সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার। বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট সড়কটি ফাঁকা। ডক্টরস টাওয়ারের বিপরীত পাশেই বাইতুল সালাহ জামে মসজিদ। তবে দু-একটি বাদে আশপাশের সব চা-দোকানই বন্ধ। পাশের প্যারামাউন্ট টাওয়ারের নিরাপত্তাকর্মীরা বসেছিলেন। হঠাৎ গুলির শব্দে আঁতকে ওঠেন তারা। দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে দেখেন- দুজন আরোহীর একটি মোটরসাইকেল দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছিল। একটি রিকশা থেমে গেল। কাছে যেতেই দেখেন রিকশায় থাকা এক ব্যক্তির মাথা ও কান থেকে রক্ত ঝরছিল।
রাজধানীর বিজয়নগর বক্স কালভার্ট সড়কে গুলিবিদ্ধ ওই ব্যক্তি ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি। শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) বেলা ২টা ২৪ মিনিটে দুর্বৃত্তদের হাতে তিনি গুলিবিদ্ধ হন।
বক্স কালভার্ট সড়কে ই-সিকিউরিটিজ লিমিটেডের নিরাপত্তাকর্মী মো. হাফিজ বলেন, ‘জুমার নামাজ পড়েছি বাইতুল সালাহ জামে মসজিদে। ফিরে এসে দুপুরে খাবার খেতে বসেছিলাম। আমার সঙ্গে আরেকজন রতন গেটে বসা ছিলেন। আমি খাবার শুরু করতেই একটা গুলির শব্দ শুনতে পাই। সেই অবস্থায় উঠে বাইরে হই, সঙ্গে রতনও ছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘দেখলাম একটি মোটরসাইকেলে করে দুজন পালিয়ে যাচ্ছিল। আর রিকশা থেমে গেল। আমি মনে করেছিলাম ফাঁকা সড়কে ছিনতাই হতে পারে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখি একজন গুলিবিদ্ধ, তার মাথা ও কান বেয়ে রক্ত ঝরছিল। আর তার সঙ্গে থাকা একজন তাকে ধরে রাখছিল।’
নিরাপত্তাকর্মী রতন বলেন, ‘আমি গেটে বসা ছিলাম। যখন রিকশাটা যাচ্ছিল, তার পিছুপিছু ওই মোটরসাইকেলটিও যাচ্ছিল। রিকশাটি ডক্টরস টাওয়ারের সামনে বৈদ্যুতিক খুঁটির কাছে গেল, তখন মোটরসাইকেলটি একটু সামনে যায়। তখনই গুলির শব্দ শুনতে পাই। তবে আমি উঠে এগিয়ে যেতে চাইলেও পরে ফিরে আসি।’
গতকাল হাদিকে গুলির এই ঘটনার পর বক্স কালভার্ট সড়কে পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যান। ঘটনাস্থলে দেখতে পান চলন্ত রিকশা থেকে সড়কে রক্ত ঝরে পড়েছিল, সেটি প্রথমে বসার বেঞ্চ ও রশি দিয়ে ঘিরে রাখে পুলিশ। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরা এসে হলুদ ফিতা দিয়ে ঘিরে রাখেন এবং আলামত সংগ্রহ করেন। ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও যোগ দেন। থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা এলাকার বিভিন্ন ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহে নেমে পড়েন।
হাদিকে গুলি করার সেই সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, একটি নীল রঙের রিকশা চলছে। পেছনে একটি মোটরসাইকেল যাচ্ছিল। মোটরসাইকেলে দুজন আরোহী বসা ছিল। চালক ও আরোহীর দুজনই হেলমেট পরা ছিল। চালক নীল রঙের জিন্স প্যান্ট পরা ছিল। আরোহী কালো পোশাকে এবং শাল পেঁচানো ছিল। তাদের পেছনে একটু দূরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা যাচ্ছিল। বেলা ২টা ২৪ মিনিটে মোটরসাইকেলটি ওই রিকশার ডান পাশে গিয়ে চলন্ত অবস্থায় গুলি চালায়। এরপর মোটরসাইকেলটি দ্রুতগতিতে পালিয়ে চলে যায়। আশপাশের কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ড গুলির শব্দে ছুটে এসেছিল। কিন্তু হাদিকে বহনকারী রিকশাটি চলন্ত অবস্থায় ছিল।
গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বিজয়নগর বক্স কালভার্ট রোডের বাইতুল সালাহ জামে মসজিদের ঠিক বিপরীত পাশে দুটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারের খুঁটিসহ বেশকিছু এলাকায় হলুদ রঙের ক্রাইম সিন ফিতা দিয়ে ঘিরে রাখা ছিল। সড়কে ছিল রক্তের ছিটেফোঁটা দাগ। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি ভিড় ছিল উৎসুক জনতার। ঘটনাস্থলের সামনে ডিআর টাওয়ারের একাধিক সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ, পিবিআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। ওই এলাকার আশপাশের বিভিন্ন ভবনের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহে কাজ করছিলেন তারা। এদিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও ঘটনাস্থলে নিরাপত্তার নিয়োজিত ছিলেন।
সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের পরিদর্শক আবদুর রশীদ উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনাস্থলের তিন জায়গা থেকে রক্তের আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঘটনাস্থলে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম কাজ করছে। বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ চেষ্টা করছে।’