অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে যে অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল সেটিকে ফিলিস্তিনিরা ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করছেন। গণহত্যা, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পাশাপাশি মানুষকে অনাহারে রাখার অভিযোগ রয়েছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে।
এখন পর্যন্ত এই গণহত্যায় প্রাণ গেছে ৬২ হাজারের বেশি মানুষের, আহত হয়েছেন এক লাখ ৫৬ হাজার। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখো মানুষ।
২০২০ সাল থেকে দুর্নীতির অভিযোগে বিচারাধীন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসে ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি হওয়া প্রথম প্রধানমন্ত্রী। গত বছরের নভেম্বরে গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি।
এছাড়া, গাজায় ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলকে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও (আইসিজে) বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধের নায়ক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ড।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকা সত্ত্বেও নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধের নায়ক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত মঙ্গলবার রক্ষণশীল রেডিও উপস্থাপক মার্ক লেভিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তিনি ভালো মানুষ। তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন... কেননা তিনি যুদ্ধের নায়ক।আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। তিনি যেমন যুদ্ধের নায়ক তেমন মনে হয় আমিও।’
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে জবাবদিহির প্রচেষ্টা নিয়েও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘ অথচ তারা তাকে জেলে ঢোকানোর চেষ্টা করছে।’
তবে তিনি আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কথা বলেছেন নাকি ইসরায়েলে চলমান দুর্নীতির মামলার কথা বোঝাতে চেয়েছেন, তা পরিষ্কার নয়।
গাজা সরকারের জনসংযোগ বিভাগ প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, গাজায় বিগত পৌনে দুই বছর ধরে চলা আগ্রাসনের সময় ইসরায়েল অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার টন বিস্ফোরক ফেলেছে, যার ফলে ফিলিস্তিনি অঞ্চলটির ৮৮ শতাংশই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। আর এতে গাজার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬২ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের ৬৫০তম দিন উপলক্ষে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল গাজায় ১ লাখ ২৫ হাজার টন বোমা ফেলেছে এবং এর ফলে ক্ষতির পরিমাণ ৬২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই নির্মম যুদ্ধের ফলে ‘২০ লাখের বেশি সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়া হয়েছে’ এবং উপত্যকার ৩৬০ বর্গকিলোমিটারের ৭৭ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করেছে ইসরায়েল।
এখনো প্রায় ৯ হাজার ৫০০ জন ফিলিস্তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে এবং তাদের ভাগ্য অজানা। এ ছাড়া, ইসরায়েলি বাহিনী ১ হাজার ৫৯০ জন চিকিৎসাকর্মী, ২২৮ জন সাংবাদিক এবং ৭৭৭ জন মানবিক সহায়তা কর্মীকে হত্যা করেছে বলে এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া, গাজায় ২ হাজার ৬১৩টি ফিলিস্তিনি পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অর্থাৎ, এসব পরিবারের আর কোনো সদস্য জীবিত নেই। অন্তত ৬৮ জন শিশু অপুষ্টিতে এবং আরও ১৭ জন শীতে মারা গেছে বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে। এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৩৯ হাজার মানুষ আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ৭০০ জনের শরীরের কোনো না কোনো অঙ্গ কেটে ফেলতে হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, ৪৪ হাজার ৫০০ শিশু অন্তত একজন অভিভাবক হারিয়েছে। বাস্তুচ্যুতদের এলাকায় ২০ লাখের বেশি মানুষ সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়েছে অন্তত ৭১ হাজার জন।
জনসংযোগ বিভাগের অভিযোগ, ইসরায়েলি বাহিনী এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৪২০টি মৃতদেহ কবর থেকে তুলে নিয়ে গেছে এবং হাসপাতালের ভেতরে সাতটি গণকবর তৈরি করেছে। এ ছাড়া, গাজা থেকে ৬ হাজার ৬৩৩ জন সাধারণ মানুষকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩৬২ জন চিকিৎসাকর্মী, ৪৮ জন সাংবাদিক ও ২৬ জন সিভিল ডিফেন্স সদস্য।
ইসরায়েলি বাহিনী গাজার ৩৮টি হাসপাতাল ও ৯৬টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস করেছে। তারা ১৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং ১৫৬টি স্কুল পুরোপুরি এবং আরও ৩৮২টি আংশিকভাবে ধ্বংস করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় ৮৩৩টি মসজিদ, তিনটি গির্জা এবং ৪০টি কবরস্থানও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার লক্ষ্য হয়েছে।
মোট ২ লাখ ৮৮ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় ২ লাখ ২৩ হাজার বসতবাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং আরও ১ লাখ ৩০ হাজার বসতবাড়ি বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। ২৬১টি আশ্রয়কেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে।
এ ছাড়া, ইসরায়েল গত ১৩৯ দিনের বেশি সময় ধরে হাজার হাজার ত্রাণবাহী ট্রাকের প্রবেশ ঠেকিয়ে রেখেছে। গাজার কৃষি খাতও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৯২ শতাংশ আবাদযোগ্য জমি ধ্বংস করে ফেলার কারণে এ খাতের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে পানি, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাও ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে।
সুলতানা দিনা/