নিজের সম্পর্কে বিমল মিত্র নিজেই মূল্যায়ন করেছেন এভাবে ‘…সত্যিই আমার কিছু হয়নি। অবশ্য তা নিয়ে আমি দুঃখও করি না। কারণ জীবনে যে কিছু হতেই হবে তারই বা কী মানে আছে। আকাশের আকাশ হওয়া কিংবা সমুদ্রের সমুদ্র হওয়াটাই তো যথেষ্ট। লেখক আমি হতে না-ই বা পারলাম, মূলতঃ আমি একজন মানুষ। মানুষ হওয়াটাই তো আমার কাছে যথেষ্ট ছিল। কারণ তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশু-পাখি অতি সহজেই পশু-পাখি, কিন্তু মানুষ অনেক কষ্টে অনেক দুঃখে অনেক যন্ত্রণায় অনেক সাধনায় আর অনেক তপস্যায় তবে মানুষ। আমি কি সেই মানুষই হতে পেরেছি?’…
বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে জনপ্রিয় ভারতীয় কথাশিল্পী বিমল মিত্র। মাটির কাছাকাছি থাকা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশাঙ্কার বন্দ্যোপাধ্যায় ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন খ্যাতির শীর্ষে ঠিক তখনই মাটির গন্ধ মেখে বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় বিমল মিত্রের আবির্ভাব। চেতনা স্কুল, আশুতোষ কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৮ সালে পাস করে রেলে চাকরি। এর পর রেলের চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি সাহিত্যসৃষ্টিতে আত্মনিয়োগ। কবিতা লেখার মাধ্যমেই সাহিত্য জগতে প্রবেশ ঘটলেও পরবর্তীতে তেমন কবিতার দেখা মেলেনি। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘ছাই’। তিনি বাংলা ও হিন্দি উভয় ভাষায় সাহিত্য রচনা করলেও তার রচনা ভারতের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
বিমল মিত্র লেখক হিসেবে অন্তর্মুখী, আবার রসিক প্রকৃতির। কোনো প্রকাশ্য সাহিত্য সভায় কিংবা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাওয়া একদম পছন্দ করতেন না। নিজের সম্পর্কে বিমল মিত্র নিজেই মূল্যায়ন করেছেন এভাবে ‘…সত্যিই আমার কিছু হয়নি। অবশ্য তা নিয়ে আমি দুঃখও করি না। কারণ জীবনে যে কিছু হতেই হবে তারই বা কী মানে আছে। আকাশের আকাশ হওয়া কিংবা সমুদ্রের সমুদ্র হওয়াটাই তো যথেষ্ট। লেখক আমি হতে না-ই বা পারলাম, মূলতঃ আমি একজন মানুষ। মানুষ হওয়াটাই তো আমার কাছে যথেষ্ট ছিল। কারণ তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশু-পাখি অতি সহজেই পশু-পাখি, কিন্তু মানুষ অনেক কষ্টে অনেক দুঃখে অনেক যন্ত্রণায় অনেক সাধনায় আর অনেক তপস্যায় তবে মানুষ। আমি কি সেই মানুষই হতে পেরেছি?’
বিমল মিত্র ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ উপন্যাসের ভূমিকায় লিখেছেন: ‘রামায়ণ’ না-লিখে কেন ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ লিখেছি। আমি বাল্মীকি নই, বাল্মীকির সে প্রতিভাও আমার নেই। সত্যযুগের কাহিনী, আমি লিখেছি কলিযুগে। কিন্তু আসলে কাজটা যত সহজ হবে ভেবেছিলাম তত সহজ হলো না- লিখতে গিয়ে দেখলাম কলিযুগের চেয়ে সত্যযুগ অনেক সত্য। সত্যযুগের পুণ্যের জয় নিশ্চিত, পাপের পরাজয় অনিবার্য। কিন্তু কলিযুগে সে-বালাই নেই। এ-যুগে মিথ্যে হত্যাপরাধেও বেকসুর খালাস হওয়া যায়। এ-যুগের রাবণের পক্ষে রামকে যুদ্ধে হারিয়ে অযোধ্যার সিংহাসনও দখল করা সম্ভব, এমনকি সমাজে-সংসারে প্রাতঃস্মরণীয় হওয়ার নজিরও আছে। এ-যুগ টাকার যুগ, এ-যুগ কড়ির যুগ। এ-সত্ত্বেও ইচ্ছে ছিল উপন্যাসের শেষ-পর্বে আমি বাল্মীকির মতোই রাবণ-বধ সাঙ্গ করে রামকে অযোধ্যার সিংহাসনে সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত করব। ভূগোলে না-হোক সাহিত্যে অন্তত গান্ধীজীর স্বপ্ন সার্থক করব। কিন্তু তা পারলাম না। বিংশ-শতাব্দীর শেষার্ধে অশুভ-বুদ্ধির চক্রান্তে আমার সব পরিকল্পনা বানচাল হয়ে গেল। আর সীতা? সীতার পাতাল-প্রবেশ? এ-যুগের সাধারণ মানুষের সাধ-আহ্লাদ বাসনা-কামনার প্রতীক যদি হয় সতী, তো সে সমস্ত কিছুই অকালে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে মহৎ দাবির খেসারত দিতে দিতে। মনুষ্যত্বকেও আজ চিনতে হয় রক্ত-মাংসের মূল্য দিয়ে। ‘দেশ’ পত্রিকায় এ-উপন্যাস ধারাবাহিক প্রকাশকালে অসংখ্য পাঠক-পাঠিকা আমাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়েছিলেন যেন সতীর কোনো সর্বনাশ না হয়। কিন্তু বাল্মীকিই কি সীতার পাতাল-প্রবেশ রদ করতে পেরেছিলেন? বাল্মীকি যা পারেননি আমি তা পারব কেমন করে? আমি অত দক্ষতা কোথায় পাব? তবু নিজের মনে এই ভেবেই সান্ত্বনা পেয়েছিলাম যে এ-ও হয়তো কলির মাহাত্ম্য। কিন্তু না, আমার ধারণা ভুল। মাহাত্ম্যটা কলির নয়, কড়ির।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পর এত জনপ্রিয়তা সম্ভবত আর কোনো সাহিত্যিক অর্জন করতে পারেননি। ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ যখন ধারাবাহিক হিসেবে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিল তখন বইয়ের স্টলে দাঁড়িয়ে মানুষ সেই উপন্যাস পড়ে নিত, এমনই ছিল এর জনপ্রিয়তা। তার গল্প বা উপন্যাস ভারতের যতগুলো ভাষায় অনূদিত হয়েছিল একমাত্র শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছাড়া আর কোনো লেখকেরই সৃষ্টি অতগুলো ভাষায় অনূদিত হয়নি। দেশ-কালের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ উপন্যাস গ্রন্থে। এ উপন্যাসে শ্রী প্রমথনাথ বিশীর লেখায় অঘোর ভট্টাচার্য বলেছিল, ‘কড়ি দিয়ে সব কেনা যায়। কিন্তু কড়ি দিয়ে অন্তত জীবনের আনন্দ কেনা যায় না।’
পঞ্চাশের গোড়ায় বন্ধু সাগরময় ঘোষের আগ্রহে ধারাবাহিক ‘সাহেব বিবি গোলাম’ লিখে আলোড়ন তুলেছিলেন। পরাধীন সমাজব্যবস্থা এবং সরল গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে শহরে কৃত্রিমতার তারতম্য ‘সাহেব বিবি গোলাম’ উপন্যাসটিতে তিনি নিপুণভাবে গ্রন্থিত করেছেন। সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। কয়েক পর্ব প্রকাশের পরপরই অপপ্রচার, কুৎসাভরা চিঠি এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও তিনি পেয়েছেন। তখন তিনি ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে বসে নির্বিকার সাধকের মতো এ উপন্যাসের পরবর্তী পর্বগুলো লিখে গেছেন। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার পর এটিই আবার বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ‘দেশ’ সম্পাদক সাগরময় ঘোষ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘আমার ধারণা এ গ্রন্থ একটি কালোত্তীর্ণ ক্ল্যাসিক। এ ধরনের উপন্যাস এক শ বছরে মাত্র একটি রচিত হওয়াই যথেষ্ট।’...
বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হলেন বিমল মিত্র। বাংলায় এত সহজ করে আর কারও লেখায় ইতিহাসকে কথা বলতে দেখা যায়নি। তিনি ১৯১২ সালের ১৮ মার্চ বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা নদীয়া জেলার হাঁসখালি থানার এক প্রত্যন্ত গ্রাম ফাতেপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সতীশচন্দ্র মিত্র এবং মাতা সুরঞ্জনা দেবী। ৫০০টি গল্প ও শতাধিক উপন্যাস তিনি লিখেছেন। ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হন। এ ছাড়া বহু পুরস্কার ও সম্মান লাভ করেন। তার রচনা ভারতের বিভিন্ন চলচ্চিত্ররূপে প্রকাশিত হয়েছে। শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার হিসেবে তিনি ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার পেয়েছেন। অপরাজেয় কথাসাহিত্যিক বিমল মিত্রের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।