ভারতশাসিত কাশ্মীরের পাহাড়ি অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তিন সন্দেহভাজন বিদ্রোহী নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী।
সোমবার (২৮ জুলাই) শ্রীনগর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্বে দাচিগাম জাতীয় উদ্যানের পার্বত্য এলাকায় এ সংঘর্ষ ঘটে।
ভারতীয় সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, “তীব্র গোলাগুলির মুখে তিন সন্ত্রাসীকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অভিযান চলমান রয়েছে।”
মূলত মুসলিম-অধ্যুষিত কাশ্মীর অঞ্চলটি ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত হয়ে রয়েছে। উভয় দেশই পুরো কাশ্মীরকে নিজেদের অংশ হিসেবে দাবি করে এবং এ নিয়ে দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী এরই মধ্যে তিনটি যুদ্ধ করেছে।
১৯৮৯ সাল থেকে কাশ্মীরি বিদ্রোহীরা ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে। কেউ কেউ চায় স্বাধীনতা, কেউবা অঞ্চলটির পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তি। ভারত বরাবরই অভিযোগ করে আসছে, পাকিস্তান এসব বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছে। তবে ইসলামাবাদ বলছে, তারা কেবল কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের সংগ্রামে কূটনৈতিকভাবে সহায়তা করে।
সোমবার নিহত হওয়া তিন ব্যক্তি সম্পর্কে ভারতীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তারা ২২ এপ্রিলের পাহেলগাম হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সন্দেহভাজন। ওই হামলায় ২৬ জন নিহত হয়, যা ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনব্যাপী সামরিক সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং উভয়পক্ষ মিলিয়ে ৭০ জনেরও বেশি নিহত হয়।
ভারতীয় সেনাবাহিনী সোমবার নিহতদের নাম প্রকাশ করেনি, তবে সংবাদ সংস্থা ‘এএফপি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নিহত তিনজনই ‘বিদেশি নাগরিক’ ছিলেন।
এই মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (TRF)’ নামে একটি গোষ্ঠীকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। ওই গোষ্ঠীকেই পাহেলগাম হামলার জন্য দায়ী করা হয়েছে।
সোমবারের বন্দুকযুদ্ধ হিন্দু তীর্থস্থান অমরনাথের কাছে সংঘটিত হয়। এ বছর ৩ জুলাই থেকে শুরু হওয়া বার্ষিক তীর্থযাত্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে কাশ্মীরে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। তবে পাহেলগাম হামলার পর অনেক স্থানীয় বিদ্রোহী নিহত হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের ভূমিকা অস্বীকার ভারতের
এদিকে, বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেক ঘটনায় ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সোমবার পার্লামেন্টে বলেন, “মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত তার সামরিক অভিযান সম্পন্ন করে কারণ পূর্বনির্ধারিত সব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছিল। এতে বাইরের কোনো চাপে আমরা যুদ্ধবিরতি দিইনি।”
তার এই বক্তব্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে, যেখানে ট্রাম্প বলেছিলেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে তার মধ্যস্থতা রয়েছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে, পাহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের নাগরিকরা জড়িত ছিল, তবে পাকিস্তান এ অভিযোগ অস্বীকার করে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
মে মাসের সামরিক সংঘর্ষে ভারত ও পাকিস্তান জঙ্গিবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোনসহ নানা অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করে, যার ফলে দুই দেশের বহু মানুষ হতাহত হয়।
ট্রাম্প তখন ঘোষণা দেন, উভয় দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানালেও ভারত জানায়, এ সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা ছিল না; নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদ দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমঝোতায় পৌঁছেছে।
বিরোধীদের প্রশ্ন
ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো পাহেলগাম হামলাকে ঘিরে গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং হামলাকারীদের ধরতে না পারার বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করেছে।
তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়াসহ যুদ্ধে ভারতীয় জেট বিমান ভূপাতিত হওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তুলছে।
পাকিস্তান দাবি করে, তারা সংঘর্ষে অত্যাধনিক রাফালসহ পাঁচটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে, যদিও ভারতের সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা আকাশপথে “প্রাথমিক ক্ষতির” কথা স্বীকার করলেও বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/