ঝড়-বৃষ্টিতে গরু রাখতে গিয়ে বিপাকে পড়তেন ব্যবসায়ীরা। অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরমে প্রায়ই গরু অসুস্থ হয়ে পড়ত। ঠিক সেই সময় আশানুরের মাথায় আসে আবাসিক হোটেলের ধারণা। বিষয়টি বাবার সঙ্গে শেয়ার করেন তিনি।
কিছুদিন পর বাবা-ছেলে পরামর্শ করে তৈরি করেন গরুর হোটেল। বর্তমানে এই হোটেলের কদর দেশজুড়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা গরু ব্যবসায়ীরা আস্থা রেখে এখানে তাদের গরু রাখেন।
রংপুর নগরীর মডার্ন মোড় পার হয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে রাস্তার পাশে বারো আউলিয়া এলাকায় আশানুরের গরুর হোটেল। আগে এটি মডার্ন মোড়ে ছিল। রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হওয়ায় হোটেলটির অবস্থান পরিবর্তন করা হয়। ৫০ শতক জমি ভাড়া নিয়ে চলছে এই গরুর হোটেল, যেখানে প্রায় ৩৫০টি গরু রাখা যায়।
কেন গরুর হোটেল চালু করলেন- জানতে চাইলে আশানুরের বাবা আনছার আলী বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা গরু কিনতে আসে, কিন্তু একদিনে সব গরু কিনতে পারে না। দুই-তিনটি হাট ঘুরে গরু কেনে। তখন গরু রাখার জায়গা থাকে না। আমাদের হোটেলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ফেনী, বরিশালসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যাপারীরা আসে। হোটেল চালু হওয়ায় তাদের সুবিধা হয়েছে। তারা নিশ্চিন্তে এখানে ঘুমাতেও পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরিবারের সদস্য ছাড়াও বাইরের কিছু লোক কাজ করেন এখানে। মূলত তিনজন স্থায়ীভাবে কাজ করি। এ ছাড়া আরও কিছু লোক আছেন, যারা আসা-যাওয়া করেন, তাদেরও বেতন দেওয়া হয়।’
আয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার আগের চেয়ে এখন ভালো চলে। যা হয়, তা দিয়েই সংসার ভালোভাবে চলে যায়।’
চট্টগ্রাম থেকে গরু কিনতে আসা আয়নাল হক বলেন, ‘তিন দিন ধরে আছি। চার-পাঁচটি করে গরু কিনে এখানে রাখছি। গরু বেশি হলে একবারে ট্রাক লোড দিই। এখানে গরু রেখে নিশ্চিন্তে থাকতে পারি। শুধু রাখার জন্য ৫০ টাকা নেওয়া হয়, আর খাবার আমরা কিনে দিই। প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই হোটেলে গরু রাখি। হোটেল মালিকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। কোনো সমস্যা হয় না।’
ফেনীর ব্যবসায়ী নাসিরউদ্দিন বলেন, ‘গতকাল লালমনিরহাট থেকে চারটি গরু কিনেছি। আবার অন্য হাটে গরু কিনতে হবে। ট্রাকভর্তি না হওয়া পর্যন্ত চারটি গরু নিয়ে এলাকায় ফেরা যায় না। ফলে গরু নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। এই হোটেল হওয়ায় নিরাপদ জায়গা পেয়েছি। এখানে রেখে নিশ্চিন্তে বিভিন্ন বাজারে যাওয়া যায়।’
আজ সরেজমিনে ওই আবাসিক হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি বিভিন্ন রঙের গরু বাঁধা রয়েছে। পুরো হোটেলজুড়ে টাঙানো হয়েছে ফ্যান এবং পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। দিনের বেলায় আলো-বাতাস প্রবেশের জন্য লাগানো হয়েছে ফাইবার গ্লাস বা স্বচ্ছ পলিকার্বোনেট টিন।
অন্যদিকে গরুগুলো দেখভাল ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য রাখা হয়েছে ১০ থেকে ১২ জন কর্মচারী। প্রত্যেককে দৈনিক ৩০০ টাকা করে দেওয়া হয়।
কর্মচারী শেফায়েত উল্লাহ বলেন, ‘প্রতি বছর ঈদ এলে আমরা এখানেই কাজ করি। কিছু আয় হয়, যা দিয়ে ঈদ চলে যায়। যখন গরু বেশি থাকে, তখন আরও বেশি আয় হয়। কারণ বড় বড় পাইকাররা অতিরিক্ত বকশিশও দিয়ে যান।’
আশানুর ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন বাবার সঙ্গে গরু কেনাবেচা করছি। দেখতাম গরুগুলো বৃষ্টিতে ভিজে যায়, আবার অতিরিক্ত রোদে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখনই মনে হলো এভাবে গরু রাখার ব্যবস্থা করা যায় কি না। পরে বাবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি ঘর তৈরি করি। এরপর থেকেই শুরু হয় গরুর হোটেল। আগে প্রচার কম ছিল, তবে এখন মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। তাই ব্যবসায়ীরাও এখন আমাদের কাছে ভিড়ছেন।’
রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ পরিচালক ডা. মো. আবদুল হাই সরকার বলেন, ‘গরুর আবাসিক হোটেল অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। এখানে ব্যবসায়ীরা নিশ্চিন্তে গরু কিনে রাখতে পারছেন, আবার হোটেল মালিকও লাভবান হচ্ছেন। অন্যদিকে গরুগুলো অতিরিক্ত গরম ও বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাচ্ছে। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলে গরু কিনতে আরও উৎসাহিত হবেন। তাই আমরা এ অঞ্চলের গরুর হোটেল ব্যবসায়ীদের আরও বেশি উৎসাহিত করছি।’
সেলিম সরকার/অমিয়/