ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় জানিয়েছে, ভারতের অপারেশন মহাদেব ২২শে এপ্রিলের পাহালগাম সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে পাকিস্তানের ইচ্ছাকৃত ধারাবাহিক মিথ্যাচার প্রকাশ করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে, এবার ভারত চূড়ান্ত এবং বহু-স্তরের প্রমাণ উপস্থাপন করে জানিয়েছে, ২৮ জুলাই জম্মু ও কাশ্মীরের দাচিগাম-হারওয়ান বনাঞ্চলে অপারেশন মহাদেবের সময় নিহত তিন সন্ত্রাসী ছিলেন সিনিয়র পাকিস্তানি নাগরিক এবং নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার (এলইটি) কর্মী।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় জানায়,বায়োমেট্রিক আইডি চিপ, পাকিস্তানি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জারি করা ভোটার স্লিপ এবং এনএডিআরএ রেকর্ড থেকে শুরু করে স্যাটেলাইট ফোন লগ, জিপিএস ডেটা এবং ডিএনএ ম্যাচ পর্যন্ত তদন্তের প্রতিটি স্তর সরাসরি আক্রমণকারীদের পাকিস্তানের মাটি এবং লস্কর কমান্ড কাঠামোর সাথে সংযুক্ত করে।
সুলেমান শাহ ওরফে ফয়জল জাট, আবু হামজা ওরফে আফগান এবং ইয়াসির ওরফে জিবরান -এই তিনজন ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পাহালগাম হামলার নেপেথ্যের প্রধান হোতা ছিল, যেখানে ২৬ জন বেসামরিক নাগরিককে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছিল।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় জানিয়েছে, হামলাকারীদের পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাদের টেকনিকাল কর্মকর্তা এবং ফরেনসিক ল্যাবরেটরির সহায়তায় ভৌত, ইলেকট্রনিক, বায়োমেট্রিক এবং সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট অভিযোগপত্র তৈরি করেছে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলো জানায়, সুলেমান শাহ এবং আবু হামজার পকেটে পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জারি করা দুটি লেমিনেটেড ভোটার আইডি স্লিপ পাওয়া গেছে। স্লিপের সিরিয়াল নম্বরগুলো NA-125 (লাহোর) এবং NA-79 (গুজরানওয়ালা) এর ভোটার তালিকার সাথে মিলে যায়।
এরপর, সন্ত্রাসীদের ব্যাগ থেকে NADRA-সংযুক্ত স্মার্ট আইডি চিপ উদ্ধার করা হয়েছে। আছে একটি ক্ষতিগ্রস্ত স্যাটেলাইট ফোন থেকে উদ্ধার করা একটি মাইক্রো-এসডি কার্ডে NADRA থেকে প্রাপ্ত সম্পূর্ণ বায়োমেট্রিক রেকর্ড। যার মধ্যে আঙুলের ছাপ, মুখের টেমপ্লেট এবং পারিবারিক বংশ তালিকা রয়েছে, যা এগুলোকে চাঙ্গা মাঙ্গা (কাসুর জেলা) এবং পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের (PoK) রাওয়ালকোটের কাছে কোইয়ান গ্রামের সাথে সংযুক্ত করে।
এছাড়া, তাদের ব্যাগে পাকিস্তানের তৈরি পণ্য পাওয়া গেছে। যার মধ্যে রয়েছে, করাচিতে তৈরি জনপ্রিয় পাকিস্তানি চকলেট ক্যান্ডিল্যান্ড এবং চকোম্যাক্সের মোড়ক। এগুলোর সঙ্গে একই ব্যাগে পাওয়া গেছে গোলাবারুদ। মোড়কের লট নম্বরগুলো ২০২৪ সালের মে মাসে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মুজাফফরাবাদে পাঠানো একটি চালানের সাথে মিলে যায়, যা পাকিস্তান থেকে সাম্প্রতিক সরবরাহ নিশ্চিত করে।
এরপর, সুলেমান শাহের কাছ থেকে উদ্ধার করা একটি গারমিন জিপিএস ডিভাইসে বাইসারানে প্রত্যক্ষদর্শীদের রিপোর্ট করা গুলি চালানোর অবস্থানের সাথে মিলে যায় এমন ওয়েপয়েন্ট সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
২০২২ সালের মে মাসে সন্ত্রাসীরা গুরেজের কাছে নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করে, গোয়েন্দা ব্যুরো (আইবি) তাদের প্রথম রেডিও চেক-ইন নিশ্চিত করে।
২২ এপ্রিল থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে, সন্ত্রাসীরা একটি স্যাটেলাইট ফোন (IMEI 86761204-XXXXXX) ব্যবহার করে যা রাতে ইনমারস্যাট-৪ এফ১ স্যাটেলাইটকে পিং করছিল। সংকেতের ত্রিভুজকরণ তাদের আস্তানাকে হারওয়ান বনাঞ্চলে ৪ কিমি² এলাকায় সংকুচিত করে।
এর বাইরেও,ফরেনসিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বৈসারান গণহত্যার ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা ৭.৬২x৩৯ মিমি শেলের খোলের সাথে ২৮ জুলাই সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে জব্দ করা AK-103 রাইফেলের মিল রয়েছে। অপরাধস্থলে পাওয়া একটি ছেঁড়া, রক্তাক্ত শার্টের ডিএনএ দাচিগামে নিহত তিনজনের মৃতদেহের সাথে মিলে গেছে। পাশাপাশি বুলেটের আঘাতের চিহ্ন ১০০ শতাংশ মিলে গেছে, যা একই অস্ত্র ব্যবহারের চূড়ান্ত প্রমাণ।
ভারতের তদন্তে হামলার সমন্বয়কারী এলইটির কমান্ড-এন্ড-কন্ট্রোল কাঠামোও উন্মোচিত হয়েছে:
লস্কর-ই-তৈবার দক্ষিণ কাশ্মীরের অপারেশন প্রধান এবং লাহোরের চাঙ্গা মাঙ্গার বাসিন্দা সাজিদ সাইফুল্লাহ জাটকে এই হামলার মূল হোতা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা অনুসারে, স্যাট-ফোন থেকে পাওয়া ভয়েস নমুনা সাজিদের কথোপকথনের আগের রেকর্ডের সাথে মিলে যায়।
লস্কর-ই-তৈয়বার রাওয়ালকোট কমান্ডার রিজওয়ান আনিস ২৯শে জুলাই নিহত সন্ত্রাসীদের বাড়িতে গিয়ে গাইবানা নামাজ (মৃতদেহ ছাড়া জানাজা) আয়োজন করেন, যা স্থানীয়রা ধারণ করেছিলেন - একটি ভিডিও যা এখন ভারতের প্রমাণপত্রের অংশ।
এদিকে,হামলার পরের কয়েক সপ্তাহ ধরে পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের রাষ্ট্র বা তার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের কোনও ভূমিকার কথা ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ স্থানীয় গণমাধ্যমের সাথে কথা বলে ভারতের অভিযোগ সরাসরি উড়িয়ে দিয়েছেন।
সুলতানা দিনা/