মস্তিষ্কে টিউমার হলো মস্তিষ্ক বা তার আশপাশে অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি। মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডে যেসব টিউমার হয়, সেগুলোকে একসঙ্গে বলা হয় সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম (CNS) টিউমার।
মস্তিষ্কের টিউমার দুই ধরনের হতে পারে—ক্যান্সারজনিত (ম্যালিগন্যান্ট) অথবা অক্যান্সারজনিত (বেনাইন)। কিছু টিউমার দ্রুত বাড়ে, আবার কিছু টিউমার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। তবে ক্যান্সার হোক বা না হোক, টিউমার বড় হলে তা মস্তিষ্কের আশপাশের টিস্যুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে।
মস্তিষ্কের টিউমার দুই ধরনের:
প্রাইমারি টিউমার: যা মস্তিষ্কেই শুরু হয়।
সেকেন্ডারি বা মেটাস্ট্যাটিক টিউমার: যা শরীরের অন্য অংশ থেকে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে।
আজ আমরা আলোচনা করবো মূলত প্রাইমারি টিউমারকে কেন্দ্র করে।
লক্ষণসমূহ
অনেক সময় ছোট টিউমার কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকে। তবে সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে—
• সকালের দিকে বেশি হওয়া মাথাব্যথা বা রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো মাথাব্যথা
• খিঁচুনি (সিজার)
• চিন্তা, কথা বলা বা বুঝতে সমস্যা
• আচরণে পরিবর্তন
• শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া
• ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারা বা মাথা ঘোরা
• চোখে ঝাপসা দেখা বা অন্য সমস্যা
• শুনতে সমস্যা
• মুখে ঝিনঝিনে ভাব বা অবশতা
• বমি বমি ভাব বা বমি
• বিভ্রান্তি বা দিকভ্রান্ত হওয়া
এই উপসর্গগুলো থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
কারণ কী?
মস্তিষ্কের কোষে থাকা কিছু জিনের পরিবর্তনের ফলে টিউমার তৈরি হয়। এই পরিবর্তনের ফলে কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত বাড়ে এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি দিন বেঁচে থাকে। কখনো জন্মগতভাবেই এই জিনের পরিবর্তন থাকতে পারে। আবার কখনো পরিবেশগত কারণে—যেমন বেশি রেডিয়েশনের সংস্পর্শে এলে বা ক্যান্সারের পূর্ব চিকিৎসা থেকেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
প্রথমে চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা ও রোগীর স্বাস্থ্য ইতিহাস নেন। এরপর নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষা করেন, যেখানে দেখা হয় ভারসাম্য ও সমন্বয়ক্ষমতা, মানসিক অবস্থা, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি এবং রিফ্লেক্স। এরপর সাধারণত এমআরআই স্ক্যান বা অন্য ব্রেইন ইমেজিং পরীক্ষা করা হয়।
চিকিৎসা কী?
চিকিৎসা নির্ভর করে টিউমারের ধরন, অবস্থান, আকার, রোগীর বয়স ও শারীরিক অবস্থার ওপর।
চিকিৎসার ধরনগুলো হতে পারে—
• অপারেশন (ক্রানিওটমি): মস্তিষ্কের টিউমার যতটা সম্ভব নিরাপদভাবে কেটে ফেলা হয়।
• রেডিয়েশন থেরাপি: এক্স-রে ব্যবহার করে টিউমার ধ্বংস করা হয়।
• রেডিওসার্জারি: গামা রে বা প্রোটন বিম দিয়ে টিউমার ধ্বংস করা হয়, অপারেশনের প্রয়োজন হয় না।
• ব্র্যাকিথেরাপি: টিউমারের পাশে রেডিওএকটিভ বস্তু স্থাপন করে টিউমার ধ্বংস করা হয়।
• কেমোথেরাপি: ওষুধ দিয়ে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়। ইনজেকশন বা মুখে খাওয়ার ওষুধ হতে পারে।
• ইমিউনোথেরাপি: শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করানো হয়।
• টার্গেটেড থেরাপি: কেবল ক্যান্সার কোষের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যকে টার্গেট করে ওষুধ প্রয়োগ করা হয়।
• ওয়াচফুল ওয়েটিং: ছোট টিউমার হলে চিকিৎসকের নজরদারিতে রাখা হয়।
উপসর্গ উপশমে সহায়ক চিকিৎসা
• শান্ট বসানো: মস্তিষ্কে চাপ বেড়ে গেলে অতিরিক্ত তরল বের করে দিতে টিউব বসানো হয়।
• ওষুধ: ম্যানিটল ও কর্টিকোস্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ দিয়ে মস্তিষ্কের ফোলা কমানো হয়।
• প্যালিয়েটিভ কেয়ার: দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের আরাম ও মানসিক সহায়তার জন্য বিশেষায়িত সেবা।
মস্তিষ্কের টিউমার একটি জটিল ও ভয়ের বিষয় হলেও, সময়মতো শনাক্ত ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। শরীর বা আচরণে অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করলে দেরি না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। স্বাস্থ্য সচেতনতা জীবন বাঁচাতে পারে।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক


