সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তার। খুব চঞ্চল মেয়ে, সারাদিন এলাকায় ঘুরেবেড়ায়। তাই এলাকাবাসী তাকে খুব আদর-স্নেহ করেন। গ্রামের আশপাশের মানুষ দোকান থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র এনে দিতে বললে সেটাও এনে দেয় ফাহিমা। স্বভাবসুলভ গত ৬ মে ফাহিমা প্রতিবেশী চাচা জাকিরের কথামতো দোকান থেকে দুটি সিগারেট নিয়ে তার ঘরে যায়। এই ঘরে যাওয়াই ফাহিমার জন্য কাল হয়। নেশাগ্রস্ত জাকিরের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে তার ওপর। এরপর চার বছরের এই শিশুটিকে ধর্ষণ করার সময় সে অজ্ঞান হয়ে পরে। অজ্ঞান হলে ফাহিমাকে গলাটিপে হত্যা করে জাকির। এরপর ঘরে থাকা একটি স্যুটকেসে মরদেহ লুকিয়ে রাখে।
গতকাল সোমবার রাতে শিশু ফাহিমা হত্যাকারী জাকির হোসেন (৩০) গ্রেপ্তার হওয়ার পর এমন লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।
সিলেটে মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত জাকিরের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এই ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়।
জাকির নিহত শিশু ফাহিমার প্রতিবেশী ও দূরসম্পর্কে চাচা। সোমবার রাতে তাকে সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গ্রেপ্তারের পর তাকে নিয়ে হত্যার আলামত উদ্ধার করে পুলিশ। জাকিরকে গ্রেপ্তারের পর তার শাস্তির দাবিতে মধ্যরাত পর্যন্ত থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। পরে জাকিরের বাড়িঘর ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধরা।
এদিকে জাকিরকে গ্রেপ্তারের পরই তার স্বীকারোক্তিমূলক একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে তাকে ফাহিমাকে হত্যার বর্ণনা দিতে শোনা যায়।
ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে জাকির বলেন, ‘সকাল ১০টা; সাড়ে ১০টার দিকে ফাহিমাকে দুটি সিগারেট আনাই। তখন আমার ঘর খালি ছিল। আমি তখন নেশাগ্রস্ত ছিলাম। আমি ইয়াবা খাই। তখন আমার মধ্যে কেনে যে অতো অমানুষ জাগিয়া উঠল, মেয়েটার প্রতি আমার খারাপ দৃষ্টি চলে যায়। পরে মেয়েটাকে আমি রেপ (ধর্ষণ) করতে চাইছলাম (চাই), কিন্তু তখন সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। এতে আমি ভয় পেয়ে যাই। ভয় পেয়ে গলাটিপে মেরে ফেলি। পরে ঘরের স্যুটকেসের ভেতরে রাখি। দুদিন পর দেখি গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে পরিবারের মানুষ জেনে যাবে এই চিন্তায় রাতে লাশ নদীতে ফেলে দেই।’
এই ভিডিও কোথায় ধারণ করা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, রাতে জাকিরকে গ্রেপ্তারের পর থানার ভেতরেই এই ভিডিও ধারণ করা হয়। এ সময় জাকিরকে আরও কয়েকজন জিজ্ঞাসাবাদ করতে শোনা গেছে।
তবে এই ভিডিও উৎস সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার (১২ মে) সিলেটের ডিসি উত্তর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন বিস্তারিত বর্ণনা করেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ও ডিসি (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তারের পর সে এই ঘটনার স্বীকারোক্তি দিয়েছে। আমরা জানতে পারি, শিশু ফাহিমা খুব চঞ্চল মেয়ে ছিল। এলাকায় ঘুরে বেড়াত। এলাকার সবাই তাকে আদর করেন। ৬ তারিখ সকালে জাকির ফাহিমাকে সিগারেট আনতে পাঠায়। তার স্ত্রী আগেই বাবার বাড়ি চলে গিয়েছিল। ফাহিমা সিগারেট নিয়ে আসার পর তার উপর কুদৃষ্টি পরে জাকিরের। তখন সে মেয়েটিকে তার নিজ বসত ঘরে দরজা আটকে ধর্ষণ করে। যদিও জাকির বলেছে সে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে। তবে মেডিকেল রিপোর্ট আসলে জানা যাবে ধর্ষণ হয়েছিল কি না। তবে শিশুটিতে ধর্ষণ করা অনেক সিমটম পাওয়া গেছে।
অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার বলেন, শিশুটি যখন অজ্ঞান হয়ে যায় তখন তাকে গলাটিপে হত্যা করে। প্রাথমিকভাবে তার ঘরে থাকা একটি ব্রিফকেসে শিশুটিকে ভরে উপরে রেখে দেয়। যখন এলাকাবাসী পুলিশসহ সকলে খুঁজাখুঁজি করছিল তখন সে ব্রিফকেসটি নামিয়ে খাটের নিচে রেখে দেয়। সেখান থেকে যখন গন্ধ বের হচ্ছিল তখন শিশুটির মরদেহ তার বাড়ির পাশের ডোবাতে ফেলে গুম করার চেষ্টা করে। তখন লাশটি না ডুবেনি, তাই সে ডোবার পাশে লাশটি রেখে চলে যায়। পরবর্তীতে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে সবকিছু অকপটে স্বীকার করে। এবং সে যে চাদর দিয়ে লাশটি মুড়িয়ে রেখেছিল, সেটিও উদ্ধার হয়েছে। ব্রিফকেসটিও উদ্ধার হয়েছে।
সাইফুল ইসলাম বলেন, তথ্যপ্রযুক্ত ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাকে আটক করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় আর কাউকে জড়িত পাইনি। তবে আমরা তদন্ত অব্যাহত রাখব। যদি কোনো ব্যক্তি এই ঘটনায় জড়িত থাকে তাকে আমরা আইনের আওতায় আনব। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। তাকে আমরা আদালতে সোপর্দ করব। আমরা চেষ্টা করব দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মামলার তথ্য-প্রমাণ সব সংগ্রহ করার। মেডিকেল রিপোর্ট আসলে পরে পুলিশ রিপোর্ট দিয়ে দেব। মেডিকেল রিপোর্ট আসলে ধর্ষণ মামলা যোগ হবে। পরবর্তীতে সরকার যদি চায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা যাবে।
নিহত শিশু ফাহিমা সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের দিনমজুর রাইসুল হকের মেয়ে। রাইসুল হক দিনমজুর। গত ৮ মে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে ফাহিমার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার দুদিন আগে ৬ মে সে নিখোঁজ হয়।
অমিয়/