পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আসিম মুনিরের পর এবার নয়াদিল্লিকে হুঁশিয়ারি দিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ভারতকে শত্রু আখ্যা দিয়ে শাহবাজ শরিফ হুমকি দিলেন, পাকিস্তানের এক ফোঁটা পানিও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে ভারতকে উচিৎ শিক্ষা দেওয়া হবে।
ইসলামাবাদে এক জনসভায় উপস্থিত হয়ে কড়া সুরে ভারতকে হুঁশিয়ারি দেন শাহবাজ। তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের শত্রুকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই যে, আপনারা যদি পানি আটকে দেওয়ার দেওয়ার চেষ্টা করেন তবে তার ফল ভালো হবে না। পাকিস্তানের প্রাপ্য একফোঁটা পানিও আপনারা কেড়ে নিতে পারবেন না। তারপরও যদি কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয় সেক্ষেত্রে এমন শিক্ষা দেব যে সারা জীবন পস্তাবেন।’
অর্থাৎ সিন্ধুর পানি আটকে দিলে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা দেওয়া হবে বলে বার্তা দিলেন শাহবাজ।
এর আগেভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দেন পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি। বিলাওয়াল ভুট্টো জানান, ভারত যদি সিন্ধু নদীর উপর বাঁধ দেয়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। শুধু তাই নয়, সিন্ধু-সহ ভারতের ৬ নদী দখল করার হুমকিও দেন তিনি।
সবমিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতকে লক্ষ্য করে পাকিস্তানের এই লাগাতার হুমকির বহর দেখে অনেকেই বলছেন, পাকিস্তানের এধরণের কার্যক্রম এই অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আবারো ব্যাহত করতে পারে।
জম্মু-কাশ্মীরের পাহালগামে হামলায় ২৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি বাতিল করেছে ভারত। ২৩ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন দেশটির মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির জরুরি বৈঠকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ঐতিহাসিক সিন্ধু পানি বন্টন চুক্তি বাতিল করেন।
সিন্ধু অববাহিকার ছয়টি নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত এই আন্তর্জাতিক চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তের কারণে এখন প্রশ্ন উঠছে, ভারত কি আসলেই সিন্ধু নদী ও এর আরও দুটো শাখা নদীর পানির প্রবাহ পাকিস্তানের জন্য বন্ধ করে দিতে পারবে?
১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর করাচিতে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ূব খান এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছে বহুল আলোচিত এই চুক্তি স্বাক্ষর করে। বিশ্বে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল পানি বণ্টন চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় ভারত-পাকিস্তানের এই চুক্তিকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিন্ধু নদীতে যখন অনেক বেশি পানির প্রবাহ থাকবে, তখন এই হাজার কোটি ঘনমিটার পানি আটকানো ভারতের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কারণ এই বিপুল পানি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার মতো সংরক্ষণাগার বা খাল, কোনোটিই ভারতের নেই।
এছাড়া ভারতের পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো মূলত ‘রান-অব-দ্য-রিভার’ বা বাঁধভিত্তিক। এগুলোর জন্য বিশাল জলাধারের প্রয়োজন হয় না। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে শুধু প্রবাহমান পানির গতি ব্যবহার করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করা হয়, ওগুলোতে বিপুল পরিমাণ পানি জমিয়ে রাখার কোনো দরকার পড়ে না।‘
এই চুক্তির অধীনে সিন্ধু, ঝেলাম ও চেনাব নদীর ২০ শতাংশ পানি ভারতের জন্য বরাদ্দ থাকলেও যথাযথ অবকাঠামোর অভাবে ভারত তার অনেকটাই ব্যবহার করতে পারেনি। এ কারণেই ভারত জলাধার নির্মাণ করতে চায়।
কিন্তু পাকিস্তান মনে করে, এই তিন নদীতে অবকাঠামো নির্মাণের অর্থই হচ্ছে চুক্তি লঙ্ঘন করা।
তবে এখন চুক্তি স্থগিত হওয়ায় ভারত ওই নদীগুলোতে নতুন করে বাঁধ দিতে পারবে বা পুরোনো অবকাঠামোকে পরিবর্তন করতে পারবে বা পাকিস্তানকে না জানিয়ে পানিও সরাতে পারবে। কিন্তু এর আগে যেকোনও প্রকল্পের নথিপত্র পাকিস্তানের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে হতো। এখন থেকে আর সেটা লাগবে না।
কিন্তু কথা হচ্ছে, চুক্তি থেকে সরে এলেও ভারত রাতারাতি এই তিন নদীতে কোনও প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারবে না। কারণ পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও ভারতের অভ্যন্তরেই ওই এলাকায় স্থানীয়দের প্রতিবাদের কারণে আগে শুরু করা অনেক প্রকল্পের কাজই শেষ হয়নি, বরং থেমে আছে।
২০১৬ সালেও যখন কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলা হয় তখন ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলেছিল, তারা দ্রুত সিন্ধু অববাহিকায় বেশ কয়েকটি বাঁধ নির্মাণ করবে এবং পানি সংরক্ষণ প্রকল্পের নির্মাণকাজ দ্রুততম সময়ের মাঝে করবে। বর্তমানে সেই প্রকল্পগুলোর অগ্রগতিও খুবই কম।
তবে পানি আটকে দিলে পাকিস্তানের ওপর তার কিছু প্রভাব পড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন- ভারত পানিপ্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারলেও বা রাতারাতি নতুন কোনো অবকাঠামো স্থাপন না করলেও যেসব অবকাঠামো ইতোমধ্যে ভারতের কাছে আছে, সেগুলো দিয়ে ভারত যদি পাকিস্তানে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে শুষ্ক মৌসুমে পাকিস্তানে তার প্রভাব পড়বে। কারণ তখন দেশটিতে এমনিতেই তীব্র পানির সংকট থাকে।
সুলতানা দিনা/