ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ঝাপোরিঝিয়ায় রাশিয়ার চালানো ধারাবাহিক বিমান হামলায় অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ ১৬ জন কারাবন্দি রয়েছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং আঞ্চলিক কর্মকর্তারা মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) এসব তথ্য জানিয়েছেন।
রাশিয়ার এই হামলা শুরু হয় সোমবার রাতের ঠিক সেই সময় যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধানে নতুন এক সময়সীমা বেঁধে দেন। তিনি রাশিয়াকে ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর আলটিমেটাম দেন—যেটি এর আগে দেওয়া ৫০ দিনের সময়সীমার তুলনায় অনেক সংক্ষিপ্ত।
ঝাপোরিঝিয়ার সামরিক প্রশাসনের প্রধান ইভান ফেদোরভ জানান, সোমবার রাতভর শুধু ওই অঞ্চলেই রাশিয়া আটটি বিমান হামলা চালিয়েছে। এর একটি হামলায় ঝাপোরিঝিয়া শহরের কাছে অবস্থিত একটি কারাগার বা পেনাল কলোনিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
তিনি বলেন, ‘রাশিয়া রাতের আঁধারে ঝাপোরিঝিয়ার কাছে একটি পেনাল কলোনিতে বোমা হামলা চালিয়েছে, এতে ১৬ জন নিহত, ৩৫ জন আহত হয়েছে। সাধারণ নাগরিকরা প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি আরেকটি জঘন্য যুদ্ধাপরাধ।’
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, নিহত ২২ জনের মধ্যে তিনজন কামিয়ানস্কে শহরে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারান। তাদের একজন ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা নারী। হামলাটি দিনিপ্রোপেত্রভস্ক অঞ্চলের একটি হাসপাতালকে লক্ষ্য করে চালানো হয়।
দিনিপ্রোপেত্রভস্ক অঞ্চলের সিনেলনিকোভে জেলায় আরও একজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হন বলে জানিয়েছেন ওই অঞ্চলের সামরিক প্রশাসনের প্রধান সের্হি লিসাক।
একই রাতে ওডেসা অঞ্চলের ভেলিকা মিখাইলিভকা গ্রামে আরেকটি হামলায় ৭৫ বছর বয়সী এক নারী নিহত হন এবং ৬৮ বছর বয়সী একজন পুরুষ আহত হন। ওই হামলায় একটি বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানান লিসাক।
এই ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়ায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সিনিয়র উপদেষ্টা আন্দ্রেই ইয়ারমাক সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের শাসনযন্ত্র, যেটি বিভিন্ন উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রকেও হুমকি দিচ্ছে, সেটিকে অবশ্যই এমন অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপে ফেলতে হবে যাতে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা হারায়।’’
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, সোমবার রাতভর রাশিয়া ৩৭টি ড্রোন ও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এর মধ্যে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৩২টি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়।
অন্যদিকে, রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় রোস্তভ অঞ্চলে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় একজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে রুশ কর্তৃপক্ষ। তবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা ওই রাতে মোট ৭৪টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে, যার মধ্যে ২২টি ছিল রোস্তভ অঞ্চলে।
রোস্তভ অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত গভর্নর ইউরি স্লিউসার জানান, ওই হামলায় একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চালক নিহত হন। তিনি বলেন, হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল সালস্ক, কামেনস্ক-শাখতিনস্কি, ভালগোদনস্ক, বোকভস্কি, তারাসোভস্কি এবং স্লিউসার।
ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে স্যালস্ক ট্রেন স্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে একটি মালবাহী ট্রেন ও একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে আঘাত লাগে। যাত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন স্লিউসার। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ট্রেন চলাচল স্থগিত করতে বাধ্য হয় রাশিয়ান রেলওয়ে।
ইউক্রেন এই হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য না করলেও তারা বরাবরই বলে আসছে, রাশিয়ার অবিরাম হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা সীমান্তের ভেতরে হামলা চালাতে বাধ্য হচ্ছে।
উভয় পক্ষই সরাসরি বেসামরিক মানুষদের লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করলেও চলমান যুদ্ধের দুই বছরে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই ইউক্রেনীয়।
রাশিয়ার সাম্প্রতিক গ্রীষ্মকালীন অভিযানে ইউক্রেন পূর্ব ফ্রন্টে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ওই ফ্রন্টের কিছু এলাকাকে ২০২২ সালের হামলার পর থেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রুশ বাহিনী দিনিপ্রোপেত্রভস্ক অঞ্চলের মালিয়েভকা দখলের দাবি করেছে, যা ওই অঞ্চলে তাদের দ্বিতীয় অগ্রগতি, যদিও ইউক্রেন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/