একসময় দেশের বাজারে বিদেশি হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের রাজত্ব ছিল। এসব পণ্য সাধারণত উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে ব্যবহার করা হতো। দাম বেশি হওয়ায় বিদেশি হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য কেনার সক্ষমতা সাধারণ আয়ের মানুষের ছিল না বললেই চলে। সময়ের সঙ্গে চিত্র পাল্টেছে। বছর দশেক থেকে দেশের বাজারে হোম অ্যাপ্লায়েন্সের পণ্যের দাপট বেড়েছে। দেশেই গুণগত মানের হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য তৈরি হচ্ছে।
দেশে তৈরি হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের দাম আমদানি করা একই জাতীয় পণ্যের তুলনায় কম। এককালীন মূল্য পরিশোধের পাশাপাশি কিস্তিতে কেনারও সুযোগ আছে। এতে সাধারণ আয়ের পরিবারও হোম আপ্লায়েন্স পণ্য ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়েও এসব পণ্য বিক্রির শোরুম করা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়ায় এখন গ্রামের ঘরে ঘরে ফ্রিজ, ফ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে। বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহারও বেড়েছে।
ব্যবহারকারী বলেছেন, বর্তমান যুগে হোম অ্যাপ্লায়েন্স বা গৃহস্থালি পণ্যগুলো দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য। এগুলো আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ, নিরাপদ এবং আরামদায়ক করে তুলেছে। বাড়িতে বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের জন্য এসব পণ্যের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না।
রাজধানীতে করপোরেট হাউসের চাকরিজীবী সোমা রহমান খবরের কাগজকে বলেন, আমি চাকরি করি। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস। বাসায় আসতে আসতে রাত ৮টা বাজে। আবার সকালে ৭টার মধ্যে বের হতে হয়। এই ব্যস্ত জীবনে হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য ব্যবহার করতে না পারলে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়বে। আমার বাসায় ওভেনে রান্না করি। ওয়াশিং মেশিনে কাপড় পরিষ্কার করি। অনেক খাবার ছুটির দিনে রান্না করে ফ্রিজে রেখে দিয়ে প্রয়োজনমতো ওভেনে গরম করে পরিবারের সদস্যদের খেতে দিই। এভাবে এসব পণ্য আমার ও আমার পরিবারে প্রতিদিনের ব্যবহারের অংশ হয়ে উঠেছে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেন খুলনার ফুলতলা উপজেলার বাসিন্দা গৃহিণী রুমানা ইসলাম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, আমি দোকানের বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করি। সকালে ৯টা থেকে রাত ৯-১০ পর্যন্ত আমাকে বিক্রির কাজ করতে হয়। আমি ফ্রিজে খাবার রান্না করে রাখি। আমার প্রেশার কুকার আছে। এটা দিয়ে অল্প সময়ে রান্না করতে পারি। দেশি প্রতিষ্ঠানের তৈরি ফ্রিজ কিস্তিতে কেনার সুযোগ পেয়েছি বলে কিনতে পেরেছি। মাসে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা কিস্তি আসে। আমার স্বামীর কাছ থেকে নিতে হয় না। আমিই পরিশোধ করি।
যমুনা গ্রুপের গ্রুপ পরিচালক মনিকা ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, সময়ের সঙ্গে হোম অ্যাপ্লায়েন্সের পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। বছরে এ বৃদ্ধির হার প্রায় ২০-৩০ শতাংশ। মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, দেশব্যাপী বিদ্যুৎ সংযোগ ও ব্যস্ত জীবনকে সহজ করতে গৃহস্থালির নানা কাজে ফ্রিজসহ ব্যবহৃত হচ্ছে নানা ধরনের ইলেকট্রনিক্স হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হওয়ায় দেশীয় হোম অ্যাপ্লায়েন্সেস পণ্য ক্রেতার হাতের নাগালে এসেছে।
হোম অ্যাপ্লায়েন্স সামগ্রীর মূল্য ব্র্যান্ড, ফিচার এবং আকারের ওপর নির্ভর করে। বাজার ঘুরে দেখা যায়, আমাদের দেশে ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বা তার বেশি দামে ফ্রিজ পাওয়া যায়। ১৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা বা তার বেশি দামে ওয়াশিং মেশিন, ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা বা তার বেশি দামে মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা বা তার বেশি দামে রান্নার চুলা, ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ বা তার বেশি দামে এসি পাওয়া যায়। বাজারে বিভিন্ন দামের টেলিভিশন পাওয়া যায়। ১৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার মধ্যে টেলিভিশন বিক্রি হয়।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, হোম অ্যাপ্লায়েন্স সব পণ্যের চাহিদা এক না। ফ্রিজের যে চাহিদা এসির সেই চাহিদা তা না। তবে সব হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের চাহিদাই বাড়ছে। দেশি বিনিয়োগকারীরা এ খাতে আসছে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ফলে গুণগতমানের পণ্য এখন আমদানি করা পণ্যের চেয়ে কমে পাওয়া যাচ্ছে। সরকার থেকে আরও নীতি সহায়তা দিলে দেশি হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পের দ্রুত বিকাশ হবে।
তিনি আরও বলেন, এসব পণ্যের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ সচেতন না। হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের বিক্রি বাড়াতে হলে এসব পণ্য ব্যবহারের সুফল প্রচার করতে হবে। একই সঙ্গে দাম আরও কমাতে হবে। তাহলে বিক্রি কয়েকগুণ বাড়বে। পণ্যের চাহিদা বাড়লে নতুন নতুন উদ্যোক্তারা এ খাতে যোগ দেবে। বেকারত্ব কমবে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এফবিসিসিআই থেকে জানা যায়, বর্তমানে হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বাজারের আকার বছরে ২১ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বাজার প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে বড় হচ্ছে। বর্তমানে বাজারে পাওয়া যায় এমন প্রায় ৮০ শতাংশ হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য দেশেই তৈরি ও সংযোজন হয়। গত ১০ বছরে এটি ৬ থেকে ৮ গুণ বড় হয়েছে। এভাবে বাড়তে থাকলে আগামী ১০ বছরে এই শিল্প আরও ৩-৪ গুণ বড় হবে।
উদ্যোক্তারা দাবি করেন, বাংলাদেশের হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্প বর্তমানে দ্রুত বর্ধনশীল এবং সম্ভাবনাময় শিল্প খাত। আর এই প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে বেসরকারি খাত। তার মধ্যে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করছে ইলেকট্রনিক্স শিল্প। দেশীয় ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তিপণ্য খাতের বিকাশের ফলে বিপুল পরিমাণ পণ্যের আমদানি কমায় ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে। এ শিল্প হয়ে উঠেছে সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তিপণ্য রপ্তানি হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে আরও বেশি দেশের হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য পৌঁছে যাবে এমন দাবিও করেছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যাপকভাবে কর অব্যাহতি কমানো হতে পারে। এ খাতের বেশির ভাগ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। কর অব্যাহতি প্রত্যাহার করা হলে কাঁচামালের দাম বাড়বে। ফলে এই শিল্প কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা।
উদ্যোক্তারা বলেন, আমরা এখনো দেশের অভ্যন্তরে কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারিনি। আশা করি, সরকার বিষয়টি বিবেচনা করে আগামী বাজেটে রাজস্ব ছাড়ের সুবিধা বহাল রাখবে।