মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ করেছে, গাজায় ফিলিস্তিনিদের অনাহারে রাখার জন্য ইসরায়েল একটি “ইচ্ছাকৃত নীতি” অনুসরণ করছে। জাতিসংঘ ও ত্রাণ সংস্থাগুলো যখন উপত্যকায় দুর্ভিক্ষের সতর্কবার্তা দিচ্ছে, তখনই এ অভিযোগ আনা হলো।
বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের চিকিৎসকরা যে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, তার ভিত্তিতে অ্যামনেস্টি এক প্রতিবেদনে বলেছে: “ইসরায়েল দখলকৃত গাজা উপত্যকায় ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারের নীতি বাস্তবায়ন করছে।”
সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল “পদ্ধতিগতভাবে ফিলিস্তিনিদের স্বাস্থ্য, সুস্থতা এবং সামাজিক কাঠামো ধ্বংস করছে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, “গত ২২ মাস ধরে ইসরায়েল যে পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে, তার লক্ষ্যই হলো ফিলিস্তিনিদের জীবনে এমন পরিস্থিতি চাপিয়ে দেওয়া, যা তাদের শারীরিক ধ্বংস নিশ্চিত করবে—এটি গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যারই অংশ।”
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলা শুরু করার পর থেকে ইসরায়েল প্রায় ৬২ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন সংস্থা এটিকে প্রতিশোধমূলক যুদ্ধ আখ্যা দিয়ে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনটি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গাজার তিনটি অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া ১৯ জন স্থানচ্যুত ফিলিস্তিনি এবং গাজার দুটি হাসপাতালের দুইজন চিকিৎসক-কর্মীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত করা হয়েছে ২৮ বছর বয়সী হাদিলের কথা। তিনি দুই সন্তানের মা এবং বর্তমানে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি বলেন: “আমার গর্ভপাত হয়ে যাওয়ার ভয় আছে, তবে সন্তানের কথাই বেশি ভাবি। অনাহারের প্রভাবে শিশুর স্বাস্থ্য, ওজন, জন্মগত ত্রুটি—এসব নিয়ে আতঙ্কে থাকি। এমনকি সন্তান সুস্থভাবেও জন্ম নিলে, তার জন্য কী জীবন অপেক্ষা করছে—বাস্তুহারা হয়ে, বোমার নিচে নাকি তাঁবুতে?”
৭৫ বছর বয়সী আজিজা নামের এক নারী অ্যামনেস্টিকে বলেছেন, তিনি মরতে চান। তার ভাষায়: “আমার মনে হয় আমি পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে গেছি। এই ছোট বাচ্চারা—আমার নাতি-নাতনিরাই বেঁচে থাকার যোগ্য। আমি মনে করি আমি তাদের ও আমার ছেলের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছি।”
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা, নীতি ও প্রচারণার সিনিয়র পরিচালক এরিকা গুয়েভারা রোসাস এক বিবৃতিতে বলেন: “ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ যখন গাজা সিটিতে পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযান চালানোর হুমকি দিচ্ছে, তখন আমরা যে সাক্ষ্যগুলো সংগ্রহ করেছি, সেগুলো শুধু কষ্টের বর্ণনা নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ, যে ব্যবস্থা ইসরায়েলকে দশকের পর দশক ফিলিস্তিনিদের ওপর অবাধ নির্যাতনের লাইসেন্স দিয়েছে।”
গাজা সিটির প্রায় দশ লাখ মানুষ, যাদের অনেকেই গত দুই বছরে একাধিকবার স্থানচ্যুত হয়েছেন, এখন আবারও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন, কারণ ইসরায়েল বর্তমানে উপত্যকার প্রধান নগরকেন্দ্রে আক্রমণ আরও তীব্র করেছে।
অস্ত্রবিরতির দাবি
রোসাস বলেন, গাজায় “ইসরায়েলের অমানবিক নীতি ও কর্মকাণ্ডের ভয়াবহ প্রভাব কাটাতে অবরোধের অবিলম্বে, নিঃশর্ত অবসান এবং একটি স্থায়ী অস্ত্রবিরতি জরুরি।”
তিনি আরও বলেন: “ইসরায়েলের অবরোধ ও চলমান গণহত্যার প্রভাব—বিশেষ করে শিশু, প্রতিবন্ধী, দীর্ঘমেয়াদি রোগী, বয়স্ক এবং গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের ওপর বিধ্বংসী। কেবল ত্রাণবাহী ট্রাক বাড়ানো বা কার্যত অকার্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ বিমান থেকে ত্রাণ ফেলার মতো উদ্যোগ দিয়ে এই ক্ষতি পূরণ করা যাবে না।”
এ সংবাদ প্রকাশের সময় পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অ্যামনেস্টির অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। যদিও গাজায় প্রবলভাবে ত্রাণ প্রবেশ সীমিত করছে, তবুও ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
এ যুদ্ধে খাদ্য সংকটের কারণে ইতোমধ্যেই অন্তত ২৫০ ফিলিস্তিনি, যাদের মধ্যে ১১০ শিশু, মারা গেছে। ২১ লাখ মানুষের আবাস গাজা উপত্যকা ২০০৭ সাল থেকেই ইসরায়েলের স্থল, আকাশ ও সমুদ্র অবরোধে ছিল। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অবরোধ আরও কঠোর করা হয়েছে—কখনো সম্পূর্ণ ত্রাণ বন্ধ রাখা হয়েছে, বর্তমানে সামান্য কিছু সরবরাহ ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি অঞ্চলের বেসামরিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা গাজায় ব্যাপক অপুষ্টির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। যদিও জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহল এতে তীব্র সমালোচনা করেছে।
‘আমাদের চোখের সামনে দুর্ভিক্ষ’
ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ইউরোপের কয়েকটি মিত্র দেশ ইসরায়েলকে গাজায় অবাধ ত্রাণ প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, মানবিক সঙ্কট এখন “অকল্পনীয় পর্যায়ে” পৌঁছেছে।
তাদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়: “আমাদের চোখের সামনেই দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ছে। অনাহার ঠেকাতে ও তা উল্টে দিতে এখনই জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
গত এপ্রিল মাসে অ্যামনেস্টি অভিযোগ করেছিল, গাজায় জোরপূর্বক স্থানচ্যুতির মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ওপর “লাইভস্ট্রিম করা গণহত্যা” চালাচ্ছে ইসরায়েল। তখন ইসরায়েল এসব অভিযোগকে “স্পষ্ট মিথ্যা” বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/