ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
কুড়িগ্রামে বিজিবির অভিযানে ১৯১ বোতল ভারতীয় মদ ও ৪২ বস্তা জিরা জব্দ সরকারদলীয় এমপিদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ফাইনালে যে একাদশ নিয়ে নামছে বাংলাদেশ সোনারগাঁওয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে র‌্যালি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন রবিবার দারাজ ৬.৬ মিড-ইয়ার শপিং ফেস্টে থাকছে আকর্ষণীয় অফার, এক্সক্লুসিভ ব্র্যান্ড ডিসকাউন্ট ও পুরস্কার গোপালগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জন সচেতনতামূলক র‌্যালি যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ফরিদপুরে আমের প্রলোভন দেখিয়ে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণ, অভিযুক্ত আটক মাদারীপুরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও র‍্যালি অনুষ্ঠিত জাতীয় ফুটবলার রহমত মিয়ার বিরুদ্ধে স্ত্রী ও শাশুড়িকে মারধরের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি রামিসা হত্যা মামলার রায় রবিবার, হতাশ আছিয়ার মা ঢাকার পরিবেশ নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা জানালেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বিএনপি তিন মাসে অজনপ্রিয় সরকারে পরিণত হয়েছে: আসিফ মাহমুদ ভোলায় যুবদলের নবগঠিত কেন্দ্রীয় কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে আনন্দ মিছিল ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে ১১ জনকে পুশইনের চেষ্টা, দিনাজপুরে বিজিবির বাধা কী করে বুঝবেন আপনি মেন্টালি ফিট মেসির চোট নিয়ে যা বললেন স্কালোনি হিলি সীমান্তে ভারতীয় ৫ নাগরিককে পুশইনের চেষ্টা, রুখে দিলো বিজিবি যে কারণে মুভি দেখব মহাকাশে যাচ্ছেন প্রথম শারীরিক প্রতিবন্ধী নভোচারী সময়ের সঙ্গে বদলান লিডারশিপ স্টাইল পঞ্চগড়ে পুশইনের শিকার ১০ জন, নিচ্ছে না কোনো দেশ শিবালয়ে ভিক্ষুককে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পরে চেইন ছিনতাই জীবের আবাসস্থল অধ্যায় থেকে ২টি অনুশীলনীর প্রশ্ন ও উত্তর, ২য় পর্ব, পঞ্চম শ্রেণির বিজ্ঞান সিলেট সীমান্তে জনগণকে সাথে নিয়ে বিজিবির মাইকিং ও টহল বৃদ্ধি গাড়ির দরজা খুলতেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষী থাকল শহর দীর্ঘ ভ্রমণের আগে গাড়ির প্রস্তুতি শ্রেয়াসের প্রত্যাবর্তন, তিলকের উত্থান, আর ১৫ বছরের বিস্ময় সূর্যবংশী ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ
Nagad desktop

ধারাবাহিক উপন্যাস তার নাম রাখিও স্বাধীনতা

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫, ০৯:৫২ এএম
তার নাম রাখিও স্বাধীনতা
গ্রাফিকস: নাজমুল মাসুম
[ষষ্ঠ পর্ব]
 
বাঙ্গালীর ইতিহাস হাজার বছরের পুরাতন। ঋগে¦দের ঐতরেয় আরণ্যকে জাতি হিসেবে তাদের নাম কর্তিত আছে। প্রায় চার হাজার বছর আগে লিখিত এ গ্রন্থের লিপি প্রমাণ করে, ভূপৃষ্ঠে কোনো জাতি হিসেবে সম্ভবত বাঙ্গালীর নামই প্রথম ইতিহাসে স্থান পায়। কারণ তারাই ছিল এ অঞ্চলের ভূমিপূত্র। কিন্তু বাঙ্গালীর জন্য দু:খ হলো, ইতিহাস সবসময় শাসিত হিসেবেই তাদের নাম লিপিবদ্ধ করেছে, শাসক হিসেবে নয়।
অবশ্য এ বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুগে যুগে তারা প্রতিবাদের ঝান্ডা উচ্চকিত রেখেছে। আর্যদের পাক বঙ্গ ভারত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাজা সগর এর নেতৃত্বে গঙ্গা-ভাগীরথী তীরে প্রথম বাঙ্গালীরাই সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বন্ধ হয় বঙ্গ ভ‚মে আর্যদের অভিযান। বিনিময়ে আঙুরফল টক-এই প্রবাদ সার্থক করে বৈদিক গ্রন্থসমূহে বাঙ্গালীদের বলা হয় “বয়াংসী বঙ্গ পদেশ্চারা।”-বাঙ্গালী পায় নীচু জাতের তকমা।
এরপর শাসকের পরিবর্তন হয়েছে, ধর্ম ও সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু বাঙ্গালীরা শাসিতই থেকে গেছে, থেকে গেছে অবহেলিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত নীচু জাত হিসেবে। বৈষম্য ও বঞ্চনার এই ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় তারা পাল আমলে শাসকদের ধর্ম অবলম্বন করে বৌদ্ধ হয়, সেন আমলে হয় হিন্দু, ১২০৬ সালে বাংলায় ইসলামের আগমন হলে তারা হয় মুসলিম। কিন্তু কোনোদিন শাসক শ্রেণি হয়ে উঠতে পারে নি।
তাই বাঙ্গালী হিন্দু, মুসলিম, পাহাড়ী, সমতলী সবারই একই প্রশ্ন-আরেকবার শাসকের পরিবর্তন হলে তাদের কি বা আসে যায়।
উদালিয়া চা বাগানের শ্রমিকদের সাথে মিলবার আগে ঢাকা থেকে আসা এ অঞ্চলের গবেষকের কথা এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিল সবাই।
রুকুর মনে হলো, এ তো শুধু এ অঞ্চলের কথা নয়, গোটা দেশের মনের কথা। যদি স্বৈরাচারের বিদায়ের পর নতুন আর এক শাসক শ্রেণীর আগমন হয়, যদি শাসিত শ্রেণীর আর্থ-সামাজিক বৈষম্য আর বঞ্চনা আগের মতোই চলতে থাকে তবে এ অভ্যুত্থান হয়ে লাভ কি? তাই নতুন কোনো শাসক শ্রেণি নয়, এ দেশের মানুষের চাই নতুন এক রাজনৈতিক- সামাজিক-অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত।
চা বাগান শ্রমিকদের নেতার সাথে সংলাপেও এই কথাই বললেন তিনি,
-প্রায় দু’শ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের বৃটিশরা চা-বাগানের শ্রমিক হিসেবে বিহার, দাক্ষিণাত্য, হিমাচল প্রভৃতি জায়গা থেকে নিয়ে আসে। নিয়ে এসে ভাগ্যবিড়ম্বিত এসব মানুষদের অনেকটা দাশ হিসেবে এইসব চা বাগানে কাজে লাগানো হয়। তারপর একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠী নিজেদের পরিচয় পরিচিতি ভুলে গিয়ে, মুক্ত পৃথিবী থেকে দূরে চা-বাগানের ঘেরাটোপে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস করতে থাকে। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে তারা অংশ নেয়, পাকিস্তান হয়। তারপর একাত্তুরে মুক্তিযুদ্ধেও তারা অংশগ্রহন করে, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। তারপরের সব সংগ্রামেও তারা পথে নামে, কিন্তু দেশ বার বার স্বাধীন হলেও তারা পরাধীন রয়ে যায়।
একটানা বলে হাঁফাতে থাকেন মদেশীয় গোষ্ঠীর এ জননেতা।
টং এর মতো বাগানের মাঝখানে ঘর তার। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশী না থাকলেও চমৎকার ইংরেজি বলতে পারেন তিনি। স্মৃতি হাতরে তিনি বলেন,
-এ চা-বাগানের প্রথম ম্যানেজার ছিলেন ইংরেজ। আসলে তখন সব চা-বাগানেই ইংরেজরা ছিলেন। তাই সে যুগের চা শ্রমিকরা কমবেশি সবাই শুধু ইংরেজদের ভাষা নয়, তাদের ধর্মও চর্চা করতো। কিন্তু ইংরেজি জানা আর খ্রিষ্টান হওয়া তাদের সামাজিক কি অর্থনৈতিক কোনো অবস্থার কোনা পরিবর্তন আনতে পারে নি।
নেতার বাঙ্গালীর ইতিহাসের কথা আবার মনে পড়ে। আর্থ-সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের প্রয়াসে তারা যুগে যুগে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ -খ্রিষ্টান সবই হয়েছে, কিন্তু যে অন্ধকারে তারা ছিল, সে অন্ধকার ঘনীভ‚ত হয়েছে কেবল। তাদের জীবন পথে আলোর প্রদীপ উদয় হয় নি কোনোদিন। তাই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আর একটি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের মনোজগতে কতটুকু আলোড়ন তোলা যাবে, সন্দেহ করে নেতা। অথচ ঢাকা শহর থেকে তারা এ প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসেছে জনগণকে স্বৈরাচারের বৈষম্যের বিরুদ্ধে একাট্টা করতে। 
যদি তাদের বর্তমান অর্থনৈতিক, সামাজিক দুরবস্থা, বাঁচা মরার অধিকার হীনতা, অধিকারহীনতার কারণ সম্পর্কে সচেতন করানো যায়, সচেতন করে তার প্রতিকারের জন্য শহরে গ্রামে অন্য বঞ্চিত বিশেষত কোটা বৈষম্যের শিকার জনগোষ্ঠীর সাথে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে মাঠে নামানো যায়, যুগপৎ আন্দোলনে ফ্যাসিজম তথা গোষ্ঠীতন্ত্রের রাজপ্রাসাদ ভেঙে তছনছ হয়ে যেত। কিন্তু এখন নেতার একথা ভাবতে লজ্জা হচ্ছে যে, এইসব লোকজন যুগে যুগে বঞ্চনা আর বৈষম্যের শিকার হয়েছে, তখন ছাত্র-জনতা কেউ তাদের জন্য মাঠে নামেনি। আজ যখন শিক্ষার্থীরা, মূল জনগোষ্ঠীতে তাদের অভিভাবকেরা যখন কোটা বৈষম্যের শিকার হয়েছে, তখন এইসব যুগান্তরের বঞ্চিতদের বৈষম্য আর বঞ্চনার সবক দিয়ে আন্দোলনে যোগদানের আহ্বান জানাতে এসেছে।
লজ্জায়, আত্ম অপমানে নিজের ভেতর নিজে ডুবে যেতে ইচ্ছে হলো নেতার। চারপাশে চা বাগানের সবুজ, উপরে ছায়াবৃক্ষের শাখায় মলয় সমীরণ দোলা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার মনে হলো, আত্মগøানির অনল বুঝিবা সেই বাতাসে দ্বিগুণ জ্বলে উঠ্ছে।
বঞ্চনায়, বৈষম্যে ক্ষত বিক্ষত হতে হতে বড় হওয়া এ গ্রামীণ নেতা করুণার চোখ মেলে তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। সিরিল মূর্মু তার নাম। সত্তরোর্ধ দেহ এখনো ভেঙে পড়ে নি। হয়ত যুগের ঘাত প্রতিঘাত তার মন আর শরীরকে সর্বংসহ করে তুলেছে। সাদা একটি লুঙ্গির উপর সাদা রঙের আলোয়ান পড়েছেন তিনি। তিনি এখানে প্রবীণ। তার অতিথিরা অধীত জ্ঞান ছাড়া, শুধু বয়সে নয়, প্রাজ্ঞতা আর অভিজ্ঞতায়ও হয়ত নবীন। হয়ত সেজন্যই বাঙালীর চিরকালীন অভিভাবক সত্তা তার মধ্যে জেগে থাকল সারাক্ষণ। একটি প্রশ্রয়, একটি নির্ভরতার হাসি তার মুখে জেগে উঠলো নতুন চরের মতো।
সিরিল মূর্মূর চোখে মুখে ফুটে থাকা এ নির্ভরতা হয়তো রুকুকে প্রশ্ন করতে প্রাণিত করে থাকবে। এবং এ প্রশ্ন করেই ভুলটা, আসলে সবার জন্য বিশাল এ শিক্ষার আয়োজন করলো সে,-
-আপনারা যুগে যুগে শোষণের শিকার হয়েছেন, এখন আমরা নিজেরা শোষিতের দলে, বঞ্চিতদের দলে, বৈষম্যের শিকারদের দলে পড়ে বুঝতেছি, আপনাদের যুগের পর যুগ বয়ে বেড়ানো কষ্ট।
-প্রবীণ মুখে কষ্টের হাসি। কিন্তু সক্রেটিসের পথের ধারের লাইসিয়াম ক্লাশরুমের মতো, যেন বা বোধী বৃক্ষতলে ভিক্ষুদের উদ্দেশ্য গৌতম বুদ্ধের বাণীর মতো তিনি এমন কিছু উচ্চারণ করলেন, যা পৃথিবীর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও পড়ানো হয় নি,-
-আপনি, আপনারা শোষিতের দলে জানলাম। কিন্তু আমরা তো শোষিত নই।
মৃদু উত্তেজনা বয়ে গেল ছোট্ট জমায়েতে। “বলে কি এ লোক?” রুকু বললো,
-যদি একটু বুঝিয়ে বলতেন। 
আমি তো আপনাদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িনি। জীবনের পাঠ থেকে যতটুকু জানি, সমাজে ভূমি আর উৎপাদনের মালিকানা এবং রাষ্ট্রে ক্ষমতার মালিকানা থেকেই শোষক শোষিতের উৎপত্তি। যারা এই মালিকানার মালিক হয় তারা হয় শোষক আর যারা মালিকানা বঞ্চিত হয় তারা হয় শোষিত। কাজেই শোষিত হওয়ার সাথে মালিকানা হারানোর ব্যাপারটি জড়িত। কিন্তু যাদের কোনোদিন, কোনো কিছুর মালিকানা ছিল না, তাদের সেই মালিকানা হারানো বা শোষিত হওয়ার যোগ্যতা কোথায়?
কেউ কোনো কথা বলে না। রুকু, নেতা দু’জনেরই ইচ্ছে হলো, সমস্ত প্রটোকল ভঙ্গ করে প্রকৃতির এই শিক্ষকের পায়ে লুটিয়ে পড়ে।
অবস্থাদৃষ্টে প্রবীণ নেতা আবারো এগিয়ে আসেন। বলেন, 
-এসব যদি আপনারা জানেন ভবিষ্যতে আপনাদের, আমাদের এবং দেশের লাভ হবে, তাই বললাম। তবে নিজেরা বরাবর বঞ্চিত থাকলেও অতীতের মতো এই আন্দোলনেও আমরা আপনাদের সাথে আছি। আমরা, চা বাগানের শ্রমিকরা একযোগে মাঠে নামার অপেক্ষায় থাকবো কথা দিলাম। আমাদের তো হারানোর কিছু নেই। চলুন, আমাদের জনগণের সাথে কথা বলবেন, চলুন।
রুকু, নেতা, ঢাকা থেকে আসা সবার পা যেন চলতে চাইছিল না। তবু উঠল তারা, তবু পথ চলল। চলতে গিয়ে বার বার কানে বাজতে লাগলো, “আমাদের শোষিত হওয়ার যোগ্যতাটুকুই নাই।” কি মারাত্মক কথা!
পাহাড় জুড়ে চায়ের বাগান। সবুজ পত্র পল্লবে আলো পড়ে বিম্বিত হচ্ছে চারিদিক। তারই মাঝে শ্রমিকরা সবুজ পাহাড়ের গায়ে চরণশীল মেষের মতো ফ্রেমবন্দি হয়ে আছে।
এই অসহ্য রকম সুন্দরের মাঝখানে একদল শ্রমিকের সাথে বৈষয়িক অসুন্দরের আলাপ। মন বলে ‘না,’ তার উপর একটু আগে জীবনের যে শিক্ষা অর্জন হয়েছে, এখন পাও আর চলছে না। তবু নতুন ওস্তাদ সিরিল মূর্মূর পেছন পেছন রুকুরা শ্রমিকদের মাঝে এসে পড়ল। এত পথ-ঘাট পাড়ি দিয়ে তাদের সাথে কথা বলতেই তো এখানে আসা।
কয়েকশ শ্রমিক সারি সারি বসে আছে। এখানে চা-পাতা তোলার শ্রমিক, চা-প্রক্রিয়াজাত করার শ্রমিক, বাগানের কর্মচারী, কৃষিজীবী, মুটে বাহি শ্রমিক সবাই আছে। এখানে ওঁরাও, সাঁওতাল, মদেশীয়া, বাঙ্গালী সবাই আছে। চা-শ্রমিকদের অধিকাংশই খ্রিষ্টান আর হিন্দু, কিন্তু পাশের উদালিয়া বিল থেকে আসা কৃষি শ্রমিকেরা মুসলিম। এখানে পুরুষের চেয়ে মহিলারা সংখ্যায় বেশী আর সবচেয়ে বড় কথা, এখানে ঘোর কৃষ্ণ মানুষের পাশাপাশি একেবারে ইওরোপিয়ান চেহারার সাদা শ্রমিকেরাও আছে। রুকু না বুঝলেও নেতা বুঝলো, এ হলো বাগানের প্রাচীনকালের ইউরোপীয়ান মালিক বা ম্যানেজারদের কীর্তি!
তবে রুকু সহ সবাই বুঝতে পারলো, তাদের সামনে বাঙ্গালী সমাজের একটি জীবন্ত ফটোগ্রাফ, স্থান এবং কাল যা একসাথে ধারণ করেছে। তারা চেয়েছে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ খ্রিষ্টান, সাদা-কালো হয়ে একটু ভালো ভাবে সমাজে বেঁচে থাকতে, কিন্তু দিনের শেষে সবাই বাঙ্গালী হয়েই বেঁচেছে। জাতে ওঠা, ক্ষমতাসীনদের দলভুক্ত হওয়া আর হয়নি কারো।
রুকুর ভয় সত্য হলো। ওরা কথায় কথায় বললো, যুগে যুগে বঞ্চনা আর বৈষম্য থেকে মুক্তির আশায় আমরা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সব হয়েছি, নতুন নতুন ক্ষমতায় আসা দলের সমর্থক হয়ে মাঠে নেমেছি -কিন্তু কখনো তারা আমাদেরকে তাদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করেনি। আমরা বাঙ্গালী ছিলাম, বাঙ্গালীই রয়ে গেছি। আর হ্যাঁ, আমরা “বাঙ্গালী” বলতে যুগে যুগে, স্থানে স্থানে ধর্মীয়, জাতীয় এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসীনদের হাতে বঞ্চিত মানুষদের বোঝাই। এখন নতুন বিপ্লব হলে, আমরা কি বিপ্লবীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবো, না কি যথারীতি বাঙ্গালীই থেকে যাবো?
রুকুরা বিপর্যয়ের মধ্যেও হাফ ছেড়ে বাঁচলো-বাঙ্গালী কোনো গালি নয়-এটি বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্য নাম!
রুকুর ভাগ্য ভালো, ওরা কোনো প্রশ্ন করলো না। কিন্তু রুকুর মনে হলো, ও উত্তর দিতে পারুক না পারুক, অপমানিত হোক না হোক -ওরা যেন প্রশ্ন করে। কারণ আল্লাহ্ পানাহ দিক, ওদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে শতাব্দীর পর শতাব্দীর বঞ্চনায় জীবনের প্রতি তাদের কোনো জিজ্ঞাস্য আর অবশিষ্ট নেই।
এসময় নেতা একজন হাড় জিরজিরে শ্রমিককে তার নাম জিজ্ঞেস করলে বলে,
-বিজয় মুন্ডা।
- আচ্ছা বিজয়, তোমরা চা বাগানে কাজ করো কত বছর?
- প্রায় সারাজীবন, এর আগে আমার বাবা, তার আগে তার বাবাও এখানে চাকুরি করতো।
-তোমরা যে বেতন পাও তাতে চলে?
-চলবে না কেন? আমরা বাগানের শ্রমিকদের বস্তিতে থাকি,বাচ্চারা বাগানের প্রাইমারি স্কুলে পড়ে, আর দুইবেলা খেতে পাই।
-প্রাইমারীর পর ওরা কোথায় পড়তে যায়?
-চা বাগানের কাজের জন্য আর পড়ালেখার দরকার কি? আমার ছেলে তো আমার মত বাগানের শ্রমিকই হবে, পড়াশোনা করে তো জজ -ব্যারিস্টার হবে না।
-কেন হতে পারবে না?
-এইসব স্বপ্ন দেখাবেন না, এতে শুধু স্বপ্ন ভঙ্গের আঘাতই পাবো, আমাদের শত জনমের পাপ, তার প্রায়শ্চিত্ত আমাদেরই করতে দেন।
রুকুর চোখ ফেটে জল বের হলো। জীবন্মৃত শব্দটি সে ব্যাকরণের বইতে পড়েছে। আজ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে এমন এক মানুষ, এমন একদল মানুষ যারা জীবনের আশা-নিরাশা-স্বপ্ন সব জলাঞ্জলি দিয়ে শুধু বেঁচে থাকার দায় মেটানোর জন্য যন্ত্রের মতো বেঁচে থাকছে। এরাই এই চা বাগানে, কলে-কারখানায়, মাঠে-ঘাটে, খামারে-খোয়াড়ে, গার্মেন্টস এ, রিকশা-ভ্যানের প্যাডেলে জীবনের চাকা ঘুড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের স্মৃতি -সত্তা ভবিষ্যৎ, আশাভরসা কিছুই নেই। “তারা বাঁচিয়া থাকে এবং মরিয়া যায়।”
ততক্ষণে নেতা অন্য একজনের সাথে কথা বলা শুরু করেছে। উনি উদালিয়া বিলের কৃষক। নাম ঠান্ডা মিয়া। তাকে যথেষ্ট শিক্ষিত এবং নেতৃস্থানীয় মনে হলো।
- ¯øামালিকুম ঠান্ডা মিয়া ভাই।
-ওয়ালাইকুম সালাম।
- আচ্ছা ভাই, তোমার জমিতে বৎসরে কয়বার ফসল হয়?
-আমার জমি তো নয়। অন্যের জমি। আমি এতে বর্গাচাষী। এতে ফল দুইটা হলেও আমার কি, তিনটা হলেও কি?
-তুমি পৈতৃকসূত্রে কিছু জায়গা জমি পাওনি?
-না, আমার বাবা, তার বাবাও ছিল আমার মতো। আমরা শ্রমে ঘামে চাষ করে গেলাম প্রজন্মের পর প্রজন্ম আর তা ভোগ করলো মালিকেরা, তাদের ছেলে মেয়েরা শুধু মালিকানার জেরে। তারা ঐতিহাসিক সূত্রে হবে জমির মালিক, হবে সমাজের হর্তাকর্তা আর আমার ছেলে মেয়েরা হবে আমার মতোই বর্গাচাষী, বাঙালি বর্গাচাষী।
- আচ্ছা ভাই, আমরা তোমার মত বিজয় মুন্ডার কথাও শুনলাম। তোমাদের জীবন অন্য বাঙ্গালীর মতো একই সূত্রে বাঁধা পড়ে গেছে।
-হ্যাঁ। আমাদের সাথে পৃথিবীর এই মানুষেরা প্রজন্ম ধরে বৈষম্য করে যাচ্ছে। মনে হয় আমাদের জন্য পৃথিবীর পিঠের চেয়ে পেট উত্তম জায়গা হতো।
রুকু আর নেতা কেউ ঠান্ডা মিয়ার কথার মর্ম বুঝতে পারছিলো না। চারিদিকে রব উঠল, কবি, কবি। একজন রুকুর কানে ফিসফিসিয়ে বললো, উনি একজন কবি, পৃথিবীর পেট বলতে উনি কবর বোঝাচ্ছেন। রুকু এইসব গ্রামীণ মানুষের কাব্য প্রতিভায় আশ্চর্য্য হয়ে গেল।
নেতা বলে,
- আমরা সবাই তোমার মতই তোমাদের মতই বৈষম্যের শিকার। তোমাদের এই জীবন কথা শুনতে, আমাদের কথা শোনাতেই এখানে এসেছি। এখন কথা হচ্ছে, তোমরা কি চাওনা তোমাদের জীবনের এই অবস্থার পরিবর্তন হোক? আমূল পরিবর্তন হোক এ সমাজ ব্যবস্থার যেখানে লাঙল যার জমি তার হবে, যার জাল তার হবে জলা, যেখানে প্রত্যেক মানুষের জন্য সাম্য, সামাজিক ন্যায় বিচার, মানবিক মর্য্যাদা থাকবে, প্রত্যেকের শিক্ষা-স্বাস্থ্য এবং নিজের মত জীবন ধারণের ব্যবস্থা থাকবে, সর্বোপরি দেশের সম্পদে- সুযোগে ও তার শাসনে-ব্যবস্থাপনায় সবার সমান অধিকার থাকবে।
সবাই উৎসাহের সাথে বলে, অবশ্যই আমরা চাই।
ঠান্ডা মিয়া বলে,
-কিন্তু কীভাবে এই পরিবর্তন হবে তা আমাদের পূর্ব পুরুষদের মতো আমাদেরও জানা নেই, তাই কালের চাকার ঘর্ঘরে আমরা এখনও অবিরাম ঘুরে মরছি।
-আজ আমাদের সামনে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত এসে উপস্থিত হয়েছে। আজ তোমাদের মতো আমরা শিক্ষার্থীরাও কোটা নামের এক বৈষম্যের শিকার হয়ে জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছি। এখন ব্যবসায়-বাণিজ্যে, ক্ষমতায়-চাকুরিতে এক মালিক শ্রেণীর উৎপত্তি হয়েছে যাদের কোটা এবং কোটারী স্বার্থের কাছে বাকিরা সবাই অসহায় হয়ে পড়েছে। তাই এই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে একসাথে নামব বলে তোমাদের কাছে এসেছি, যাতে তোমাদের ঐতিহাসিক অবহেলার প্রায়শ্চিত্ত জাতি হিসেবে আমরা সবাই করতে পারি।
-কিন্তু তোমার মতো একই কথা প্রতিবার ইলেকশনের আগে নেতারাও তো বলে যান। আমি শুনেছি, ভারতের, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে তখনকার নেতারাও বলে গেছেন, দেশ স্বাধীন হলে আমরাও স্বাধীন হবো। দেশ স্বাধীন হলো ঠিকই, কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা কোথায়?
-স্বাধিকার আন্দোলন কারীদের কথা বলা আমার এখতিয়ারের বাইরে, আর আমরা রাজনৈতিক নেতাও নই। আমরা আজীবন শিক্ষার্থী, তোমাদের মতই বৈষম্যের শিকার। আমরা শুধু বলতে পারি, আমাদের বিপ্লব সফল হলে তোমাদের জীবন ও জীবিকা বৈষম্যহীন হবে, এই অঙ্গীকার আমরা করছি।
-একজেক্টলি, এখানেই আমাদের সমস্যা।
কিছু বুঝতে না পেরে নেতা উসখুস করতে থাকে। জনতার মধ্যে গুঞ্জরন। রুকুর মনেও প্রশ্ন, এখানে সমস্যাটা কোথায়। ঠান্ডা মিয়া অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বলে,
-বিপ্লব সফল হলে আমাদের জীবন ও জীবিকার স্বাধীনতার যে অঙ্গীকার করেছেন সেজন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমাদেরকে স্বাধীনতা দেওয়ার, দেওয়ার অঙ্গীকার করার আপনি কে, আপনারা কারা? আমরা মনে করি কারো কাছে থেকে এরকম স্বাধীনতা পাওয়াটাই অধীনতা; কেউ যখন বলে আপনাদের এই দেব, সেই দেব, এর চেয়ে বড় পরাধীনতা আর কিছুই নেই। স্বাধীনতা কেউ কাউকে দেয় না, দিতে পারে না। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এতদিন ধরে তাই বলে আসছেন। আপনারা নবীন আপনাদের কাছে আমরা তা আশা করি না। 
 
চলবে...

বই পরিচিতি মাস্টার বাড়ি

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:৫১ পিএম
মাস্টার বাড়ি
বই

মাস্টার বাড়ি

এস. আকরাম হোসেন

শ্রেণি: উপন্যাস

প্রকাশনী: খান প্রকাশনী

প্রকাশকাল: ২০২৫

পৃষ্ঠা: ১৫০, মূল্য: ২৫০ টাকা

এস. আকরাম হোসেন বিখ্যাত কথাশিল্পী আকবর হোসেনের গ্রামের সন্তান গ্রামে বিখ্যাত অনেক মনীষীর জন্ম বিপ্লবী বাঘা যতীন, সাহিত্যিক ললিতকুমার চট্টোপাধ্যায়, কবি শরৎশশী দেবী, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক . আজিজুল ইসলাম- গ্রামের নক্ষত্র সন্তান অভিনেতা-কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পৈত্রিক বাড়ি এখানে এস. আকরাম হোসেনের জন্মভাগ্য ঈর্ষণীয় -গ্রামে জন্মে এস. আকরাম হোসেন লেখক হয়ে-উঠবেন এটাই স্বাভাবিক তিনি কবিতা-গল্প-উপন্যাস লেখেন মুক্তকলাম লেখেন তাঁর লেখাতে দেশভাবনা-সমাজ-সমকাল-অর্থনৈতিক অবস্থা-প্রেম-প্রণয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ সমাজের নানান অসংগতি তিনি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেন এবং তা সাহিত্যগুণ সমৃদ্ধতায় উপস্থাপন করেন তাঁর ভাষা প্রয়োগের দক্ষতা ঈর্ষণীয় তাঁর উপন্যাসমাস্টার বাড়িপ্রকাশিত হয়েছে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক -উপন্যাসের বিষয়বস্তু-চরিত্র নির্মাণ-সংলাপ- আর্থ-সমাজচিত্র-লেখকের চিন্তা-দর্শন, সর্বোপরি শিল্পমান পাঠকমনে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করবে এবং ভাবাবে পাঠককে মুগ্ধ-আবেশে ধরে রাখার শক্তি আছে বিশেষ করে ভাষাপ্রয়োগের কৌশলে তিনি মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেনমাস্টার বাড়িহৃদয়গ্রাহী সুখপাঠ্য গ্রন্থ হিসেবে পাঠকমনে সহজেই নিজস্ব জায়গা করে নিতে সক্ষম হবে-বিশ্বাস করি কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গ্রামীণজীবনের নানামাত্রিক সামাজিক সমস্যা উপন্যাসটির বিষয়বস্তু গ্রামাঞ্চলে বর্তমানে সুদের ব্যবসা সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে সুদেও কবলে পড়ে বহু মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছে এসব থেকে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে মুক্ত করে সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য উপন্যাসের নায়ক জিহাদ অক্লান্ত পরিশ্রম করছে এলাকায় সুদের ব্যবসা যারা করে তারা মূলত অসহায় মানুষদের সুদের ফাঁদে ফেলে তাদের রক্ত চুষের নেয় সুদগ্রহণকারী এসব মানুষ সুদেও চক্রাহারে ক্রমশ জীবনী শক্তি হারিয়ে ফেলে গ্রন্থটিতে শুধু সমস্যা তুলে ধরেনি, সমস্যার সমাধানও লেখক তুলে ধরেছেন সেসঙ্গে গ্রামীণ জীবনে প্রেম বিরহ যেমন আছে তেমনি দেশপ্রেমের চিত্র ফুটে উঠেছে এস. আকরাম হোসেনেরমাস্টার বাড়িনিখাদভাবে দেখা অসম্ভবরকমের খাঁটি একটি উপন্যাস আপনাকে অসম্ভব চুম্বক-আকর্ষণে ধরে রাখার অসামান্য শক্তি রয়েছে বইটির পরতে পরতে সহজ সরল ভাষায় সমাজজীবনের অসামান্য বুনন- ‘মাস্টার বাড়িউপন্যাস

বই পরিচিতি কৃষি শব্দকোষ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম
কৃষি শব্দকোষ
বই

কৃষি শব্দকোষ

মৃত্যুঞ্জয় রায়

শ্রেণি: ইংরেজি-বাংলা অভিধান

প্রকাশনী: ঐশ্বর্য প্রকাশ

প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২১

পৃষ্ঠা: ৫০৩, মূল্য: ৯৫০ টাকা

 

পড়তাম ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ইংরাজী ভাষায় কৃষির মতো একটি মাটিময় কাঁচা ফসলের গন্ধমাখা বিষয়গুলো পড়তে গিয়ে কেমন যেন নিরস লাগত, দুর্বোধ্যও কৃষি পড়ে তো মূলত কৃষকদেরই পরামর্শ দিতে হবে, শিক্ষক গবেষক হবে আর কজন? সেজন্য কৃষির মতো একটা বিষয় ইংরাজীতে পড়ার ছিলাম ঘোর বিরোধী কিন্তু না পড়েই তো উপায় ছিল না শিক্ষকরা তো বাংলায় পড়ান না শেষে বাংলায় নোট করা আমিই শুরু করলাম সাথে পেলাম অনেক সুহৃদ বন্ধুদের চাকরি জীবনে এসে ভেবেছিলাম কৃষির পড়াশুনাটা বোধহয় বাংলাতেই চলছে কিন্তু আমার সে ভাবনায় ভুল ছিল আবার কৃষি ইংরাজীতে ফেরত গেছে বাংলা কি দীনহীনের ভাষা? কেবল চাষাভূষার বুলি? এসব কথা ভাবলেই মনটা বিষন্নতায় ভরে ওঠে

উচ্চশিক্ষায় এত বছর পরও কেন আমরা মধুর মতো বাংলা ভাষায় পড়তে পারছি না! পাশ করার পর তাই যা হওয়ার তাই হচ্ছে মুখস্থ বিদ্যায় আর কতটুকু কেদ্দারী করা যায়? ফলে অনেকের পেশাগত দক্ষতার অভাব ঘটছে অনেকটা তাড়না থেকে কৃষির ছাত্রছাত্রী পেশাজীবীদের জন্য লিখলাম বই এটি চাকুরিকালীন সময়ে করা সম্ভব ছিল না বিধায় মনে মনে ভেবেছিলাম, অবসরে যাওয়ার পর কাজটি ধরব অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে পিআরএল- যাওয়ার পর চার মাসের মধ্যে এটি লিখে শেষ করি, পরের চার মাসে এটি প্রকাশিত হয় এতে কৃষি সংশ্লিষ্ট তিন হাজারের বেশি শব্দের ইংরাজী থেকে বাংলা অর্থ সে সম্পর্কে খুব সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে বইটি পাঠক কৃষিজীবীরা সাদরে গ্রহণ করেছেন বলে আমি আনন্দিত

বই পরিচিতি দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনির মঞ্চ-পরিবাহন

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনির মঞ্চ-পরিবাহন
বই

ইউসুফ হাসান অর্ক

শ্রেণি: সমকালীন লোককাহিনি

প্রকাশনী: বাংলা একাডেমি

প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৫

পৃষ্ঠা: ১৬৮, মূল্য: ৪৪০ টাকা

 

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী নাট্যমূলক পরিবেশনার অগাধ ভাণ্ডার বিবেচনার ক্ষেত্রে আমাদের মগ্নতায় এখনো দাসত্ব ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক নন্দনতত্ত্বের দৌরাত্ম্য রয়ে গেছে সংলাপমূলক দ্বন্দ্ব দৃশ্যায়নের মাধ্যমে তথাকথিতদৃশ্যকাব্যহয়ে উঠলেই তাকে বলা যাবেবিশ্বমানের নাটকীয় কিছু হলো’- ভাবনার বাইরে গিয়ে দেশজ সম্পদের স্বকীয় ঐশ্বর্যের দ্যোতনাকে যে কয়জন মানুষ উপলব্ধি করে উদ্যোগী হয়েছিলেন তার মধ্যে দীনেশচন্দ্র সেন প্রথম সারির তারই হাত ধরে এসব ঐশ্বর্যেরনাগরিকসমাজে প্রবেশ বলা যায় নগরমঞ্চে এদের পরিবাহন সে সময় থেকেই তার পর থেকে নানা মাধ্যমে পরিবাহন প্রক্রিয়া কখনো স্তিমিত, কখনো বা জোরালো গতিতে অব্যাহত রয়েছে গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে লোককাহিনিগুলো পরিবাহনের আরেকটি মাত্রা নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নগরকেন্দ্রিক থিয়েটার মঞ্চে কাহিনিগুলো ঐতিহ্য প্রণোদিত অথচ নতুন রীতিতে মঞ্চায়িত হতে শুরু করে লোককাহিনি পরিবাহনের পাশাপাশি অভিনয়রীতি নিরীক্ষার এক বি-ঔপনিবেশিক প্রতিভঙ্গি হিসেবে বিবেচনা করা চলে ধরনের উদ্যোগগুলোকে পাশাপাশিসাংস্কৃতিক পরিবাহন’-এর এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবেও এগুলোকে বিবেচনা করা অসমীচীন নয় তাই দীনেশচন্দ্র সেনকে প্রণতি জানিয়ে লোককাহিনি পরিবাহনের এক সমকালিক প্রবণতাকে গ্রন্থে স্বীকৃতি দেওয়া গেছে লোকজ ধারার সাহিত্য পরিবেশনায়ফুইডিটি যে উদার প্রশ্রয়, তাকে গ্রহণ করে নগরকেন্দ্রিক পরিবাহন-প্রক্রিয়া তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রন্থটিতে লোককাহিনিনির্ভর তিনটি নাট্য প্রযোজনার সমুদয় বিশ্লেষণ থেকে সমকালে লোককাহিনির পরিবাহন নিরীক্ষা বিষয়ে ধারণা অর্জন সম্ভবফোকলোর’, ‘পারফরম্যান্স স্টাডিজনাট্যকলাবিষয়ের শিক্ষার্থী গবেষকদের জন্য তো বটেই, পাশাপাশি বাংলাদেশের নগরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় সংশ্লিষ্ট অভিনেতা-নির্দেশকদের জন্যও গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে

সমাজবোধ ও জীবনবীক্ষা মোস্তফা কামালের বিষাদ বসুধা

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
মোস্তফা কামালের বিষাদ বসুধা

চতুর্থ পর্ব

মাঝে পড়ালেখার কারণে শাহবাজ খানের বিদেশ অবস্থান, তাদের মধ্যে সেই সময়ে দেখা-সাক্ষাৎ ঘটেনি। যোগাযোগও ছিল না। করোনাকালীন তাদের মধ্যে হুট করেই আবার যোগাযোগ স্থাপন হয়। শাহবাজ খান ধনীপুত্র। নিজেও পিতার শিল্পসাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। মোহিনীও শিল্পদ্যোক্তা, ধনী ব্যবসায়ী। আরেফিনের মৃত্যুর পরে  মোহিনীর জীবনে শাহবাজ খান আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। কিন্তু মোহিনী অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সুকৌশলে শাহবাজ খানের ফাঁদে পা দেননি। বন্ধুত্বের সীমা লঙ্ঘন করেননি। করতেও দেননি। আরেফিন মৃত্যুবরণ করলেও মোহিনীর মস্তিষ্কের কোষে কোষে বেঁচে আছে আরেফিন। তার সঙ্গে যাপিত অসংখ্য স্মৃতি মোহিনী নিজের ভেতর লালন করেন। আরেফিন না থেকেও পুরো আরেফিনই তার জীবনে জীবন্ত হয়ে আছে। সেখান থেকে মোহিনীর মুক্তি ঘটেনি, মুক্তি ঘটাতে চানওনি। মোহিনীর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা ও সততা তার চরিত্রকে উচ্চমার্গের করেছে। শাহবাজ খানের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু যখন তিনি জানলেন শাহবাজ খানের সঙ্গে রুবিনা নাম্মী এক কলেজছাত্রীর অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। রুবিনাকে গুলশানে নিজে বাসা ভাড়া করে রাখতেন। রক্ষিতার মতো। অনেকটা ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’র জমিদার গোবিন্দলাল আর রোহিনীর অবস্থা। গোবিন্দলাল রোহিনাকে বিয়ের আশ্বাসে রক্ষিতা করে রেখেছিল এবং শেষে বিয়ে তো করেইনি, গুলি করে হত্যা করেছিল। রুবিনার ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনাই ঘটেছে। একালের ‘জমিদার’ শাহবাজ খান বিয়ের আশ্বাসে রুবিনাকে রক্ষিতা করে রেখেছিল এবং শেষে হত্যা করেছে। রুবিনার মনে রোহিনীর মতোই আশা ছিল স্বপ্ন ছিল শাহবাজ খান তাকে বিয়ে করবে, তার সংসার হবে, সন্তান হবে। কিন্তু শাহবাজ খান ছিলেন পুরোটাই ভোগবাদী মানসিকতাসম্পন্ন। সে কারণে একপর্যায়ে রুবিনাকে হত্যা করে সে। রুবিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিল। অর্থাৎ ভ্রুণসহ হত্যার শিকার হয় রুবিনা। এটা মোহিনী জানার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অফিসে জানিয়ে দেন, শাহবাজ খান যেন তার অফিসে কখনোই আসতে না পারে। তার জন্য এ অফিস নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। মোহিনীর চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ করে। কারণ তিনি রুবিনার বিষয় নিয়ে শাহবাজ খানের সঙ্গে কোনো কথা বলা বা আলোচনা করারই প্রয়োজন মনে করেননি। এরকম একজন নষ্টকীটের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব থাকতে পারে না, কোনোরকম আর যোগাযোগ হতে পারে না। তিনি মুহূর্তেই মানসিক দৃঢ়তা, সততা ও আদর্শে এরকম কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পেরেছেন। অথচ শাহবাজ খানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছোটবেলা থেকে। শাহবাজ খান তাকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরুর কথা সরাসরি বলেছে। যা বিনয়ের সঙ্গে মোহিনী প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু বন্ধুত্বের জায়গাটি তো তাদের মধ্যে ছিল। শাহবাজ খানের রুবিনা হত্যার মতো জঘন্য ঘটনা জানার পরই তিনি মুহূর্তেই তার জীবন থেকে শাহবাজ খানকে উপড়ে তুলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্ব কতটা শক্তিশালী হলে মুহূর্তেই দীর্ঘদিনের বন্ধুকে এভাবে ছুড়ে ফেলতে পারা যায়, তা সহজেই অনুমিত হতে পারে। এখানে শাহবাজ খানের অর্থ-ক্ষমতা-বন্ধুত্ব কোনো কিছুই মুহূর্তের জন্যও মোহিনীকে ভাবাতে পারেনি। মোহিনী এমনই এক নির্লোভ, নির্মোহ, সত্যের ও আদর্শের ধারক হয়ে ওঠেন।

মোহিনীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আসিফ আহমেদ। প্রখ্যাত সাংবাদিক তিনি। মোহিনীর আসিফ আহমেদের প্রতি প্রচ্ছন্নভাবে মানসিক দুর্বলতা থাকলেও কখনো তা প্রকাশ করেননি। বন্ধুত্বকে অতিক্রম করে অন্য কোনো সম্পর্কে আগাননি। আসিফ আহমেদকে তিনি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার কথা বলেছেন। তার পাশে সহযোগিতার হাত বাড়াতে চয়েছেন। এমনকি আসিফ আহমেদকে মাথায় রেখেই পত্রিকা প্রকাশনার কথাও ভেবেছেন। আসিফ আহমেদ তাকে না জনিয়ে অনলাইন পত্রিকা ‘ঢাকাপ্রকাশ’ করলে মোহিনীর কণ্ঠে অভিমান ও অনুযোগের প্রকাশ ঘটেছে। বন্ধুত্বের প্রতি তার যে সম্মান ও দায়িত্ববোধ তা অসাধারণ। আসিফ আহমেদ বন্ধুত্বের সীমানা কখনোই অতিক্রম করেননি। তার শান্ত-স্নিগ্ধ কিন্তু ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ মোহিনীকে সবসময়ই মুগ্ধ করেছে। বন্ধু হয়েও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আত্মসস্মানবোধ এবং হৃদয়গত উপলব্ধি- মোহিনী চরিত্রে অপূর্ব সুঘ্রাণ তৈরি করেছে। আরেফিনের দরিদ্র পরিবারের প্রতি তার যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ তা বাঙালি নারীর চিরকালীন যে ব্যক্তিক-সৌন্দর্য ও দায়িত্ববোধ তা চমৎকারভাবে লেখক তুলির আঁচড়ের মতো কয়েকটা টানেই জীবন্ত করে এঁকেছেন। আরেফিনের বাবা আলী আকবর যখন অফিসে এসে মোহিনীকে না পেয়ে ফিরে গেছেন, রেখে গেছেন অসহায় আকুতিভরা পত্র, সেই পত্র পড়ে মোহিনীর ভেতর যে মানসিক কষ্ট-যন্ত্রণা হয়েছে, নিজের ভেতর বেদনার্ত আর্তনাদ হয়েছে, মানসিক কষ্টে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। অফিসের কর্মকর্তার প্রতি তার এ বিষয়ে নির্মোহ আচরণ এবং দ্রুত দ্বিগুণ পরিমাণে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। এর ভেতর দিয়ে মানবিক ও দায়িত্বশীল মোহিনীকে পাই। বাঙালির নারীর জীবনে স্বামী-পরিবার যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা মোহিনী চরিত্রে পরিলক্ষিত হয়। তিনি ধনীকন্যা। নিজেও ধনী শিল্পোদ্যোক্তা। স্বামী মৃত। নিজে কখনো শ্বশুরবাড়ি যাননি। তিনি অনায়াসে এসব এড়িয়ে চলতে পারতেন। তিনি তা করেননি। বরং আরেফিনের মৃত্যুর পর থেকেই তার পরিবারের দায়িত্ব বহন করছেন। তিনি জানেন আরেফিনের টাকাতেই সংসার চলত। আরেফিনের মৃত্যুতে পরিবারটা অসহায়। তাই তিনি নিজেই বাড়ির যেন পুত্রবধূ নয়, নিজেই সংসারের দায়িত্ব পালনে আরেফিন হয়ে ওঠেন। মোহিনী যেন ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র প্রমীলাকেই মনে করিয়ে দেয়। স্বামী মেঘনাদ যখন বিপদগ্রস্ত তখন তিনি চুপ থাকতে পারেননি। তিনি মুহূর্তেই যুদ্ধসাজে তৈরি হয়ে স্বামী মেঘনাদকে উদ্ধারের জন্য ছুটে গেছেন। মোহিনীর প্রেক্ষিত ভিন্ন। কিন্তু দায়িত্বের জায়গা অনেকখানিই এক। বিশেষ করে বাঙালি নারীর কাছে স্বামীর পরিবার বিপদগ্রস্ত হওয়া মানে সে বিপদ তার নিজেরই। সেখানে তার হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার উপায় নেই। শ্বশুরবাড়ির প্রতি বাঙালি নারীর হৃদয়সত্য ও দায়িত্ববোধে মোহিনী চরিত্র অসামান্য হয়ে উঠেছে।

মোহিনী দেড় বছরের ব্যবধানে বাবা মোহসীন আহমেদ ও মা আনোয়ারা বেগমকে হারিয়ে দিশেহারা। বাবা মৃত্যুর আগে স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও কন্যা মোহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে ‘আনোয়ারা-মোহসীন ট্রাস্ট’ গঠন করেন। মোহিনী সে ট্রাস্টের প্রধান। নিজের কোম্পানিও ট্রাস্টের অন্তর্ভুক্ত করেন। যাতে তাদের মৃত্যুর পরে কোম্পানিগুলো কোনো সমস্যার শিকার না হয়ে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে। ট্রাস্ট থেকে মানবকল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রকাশনাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। করোনায় বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে সাহায্য নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। কারণ তিনি জানেন মৃত্যু অবধারিত। আরেফিন ও বাবা-মায়ের মতো একদিন তাকেও চলে যেতে হবে। সে কারণে উপার্জিত অর্থ মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। ব্যক্তি মোহিনী নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেননি। ভেবেছেন দেশের অসহায় মানুষের কথা। নিজেকে নিজেই অতিক্রম করার অসাধারণ চরিত্র মোহিনী।

উপন্যাসের মোহিনীর গুরুত্ব বিবেচনা করে যে বিষয়টি ভাবনায় আসে তা হলো, প্রধান চরিত্র মোহিনী হওয়া সত্ত্বেও কিছু অধ্যায়ে মোহিনীবাদেই স্বতন্ত্র গতিতে এগিয়েছে।   

চলবে...

গল্প সুন্দর পুরুষ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৫৬ এএম
সুন্দর পুরুষ
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

‘অ, মাও, শ্মশান থুইয়া..’
সত্যিই এবার বিগড়ে যায় মীনাক্ষীর গলা, মেয়ের প্রতি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ওই মাইয়া, মড়া আছে শ্মশানে? বইয়া থাহুম।’
‘মনে অয় দ্যাশে মড়া কইমা গেছে।’ কথা শেষ করে হাসে সপ্তদশী মেয়ে শচী। অপ্রয়োজনীয় হাসি। এমন হাসির কোনো অর্থ খুঁজে না পেয়ে মীনাক্ষীর রাগ হয়, ‘এ্যাই মাইয়া হাসনের কী হইল? রূপ খুলতাছে তর। মাইয়া, ঐ রূপের বড়াই তর বাপেও করতো।’ 
চুপ মারে রূপবতী শচী। শ্মশান ঘাটের পাশেই অপেক্ষায় ছিল মা আর মেয়ে। জগৎসংসারে মা ছাড়া কেউ নেই ওর। মাকে কষ্ট দেওয়া কী ঠিক! প্রশ্ন জাগে। নিস্তেজ গাং ধরে তাকায়। মনে মনে ভাবে একজন পুরুষকে তো মন দেওয়া হয়ে গেছে। তাকে মা কী মেনে নেবে–এমন প্রশ্নও শচীকে ভাবায়। চৈত্রেরকাল বলে গরমটা খুব তেজি ছিল। কিন্তু হঠাৎ ফুরফুরে হাওয়া আর মরারোদে আদুরে আদুরে হয়ে উঠল সেই রৌদ্রতেজ। এখানেই বাড়িঘর, ঠিকানা। বেড়ে উঠেছে মীনাক্ষীর একমাত্র মেয়ে শচীও। 
শবদেহ এলে শ্মশানপুরোহিতের ডাক পড়ে। শাস্ত্রীয় বিধান দেওয়া হয়। ভোর-সকালে এ বাড়িতে একটা চক্কর দেওয়া নিয়ম যেন তার। কখনো কখনো খবর দিতে হয়, রামচন্দ্র পুরোহিত আসেন, শাস্ত্রীয় আচারপালিত হয়। এরপর মৃতের সৎকার। নানা কাজকর্ম শেষে অর্থকড়ি মেলে। এদিয়েই সংসার চলে মীনাক্ষী আর শচীর। সপ্তাহ দুয়েক ধরে শবদেহ কম আসছে। আয়রুজি কম। ঘরে চাল-তেল নেই।
‘এমুনডা হইতাছে কী কারণে?’ পুরোহিত রামচন্দ্রের কাছে হেতু জানতে চেয়েছিল মীনাক্ষী। সঠিক জবাব নদিতে পারেননি উঠানে জলচৌকিতে বসা রামচন্দ্র। বিড়ি টানেন আর ধোঁয়া ছাড়েন ওপরের দিকে।
প্রসঙ্গ পাল্টায় মীনাক্ষী। পেছনের পাড়ায় রামচন্দ্রের ঘর। তার একমাত্র সন্তান অনন্ত। সবাই ডাকে ছোট ঠাকুর। অনন্তের ব্যাপারে রামচন্দ্রকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে মীনাক্ষী বলে, ‘দিনকাল যেমুন পড়ছে। নয়া নয়া অসুখ ধরা পড়তাছে। পোলাডা য্যান সাবধানে থাহে!’
‘আমার পোলা মানুষ হয় নাই, জানোয়ার হইছে। রেপ কেইসের মামলায় হে পয়লা নম্বর আসামি। আর আমি সর্বস্বান্ত।’ একটু থামেন রামচন্দ্র। খানিকটা গর্ব তার চোখমুখে। ‘হুনো, পোলা ছিল আগুনের গোল্লা। এসএসসি-ইন্টারমিডিয়েটে জিপিএ ফাইভ পাইছিল। ইস্কুলের মাস্টরেরা কইল সার্থক জনম আমার। হে নাকি ডাক্তর- এনজিনিয়ার অইব। ওহ্, মাই, হেই পোলা ডাক্তরি পরীক্ষায় চান্স পাইল না, এনজিনিয়ারিংয়ে না। বাড়িতে আইয়া খালি কান্দে।’ আবার থামেন রামচন্দ্র। ‘বিড়িটা নিইব্যা গ্যাছে। গ্যাসলাইট লগে নাই? দিয়াশলাই আছে?’
ঘর থেকে গ্যাসলাইটার এনে হাতে দেয় মীনাক্ষী। রামচন্দ্র বিড়ি ধরিয়ে বললেন, ‘পোলারে হ্যাসকালে কইলাম, ঢাকায় ভর্তি হ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়। ভার্সিটি থেইকা পাস দিলেও দাম আছে। এহনতো কলেজ-ভার্সিটি বন্ধ। পোলার কামাই খাইমু এমন আশা আর করি না।’ সরল-স্বীকারোক্তির পরে সাবধান-সতর্ক করে রামচন্দ্র বললেন, ‘কিছুদিন থেইকা নাকি তোমার বাড়ি আসতেছে। সাবধানে থাইকো।’
“হ আসে। পোলাডা বিষ্ণুর মতো চেহারা, কতো সুন্দর। আর কী য্যান সুন্দর গানের গলা। ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার গান গাইল। মিডা গলা। সুন্দর ভাষায় কথা কয়। সিনেমার নায়কের মতন ভাষা। আমার মাইয়া শচীর লগে কথা কয়। ম্যালা কথা কয়।” তৃপ্তিমাখা কণ্ঠ মীনাক্ষীর।
‘কী অত কথা?’ উত্তরের জন্য নারীমুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন রামচন্দ্র। 
‘যাই কন, পোলা নাই আমার। আমি বুজি। পোলা অইল বংশের খুডা। মরতে অইবো না! মুখে আগুন দিবো ক্যাডা? মুখাগ্নি করব ক্যাডা?’ 
রামচন্দ্র চলে গেলে স্নানে আসার পর থেকেই আজ সাম্প্রতিক স্মৃতিকথা মনে উদয় হচ্ছিল মীনাক্ষীর। নদীর জলে গলা পর্যন্ত ডুবে আছে ও। কানে বেজে উঠল স্বামীর আরও নানা কথা। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে বলত, ‘কেমুন সুর্মাটানা তুমার চক্ষু, অতো সৌন্দর্য ক্যান তুমার মুখে।’ কী উন্মাদনা ছিল স্বামীর। মায়ার মানুষ ছিল, আদরমাখা গলা। হঠাৎ মরে গেল। চিতাতে রাখা শবদেহে আগুন ধরাতে ধরাতে মরে গেল স্বামী। লোকে বলল, ‘অ্যাতো মদ গিলেছে যে, মাগনা মদে মরেছে।’ ডাক্তার বলল, ‘হার্ট অ্যাটাকে।’ সবগুলো শব্দ একে একে মনে পড়ল মীনাক্ষীর। ‘তোমার সুয়ামি মদে মরেছে।’ কেউ যেন তাকে কানে কানে বলে যাচ্ছে এসব। এরপর বিধবা হওয়ার শব্দটি আড়াল করা হয়। রামচন্দ্রের পরামর্শ ছিল, শাঁখ না ফেলার, সিঁদুর না মোছার। মানুষ নানাকথা বলবে, শ্মশানে বিধবাদের কর্ম তো হতেই পারে না। মৃত্যু মানুষের হবেই, সকলেরই। আত্মা ও অন্তর পরিষ্কার রাখলেই অন্তরাত্মা পবিত্র। সেখানেই ঈশ্বর, প্রভু। তুমি চাইলে তুমিও সৃষ্টিকর্তাকে পাবে। মানুষকে তুমি তুষ্ট করলেই স্বয়ং প্রভু তুষ্ট। আত্মা খুশি তো জগৎখুশি। রামচন্দ্রের বিচক্ষণতা তাকে আস্থাশীল করে তোলে, কখনো বা মনে হয় এই লোকটিই তীর্থস্থানের পূজারি। 
দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে শচীর দিকে একপলক তাকিয়ে ফের মাথা ভেজাতে শ্মশান ঘাটে আরও কয়েকটি ডুব দেয় মীনাক্ষী। শরীর ভেজা তবু পানি ছিটাবে। টলটল পানি নদীতে, স্বচ্ছ কালো জল যেন। নিজের হৃষ্টপুষ্ট শরীর দেখে। বুক সামলাতে কাপড় টানে। দেহ নিয়ে কল্পনা করাও পাপকর্ম। এরপর সূর্যের দিকে তাকায়। নিরুত্তাপ সূর্য। বেলা গড়িয়ে বিকেল কিনা। 
উপশহর এলাকায় থিতু হয়ে থাকা শ্মশান ঘাটের অদূরের বাড়িটিতেই জীবনের বড় সময় ধরে আছে মীনাক্ষী। বিয়ের পর কত কিছু বদলে গেছে এখানকার। আগে ছিল নদী। এখন মাটি ভরে ভরে নদীভরাট হয়ে শুকিয়েছে। দূরের দিকে ছোটখাটো খাল। পাশে থাকা কচুরিপানা ভর্তি খালটার এখন অস্তিত্ব নেই। আর দখলবাজদের অত্যাচারে স্রোতধারা নদী হয়েছে সরু। নাম জানা না জানা সারসার গাছ ছিল পাড় ঘেঁষে। এসবের কিছু আছে তবে বড়গাছগুলো রাতের অন্ধকারে অনেকদিন আগেই কেউ কেটে নিয়ে গেছে। হিন্দুদের শ্মশানের জায়গা দখল হয়ে কাঠচিড়াইয়ের কারখানা। জমজমাট দোকান আনোয়ার টি স্টল লেখা। খানিকটা দূরে হোমিওপ্যাথির দাওয়াইয়ের দোকান ছিল, এটি এখন হয়েছে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের দোকান।
আকারে ছোট হয়ে আসছে শ্মশান। বিয়ের সাড়ে ১৮ বছরে অনেক বদলে গেছে দুনিয়া। মেয়ে স্কুল বাদ দিয়েছে গত সন। মা-মেয়ের ছোট সংসার। দুশ্চিন্তা ছিল না শচীর জন্য। কিন্তু মেয়ের প্রতি সেই মুগ্ধভাবটা আর যেন নেই এখন। 
স্নান সেরে নদীর পাড়ে ওঠে মীনাক্ষী। গামছা জড়িয়ে নেয় বুকে। এদিক-ওদিক তাকায়। পিঠছেঁড়া ব্লাউজ বদলায়। স্বামী গত হওয়ার পর থেকে সতীত্ব টিকিয়ে রাখতে একযুগ ধরে পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে মীনাক্ষীর। হিন্দু-মুসলমান পুরুষরা একসঙ্গে মিলেমিশে গিলে খেতে চায় শরীরটা। জাতপাত যায় না। তখন ছোটগোত্রের প্রশ্নও ওঠে না। কাঁখে এক কলস পানি নিয়ে ঘরমুখো হাঁটতে শুরু করে। অদূরেই ছাপরাঘর। ঠিকানা বলতেই এই ভিটে-বাড়ি। চোট্ট এক চিলতে উঠান। বাড়ির কোণে একজোড়া হাঁস। হেলেদোলে দূর্বাঘাসে খাবার খোঁজে। মুহূর্তেই মনোযোগ সরে যায়, কণ্ঠে বিরক্তি ঝরে মীনাক্ষীর, হাঁসগুলোর ওপর সকল রাগ। ‘দিনভর গাঙে খাইলে–হেরপরও পেট ভরে না!’ 
ঘরে ঢুকতে যাবে তখনই মীনাক্ষীর মনে কী যেন নড়ে উঠল। শচীর দিকে চোখ নেচে বেড়ায়। কোনোদিন না হলেও আজ হঠাৎ কঠিনতর ভাবনায় মন বিষিয়ে ওঠে। বিয়ে দেওয়া চাই মেয়েটার। 
‘মাও, কী হইচে?’
মায়ের জবাব না পেয়ে শচীর চোখে-মুখে অকারণ হাসি।
মীনাক্ষীর কণ্ঠ কঠিন, ‘ওই মাইয়া হাসস ক্যান? বয়স অইতাছে না। বিয়া দিতে অইব না তোরে? ট্যাকা পামু কই, ক্যাডা দিব?’
মিঠে করে হেসে শচী বলল, ‘ট্যাকা দেওনের মাইনষের অভাব অইব?’
‘কইলি কী? মাইয়ার সাঅস, কী?’ গোখরা সাপের মতো ফুঁসে ওঠে মীনাক্ষী। 
এখন বিকেল। চুপ মেরে ঘরের বারান্দায় মাটিতেই বসে পড়ে শচী। লম্বা ডাগর হাত দুটি নাচায়। টানাটানা চোখে তাকিয়ে থাকে। একটু পর বলে, ‘মাও, যাইগা লও এ্যাইহান থেইকা।’
মীনাক্ষী ঘাড় ঘুরিয়ে বড়বড় চোখে তাকায়। ‘মাইয়া, কী কইলি তুই?’
‘হ, ঠিক কইচি। দিনকাল বদলাইছে না? শ্মশানে কেউ পইড়া থাকে, কও?’
গামছা দিয়ে চুল শুকোচ্ছিল মীনাক্ষী। মুখ ঘুরিয়ে তীব্র আপত্তিমাখা কণ্ঠে বলল, ‘কই যামু, কই যামু?’
‘ভাল্লাগে না।’
‘কইলি অইব? এ্যাইডা তর বাপের ঠিকানা, এ্যাইখানেই রুটি-রুজি। আমাগো ঘরবাড়ি।’ 
‘ভাল্লাগে না, সমাজ নাই, জ্ঞাতিগোতী নাই। ক্যাডা আছে, এ্যাইখানে?’ 
চমকে ওঠে মীনাক্ষী। কয়েক মাস থেকেই মেয়ের কথাবার্তা, আচরণ, পোশাক পরার কায়দা, চলাচল সবকিছুর একটা পরিবর্তন লক্ষ করছিল। মেয়ের কথায় ভীষণ বিরক্ত হয়ে মীনাক্ষী বলে, ‘যাগা তুই, যেইদিকে চোখ যায়, যা! আমারে মুক্তি দে।’
‘হ, যামু।’ 
মোবাইলে চটুল বাজনা আর গান বেজেই চলেছিল। মীনাক্ষী অনুমান করে নিশ্চয়ই শচীর কর্ম। ছোট ঠাকুরের সঙ্গে মেশামেশি করে মেয়ের মাথা গেছে। চঞ্চলতা বেড়েছে। লাউয়ের ডগার মতো হাত নেড়ে হাতপাখার বাতাস খায় শচী। 
আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাপড় বদলা, আমার লগে আয়।’ 
তাৎক্ষণিক জবাব দেয় না শচী। 
বালিশের তলায় থাকা কভারের রং ওঠা, গ্লাসভাঙা, ছোট মোবাইল ফোনটি হাতে এনে কোমরে গুঁজে নেয় মীনাক্ষী। দৃষ্টিতে পড়তেই কাপড়ের ছেঁড়া অংশ ঘুরিয়ে গুছিয়ে পরে। নিজের সাজগোজ বলতে সরিষার তেল মাথার চুল লেপ্টে মাখা। গায়ে আঁটসাঁট হয়ে থাকা ব্লাউজটি টেনেটুনে ঠিক করে। এরপর মুখে জর্দাপান ঢুকিয়ে মীনাক্ষী বলল, ‘শচী কই, আমার লগে আয়।’
‘এহন, কই যামু?’
‘তর ডানা মেলছে না, পাখা ছাটুম। পায়ে বেড়ি লাগামু।’
শচী জানে কোথায় যাবে মা। এখন পাশের ভাঙাহাটে যাবে। কমদামের ছোট মাছ, বাসি লাউ, পচা কচুরলতি আনতে যাবে। 
ঘণ্টাখানেক পর বাজার সেরে ঘরে ফিরে মীনাক্ষী। বিকেল গড়িয়ে গেছে কখন, খেয়াল নেই। দরজায় পা রেখেই মীনাক্ষী ডাক পাড়ে মেয়েকে, ‘শচী, অরে শচী?’
অবাক হয় শচীর আওয়াজ না পেয়ে। 
‘শচী গেলি কই?’
চারদিকেই যেন নিস্তব্ধতা। শুধু মাথার ওপর দিয়ে একজোড়া কাক ওড়ে গেছে।
‘শচী?’
ঘরের কোণে কাঁথা জড়ানো বস্তুর দিকে তাকায় মীনাক্ষী। চুলগুলো দেখে অনুমান হয় শচীই হবে। কেউ কী কাঁথার ভেতর ওর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। চৈত্রকালে কাঁথা কেন! চোখের ভুল হতে পারে। নানান জিজ্ঞাসা মনে তার। 
উঠানের কাপড় তুলে ঘরে আনতে যাবে তখনই কেউ যেন মীনাক্ষীকে ফাঁকি দিয়ে কুঁড়েঘর থেকে বের হয়েই দৌড় দেয় সড়কের দিকে। নিমিষে চলে যাওয়া মানবটির গড়ন যেন পরিচিত।
‘ক্যাডা? ক্যাডা যাও?’ মীনাক্ষীর উচ্চকণ্ঠ।
পরিষ্কার চোখে ধরা পড়ে যে, এ লোকটি অনন্ত, ছোট ঠাকুর; রামচন্দ্র ঠাকুরের ছেলে। বুঝতে কষ্ট হয় না, কী হয়েছে। কেন এসেছিল ছোট ঠাকুর। 
হাতের ঝাড় রেখে ঘরে ঢোকে মীনাক্ষী। ‘ছোড ঠাকুর ক্যান আইছিলো, শচী?’ 
ছোট ঠাকুরের সঙ্গে লুকোচুরি খেলার সময়ে মা এসে পড়েছে; এমন মুখভঙ্গি করে কিংবা এটা বোঝাতেই শচী বলল, ‘লুকাইন্যা খেইল খেলছিলাম।’
ভীষণ চমকে গিয়ে অবাক হয়ে দেখল মেয়েকে। এলোমেলো চুল আর ঘর্মাক্ত কিশোরীর চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারে এই লুকোচুরির 
অর্থ কী। এরপর জোরে জোরে কেঁপে কেঁপে চিৎকার 
করে মীনাক্ষী বলল, ‘শচী, নিজের এমন সর্বনাশ করলি ক্যান?’
মাথা নিচু করে নিরুত্তর থাকে শচী। অতীব সুন্দরী মেয়ের এমন মুখভঙ্গি অসহ্য ঠেকে। মীনাক্ষী খেয়াল করে দরদর ঘাম মেয়ের শরীরে। এই ঘাম পশুর ওপর নৃশংস ছুরি চালানো রক্তের মতোই মনে হয় মীনাক্ষীর।