প্রবন্ধ রচনা
(গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশের পর)
শ্রমের মর্যাদা
ইসলামে শ্রমের মর্যাদা: রাসুল (সা.) বলেছেন- ‘নিজ হাতে কাজ করার মতো পবিত্র জিনিস আর কিছু নেই।’
ইসলাম ধর্মে শ্রমের গুরুত্ব ও শ্রমিককে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) নিজেও শ্রমিকদের মতো কাজ করেছেন। রাসুল (সা.) আরও বলেছেন-
‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার পাওনা পরিশোধ করে দাও।’ তাই একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইসলামে শ্রমের মর্যাদার স্বীকৃতি পেয়েছে। পৃথিবীতে কোনো শ্রমেরই মর্যাদা কম নয়।
শ্রমের সুফল: প্রবাদে আছে- ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’
পৃথিবীতে কাজ বলতে যত কিছু আছে সবকিছুই সবার জন্য করণীয়। পরিশ্রম করা মোটেই সম্মান হানিকর নয়। শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রকার শ্রমের মাধ্যমেই ব্যক্তি ও জাতি মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। পৃথিবীতে যে জাতি যত বেশি পরিশ্রমী সে জাতি ও দেশ তত বেশি উন্নত। প্রবাদে আছে-
‘পরিশ্রম ধন আনে পুণ্য আনে সুখ।’ শ্রমবিমুখ জাতির পতন অনিবার্য। শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলেই পরিশ্রমের প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব।
শ্রম ও সভ্যতা: কথায় বলে- ‘Industry is the mother of good luck.’ মানব সৃষ্টির পর থেকে শ্রমের যে অঝোর ধারা শুরু হয়েছে, আজও তা শেষ হয় নাই। পরিশ্রম যে শুধু সৌভাগ্যের নিয়ন্ত্রক তা নয়। সভ্যতা বিকাশের নিয়ন্ত্রক। পৃথিবীকে সুন্দর করার এবং মানুষের বাসযোগ্য করার প্রচেষ্টা হচ্ছে পরিশ্রমের ফল। বাইরের দেশগুলোর মানুষ পরিশ্রমী বলেই তারা আজ উন্নত ও সুসভ্য জাতি হিসেবে পরিচিত। মোট কথা শ্রমের মাধ্যমে সৌভাগ্য গড়ে ওঠে।
আত্মিক ও মানসিক উন্নতি: ইংরেজিতে বলা হয়- ‘An idle brain is the workshop of evil.’ শ্রমের ফলে মানুষের আত্মিক ও মানসিক উন্নতি ঘটে। কর্মজীবী মানুষ কখনো অপকর্মের সুযোগ পায় না। মানসিক উন্নতিও শ্রম ছাড়া হয় না।
আরো পড়ুন : শ্রমের মূল্য প্রবন্ধ রচনার ৬টি পয়েন্ট, ১ম পর্ব, নবম-দশম, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার বাংলা ২য় পত্র
প্রতিভা বিকাশে শ্রম: ‘Man is the architect of his own fate.’
প্রত্যেক মানুষের মাঝেই রয়েছে তার সুপ্ত প্রতিভা। শ্রমই মানুষকে সুন্দর ও সার্থক করেছে। পৃথিবীতে যেসব প্রতিভাবান লোক আছেন, তারা সবাই কঠোর পরিশ্রম করেই বড় হয়েছেন। ফুলের মতোই ছড়িয়ে পড়ে তার সৌরভ। নিজের ভাগ্যকে মানুষের নিজেরই নির্মাণ করতে হয়। আর এ ভাগ্য নির্মাণের একমাত্র হাতিয়ার হলো তার পরিশ্রম।
শ্রম বিমুখতা: কবির ভাষায়-
‘বিশ্ব পিতার মহা কারবার এই দিন দুনিয়াটা
মানুষ-ই তাহার মহামূল্যবান কর্ম তাহার খাটা’।
শ্রম বিমুখতা ও অলসতা জীবনে বয়ে আনে এক অভিশাপ। শ্রমের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ঘটেছে, উঁচু-নিচু ভেদাভেদ সৃষ্টির কারণে। বিখ্যাত মনীষী কার্লাইল বলেছেন, ‘আমি মাত্র দুই প্রকৃতির লোককে সম্মান করি, সম্মানের যোগ্য তৃতীয় লোক নেই।’ প্রথমত, ‘আমার সম্মানের পাত্র ওই কৃষক এবং শ্রম শিল্প, যিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করেন। মানুষ হয়ে মানুষের মতো জীবনযাপন করেন। ওই যে পাণ্ডুর বদনমণ্ডল, ওই যে ধূলি-ধূসর দেহ, ওই যে কর্মকঠোর লোক, সে আমার কাছে শ্রদ্ধার যোগ্য।’ দ্বিতীয়ত, আমার সম্মানের পাত্র তিনি, যিনি আত্মোন্নতি সাধনে নিয়ত রয়েছেন, যিনি শরীরে নয় আত্মার খাদ্য সংস্থানে, জ্ঞানধর্ম অনুশীলনে ব্যাপৃত আছেন, এ দুই ব্যক্তি আমার কাছে ভক্তির যোগ্য।
শ্রম সম্পর্কে ধারণা: আমাদের অনেকের ধারণা পরিশ্রম আত্মসম্মানের হানিকর। কিন্তু এসব ধারণা নিতান্ত ভ্রান্ত ও ভুল। শারীরিক শ্রম যে অমর্যাদাকর নয় এবং কোনো কাজই যে ক্ষুদ্র নয় এ সত্যটি আমরা ভুলেই যাই। অনেকের মতে, শ্রমজীবী মানুষ অর্থাৎ চাষি, মজুর, শ্রমিক সবাই নেহায়েত ছোটলোক, কিন্তু দেশ ও জাতিকে রক্ষার দায়িত্ব তো তাদেরই। বাইরের দেশের লোকদের কাছে এরাই জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের কাছে ছোট-বড় কোনো ভেদাভেদ নেই। আর এ কারণেই তারা অগ্রগতি লাভ করে থাকে। একজন মনীষী বলেছেন-
‘জীবনকে যদি তুমি ভালোবাসো তাহলে শ্রমের অমর্যাদা করো না, কারণ জীবনটা শ্রমের সমষ্টি দিয়ে তৈরি।’
ব্যক্তিগত জীবনে শ্রম: শ্রমবিমুখ অলস ব্যক্তি বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত থাকে। প্রত্যেক মানুষই নিজ কর্মক্ষেত্রে কঠোরভাবে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহের প্রয়াস পায়। সে জন্যই আমাদের জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই শ্রমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং পরিশ্রম ব্যক্তিগত জীবনেও গৌরবের চাবিকাঠি। তাই মনে রাখতে হবে- ‘Failure is the pillar of success.’
শ্রমিক লাঞ্ছনা: ‘তাঁতী বসে তাঁত বুনে, জেলে ধরে মাছ, বহুদূর প্রসারিত এদের বিচিত্র কর্মভার, তারি পরে ভর দিয়ে চলিতেছে সমস্ত সংসার।’ সমাজের ওপরের স্তরের মানুষ যারা, তারা করেছে সম্মানজনক কাজ, গৌরবময় কাজ, সমাজের সব সুযোগ-সুবিধা নিজেরা আয়ত্ত করে তারা নিচুশ্রেণির মানুষদের নিক্ষেপ করছে অপমান আর ঘৃণার অন্ধকারে। অথচ এই নিচুশ্রেণির শ্রমিকরা চিরকালই ঘাটে ঘাটে বীজ বুনেছে। তারা বক্ষ বিদীর্ণ করে সোনার ফসল ফলিয়েছে।
(বাকি অংশ পরের সংখ্যায় প্রকাশ হবে)
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, উত্তরা, ঢাকা
কবীর