আমাদের শরীরের ধমনিগুলো অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যুতে পৌঁছে দেয়। কিন্তু যখন ধমনির ভেতরে প্লাক জমতে শুরু করে, তখন ধমনির দেয়াল মোটা ও শক্ত হয়ে যায়। ফলে রক্ত চলাচলের পথ সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। ধমনির এই সংকোচনকে অনেক সময় ‘ধমনি শক্ত হয়ে যাওয়া’ বলা হয়।
শুরুর দিকে এই প্রক্রিয়া ধীরে এবং নীরবে ঘটে। তাই বেশির ভাগ মানুষই বুঝতে পারেন না যে তাদের শরীরে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু প্লাক যখন বড় হয়ে যায়, তখন তা ধমনির ভেতরের জায়গা কমিয়ে দেয়। ফলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছাতে পারে না। কখনো কখনো এই প্লাক ফেটে গিয়ে রক্ত জমাট (ক্লট) তৈরি করে, যা সম্পূর্ণভাবে রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে দিতে পারে।
কেন এটি বিপজ্জনক?
ধমনিকে যদি একটি মহাসড়কের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তা হলে প্লাক জমা মানে সেই রাস্তা সরু হয়ে যাওয়া। আর যদি সেখানে রক্ত জমাট বাঁধে, তা হলে সেটি যেন মাঝখানে একটি বড় বাধা তৈরি করে—যার ফলে রক্ত চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। যদি এই অবস্থা হৃদযন্ত্রে ঘটে, তা হলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে; আর মস্তিষ্কে হলে স্ট্রোকের ঝুঁকি থাকে।
কতটা সাধারণ এই রোগ?
অ্যাথেরোস্কেলরোসিস খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। বিশ্বজুড়ে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের প্রধান কারণই হলো এই রোগ। অনেক মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হলেও তা জানেন না। কারণ লক্ষণগুলো অনেক দেরিতে প্রকাশ পায়।
লক্ষণগুলো কী?
অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের লক্ষণ সাধারণত তখনই দেখা যায়, যখন ধমনির প্রায় ৭০ শতাংশ বা তার বেশি অংশ ব্লক হয়ে যায়। আক্রান্ত স্থানের ওপর নির্ভর করে লক্ষণগুলো ভিন্ন হতে পারে।
হৃদযন্ত্রে সমস্যা হলে: বুকব্যথা (অ্যাঞ্জাইনা), শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, অস্বস্তি, বমিভাব, ক্লান্তি বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন দেখা দিতে পারে।
পরিপাকতন্ত্রে সমস্যা হলে: খাওয়ার পর পেটব্যথা, ফাঁপা ভাব, ডায়রিয়া, বমি এবং অযথা ওজন কমে যেতে পারে।
পা ও পায়ের পাতায় সমস্যা হলে: হাঁটার সময় পেশিতে ব্যথা, বিশ্রামে পায়ে জ্বালা বা ব্যথা, পায়ের ত্বক ঠাণ্ডা বা রং পরিবর্তন, ক্ষত দ্রুত না শুকানো—এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
কিডনিতে সমস্যা হলে: রক্তচাপ হঠাৎ বেড়ে যাওয়া, প্রস্রাবের অভ্যাসে পরিবর্তন, শরীরে ফোলা, ক্লান্তি, ত্বক শুষ্ক বা চুলকানি হতে পারে।
মস্তিষ্কে সমস্যা হলে: হঠাৎ মাথা ঘোরা, শরীরের একপাশ অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, চোখে কম দেখা বা এক চোখে অন্ধকার নেমে আসা—এসব স্ট্রোকের পূর্বলক্ষণ হতে পারে।
কেন হয় এই রোগ?
গবেষকদের মতে, ধমনির ভেতরের স্তর (এন্ডোথেলিয়াম) ক্ষতিগ্রস্ত হলে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস শুরু হয়। এই ক্ষতির পেছনে কিছু প্রধান কারণ হলো—
রক্তে অতিরিক্ত খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) ও ট্রাইগ্লিসারাইড
ধূমপান বা তামাক ব্যবহার
উচ্চ রক্তচাপ
ডায়াবেটিস
এই কারণগুলো ধীরে ধীরে ধমনির ক্ষতি করে এবং প্লাক জমার পথ তৈরি করে।
রোগের ধাপগুলো
অ্যাথেরোস্কেলরোসিস একদিনে হয় না; এটি কয়েকটি ধাপে দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠে।
প্রথমে ধমনির ভেতরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে প্রদাহ তৈরি হয়। এর পর চর্বিযুক্ত দাগ (ফ্যাটি স্ট্রিক) তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বড় প্লাকে রূপ নেয় এবং ধমনির পথ সংকীর্ণ করে। শেষ পর্যায়ে প্লাক ফেটে গিয়ে রক্ত জমাট বাঁধে, যা মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করে।
ঝুঁকির কারণ
কিছু ঝুঁকির কারণ আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, আবার কিছু পারি না। যেমন-
বয়স (পুরুষদের ক্ষেত্রে ৪৫+, নারীদের ক্ষেত্রে ৫৫+)
পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস
ডায়াবেটিস
উচ্চ রক্তচাপ
উচ্চ কোলেস্টেরল
ধূমপান
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
কী কী জটিলতা হতে পারে?
অ্যাথেরোস্কেলরোসিস শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়, যার ফলে—
হার্ট অ্যাটাক
স্ট্রোক
হৃদযন্ত্রের অস্বাভাবিক ছন্দ
হার্ট ফেইলিউর
কিডনি রোগ
পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ
অ্যানিউরিজম
এসব গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
চিকিৎসক প্রথমে শারীরিক পরীক্ষা করেন এবং রোগীর পারিবারিক ইতিহাস ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে চান। রক্ত পরীক্ষা করে কোলেস্টেরলের মাত্রা নির্ণয় করা হয়। প্রয়োজনে আরও কিছু পরীক্ষা করা হয়, যেমন-
অ্যাঞ্জিওগ্রাফি
সিটি স্ক্যান
ইসিজি
ইকোকার্ডিওগ্রাম
স্ট্রেস টেস্ট
আল্ট্রাসাউন্ড
এসব পরীক্ষার মাধ্যমে ধমনির অবস্থা ও রক্তপ্রবাহ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
অ্যাথেরোস্কেলরোসিস চিকিৎসায় মূল লক্ষ্য হলো ঝুঁকি কমানো এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন–
ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করা
স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ (যেমন- ফল, সবজি, কম চর্বিযুক্ত খাবার)
নিয়মিত ব্যায়াম
ওজন নিয়ন্ত্রণ
ওষুধ–রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ওষুধ দেওয়া হয়। প্রয়োজনে রক্ত জমাট প্রতিরোধে ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার বা প্রক্রিয়া–
ধমনির ব্লক বেশি হলে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, স্টেন্ট বসানো বা বাইপাস সার্জারির মতো চিকিৎসা করা হয়।
সচেতন থাকাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ
অ্যাথেরোস্কেলরোসিস একটি নীরব কিন্তু মারাত্মক রোগ। তাই লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই সচেতন হওয়া জরুরি। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম এবং ধূমপান থেকে দূরে থাকাই পারে এই রোগ থেকে অনেকটাই নিরাপদ রাখতে।
লেখিকা: স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং কলাম লেখক



