যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া শুল্কের সামাল দিতে বিকল্প দেশ খুঁজছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প মালিকরা। আগামী ১ আগস্ট থেকে নতুন শুল্কারোপের ট্যারিফ চালু হবে যুক্তরাষ্ট্রে। তাই এ জটিলতা থেকে বাচঁতে নতুন দেশ থেকে অর্ডার আনতে ব্যতিব্যস্থ হয়ে পড়েছেন কারখানা মালিকরা। নতুন ট্যারিফকে সামনে রেখে অনেক অর্ডার স্থগিতসহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে মাঝারি থেকে ছোট পোশাক কারখানাগুলোর।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএম) সূত্র জানায়, ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিল, আর্জেটিনা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মতো দেশকে টার্গেট করে এগিয়ে যাচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকরা। যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে কীভাবে সমপরিমাণ পণ্য অন্যদেশে রপ্তানি করা যায় সেই চিন্তা করা হচ্ছে। একাধিক মালিক জানিয়েছেন ইউরোপে ও অন্যান্য দেশগুলোতেও অর্ডার স্থানান্তর শুরু করেছেন।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বায়ারদের উচ্চমূল্য শুল্ক গুনতে হলে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে বায়াররা। এর ফলে অনেক কারখানায় শ্রমিকদের চাকরি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান (যেমন Classic Fashion, Patriot Eco Apparel)। ইতোমধ্যেই মার্কিন ক্রেতাদের কাছ থেকে স্থগিতের নির্দেশ পাওয়ায় তারা অর্ডার স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন। একসময় মার্কিন বাজারে রপ্তানি ছিল ১৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। যা এখন ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
সূত্রমতে, বাংলাদেশ সরকারও ট্যারিফ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করছে। পাশাপাশি আমেরিকান এলএমপি (তরলীকৃত গ্যাস), তুলা ও কৃষিপণ্য আমদানি বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে যাতে পালটা সুবিধা পাওয়া যায়।
গত এপিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এক নির্বাহী আদেশে শুল্ক ৩৭ শতাংশ ঘোষণা করেছিল। সেটি আবার স্থগিত করে পূর্বের ১৬ শতাংশ শুল্কের ওপর ১০ শতাংশ শুল্কারোপ করে। এতে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পণ্যের ওপর ২৬ শতাংশ শুল্ক দাঁড়ায়। চলতি মাসে অপর এক আদেশে ৩৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রাখে ট্রাম্প সরকার। আগে যেখানে ১৬ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো সেখানে এখন থেকে তিনমাসের জন্য শুল্ক দিতে হচ্ছে ২৬ শতাংশ। ১০ শতাংশ বর্ধিত শুল্কেও হিমসিম খেতে হচ্ছে পোশাকখাতকে। এ নিয়ে পোশাকশিল্প মালিক ও বায়ারদের মধ্যে চলে দর কষাকষি। বর্ধিত ১০ শতাংশের মধ্যে ৫ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছেন বায়ার ও ৫ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছেন পোশাকশিল্প মালিকরা। যুক্তরাষ্ট্রে মোট রপ্তানি আয়ের ওপর ১০ শতাংশ টাকা হিসেবে প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা চলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগারে। এর অর্ধেক ৫ শতাংশ হিসেবে বাংলাদেশের পোশাক মালিকদের থেকে চলে যায় ১২৫০ কোটি টাকা।
পোশাক কারখানার মালিকরা জানান, পোশাক তৈরিতে দুই থেকে আড়াই শতাংশের বেশি লাভ হয় না পোশাক শিল্প মালিকদের। লাভের আড়াই শতাংশ ছেড়ে দিলে আর আড়াই শতাংশ পকেট থেকে দিতে হবে। এতে চরম হতাশায় পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বায়ারদের অর্ডার নেওয়া পোশাক কারখানার মালিকরা। কারণ তারা অর্ডার বুকিং নেওয়ার সময় বর্ধিত ১০ শতাংশ হিসাব করে অর্ডার নেননি। এখন বায়ারদের চাপাচাপিতে দুই পক্ষকেই ভাগভাগি করে ১০ শতাংশ বর্ধিত শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর ওপর আগামী ১ আগস্ট থেকে ৩৫ শতাংশ শুল্কারোপ কীভাবে সামলাবেন মালিকরা, এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশজুড়ে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএম) প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ সেলিম রহমান খবরের কাগজকে বলেন, 'ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প দেশ খোঁজার দৌড়ঝাপ। কিন্তু এ দৌড়ে দেশের ছোট-মাঝারি পোশাকশিল্প কারখানা ঝরে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বড় কারখানাগুলো হয়তো টিকে থাকতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ কমানোর আশা আমরা এখনও ছেড়ে দিচ্ছি না। কারণ তৃতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সঙ্গে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সে বৈঠকে কোনো একটা সফলতা আসতে পারে।
বিজিএমইএ পরিচালক ক্লিপটন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, 'আমরা একটি অসম ট্রেড যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ যুদ্ধে পেরে ওঠা আমাদের জন্য সক্ষম নয়। তাই আমাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিও বাড়াতে হবে। তাদের উৎপাদিত এলএমজি, তুলা, সয়াবিনসহ আরও অনেক ধরণের পণ্য আছে সেগুলো বেশি করে আমদানি করতে হবে। তাদের সঙ্গে বসে ট্যারিফ সমতায় আসতে হবে। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি এ পোশাকশিল্প। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হাতছাড়া করা যাবে না।'
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামে প্রেসিডেন্ট ও বিজিএমইএ পরিচালক এসএম আবু তৈয়ব খবরের কাগজে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশুল্ক বাংলাদেশে পোশাক খাতের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অর্ডার স্থগিত ও পরবর্তী অনিশ্চয়তার কারণে শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে বিকল্প বাজার আশার আলো দেখাচ্ছে। এর জন্য রপ্তানিকারক ও সরকারের সমন্বিত এবং সক্রিয় উদ্যোগ অপরিহার্য।'
সাত্তার/মৌসুমী/মেহেদী/