বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় বেশি। দুই বছরে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে স্বর্ণের দাম বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে বেশি বাড়ার কারণ হলো সরকারের নীতিগত দুর্বলতা, টাকার অবমূল্যায়ন ও ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের কারণে স্বর্ণ নিরাপদ বিনিয়োগ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক বছরে দাম কমবে না বরং বাড়ার সম্ভাবনা বেশি।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, গত সপ্তাহে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম প্রথমবারের মতো প্রতি ট্রয় আউন্স (৩১ দশমিক ১০ গ্রাম) ‘৪ হাজার ২০০ ডলার’ ছুঁয়েছে। তিন বছর আগে, ২০২২ সালের শুরুতে দাম ছিল ‘২ হাজার ডলারের নিচে’। ২০২৩ থেকে স্বর্ণের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও দাম বাড়ছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) জানিয়েছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ‘লাখের ঘরে’ পৌঁছায়। দুই বছরে দাম বেড়ে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে ‘ভরি প্রতি ২ লাখ ১৬ হাজার ৩৩৩ টাকা’ হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে স্বর্ণের দাম ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক মন্দার সময় স্বর্ণের দামে প্রভাব পড়ে। করোনার পর থেকে বৈশ্বিক যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে দাম কমেনি। তবে আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম বেশি হওয়ার পেছনে রয়েছে সরকারের নীতিগত দুর্বলতা, টাকার মানের পতন ও ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা।
দাম বাড়লেও স্বর্ণের চাহিদা কমেনি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সংকটের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বড় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ কেনা ও সংরক্ষণ বাড়ান। যেটা বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট করে। তবে এতে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের স্বর্ণ কেনার ক্ষমতা ও প্রবণতা কমে যাচ্ছে।
স্বর্ণের দাম কেন বাড়ছে?
স্বর্ণের চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন সীমিত। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল জানায়, ২০২৩ সালে বিশ্বে স্বর্ণের সরবরাহ ছিল ‘৪ হাজার ৯৭৫ টন’। যেটা গত বছর ছিল ‘৪ হাজার ৯৪৬ টন’। তবে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বড় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছেন। ২০২২ সালের শেষ থেকে তারা প্রতিবছর এক হাজার টনেরও বেশি স্বর্ণ কিনছেন, যেখানে ২০১০-২১ সালে গড় ছিল মাত্র ‘৪৮১ টন’।
গত বছর শীর্ষ ক্রেতাদের মধ্যে ছিল পোল্যান্ড, তুরস্ক, ভারত, আজারবাইজান ও চীন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, স্বর্ণ একটি গ্রহণযোগ্য ও বাস্তব সম্পদ হওয়ায় যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দাসহ নানা বৈশ্বিক পরিস্থিতি সরাসরি এর বাজারকে প্রভাবিত করে। করোনা মহামারির পর বিশ্ব অর্থনীতির মন্দায় স্বর্ণ নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে উঠেছে। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেনসহ অন্যান্য যুদ্ধের কারণে স্বর্ণে বিনিয়োগ বেড়েছে।
২০০৮-০৯ সালে আরেকবার স্বর্ণের দাম ব্যাপক বেড়েছিল। ২০১১ সালে বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দাম ‘আউন্সপ্রতি ১ হাজার ৯১৭ ডলার’ ছুঁয়েছিল, বাংলাদেশে ছিল ‘প্রতি ভরি ৪৮ হাজার টাকা’। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ ও বাণিজ্যযুদ্ধে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এর সঙ্গে ডলারের মান কমাও বড় কারণ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগে কেন্দ্রীয় সব ব্যাংক রিজার্ভে ডলারের ওপর বেশি নির্ভর করলেও এখন ঝুঁকি বুঝে স্বর্ণ সংরক্ষণ বাড়াচ্ছে।
সিপিডির ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গ্লোবাল ইকোনমিতে অস্থিরতা বাড়ায় অনেক দেশ ও বিনিয়োগকারী ডলারের বদলে ধরাচ্ছেন ট্যানজিবল অ্যাসেট, ফলে স্বর্ণের ওপর চাপ বাড়ছে।’
বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের দামে পার্থক্য
বিশ্বের প্রতিটি দেশে স্বর্ণের দাম ভিন্ন হয়। কারণ শুল্ক ও আমদানির খরচ দাম নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। অনেক দেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আমদানি ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষায় স্বর্ণ আমদানিকে উৎসাহ দেয় না। তবে আপৎকালীন সম্পদ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ রিজার্ভ করে।
বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালে স্বর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করে কিছু প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয়। কিন্তু তেমন ফল মেলেনি। ব্যাগেজ বিধিমালা অনুযায়ী, একজন যাত্রী বছরে সর্বোচ্চ ১০০ গ্রাম স্বর্ণের গয়না বিনা শুল্কে আনতে পারেন। এ ছাড়া বছরে একবার ১১৭ গ্রাম স্বর্ণের একটি বার আনতে পারবেন। তবে প্রতি ভরিতে ৫ হাজার টাকা শুল্ক দিতে হবে।
এক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ রিজার্ভ এবং মুদ্রার শক্তিও স্বর্ণের দামে প্রভাব ফেলে।
ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, বাহরাইন, কুয়েত, মালয়েশিয়া, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, দুবাই, আমেরিকা ও পেরুতে স্বর্ণ সস্তায় পাওয়া যায়। বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম আশপাশের দেশগুলো যেমন ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের তুলনায় বেশি বলে অভিযোগ আছে। তবে ব্যবসায়ীরা এটা পুরোপুরি সত্য মনে করেন না।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের ১৫ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দাম ‘১৩৪ দশমিক ৯৬ মার্কিন ডলার’ বা ‘১৬ হাজার ৪২৫ টাকা’। একই সময়ে, ভারতে দাম ‘১৩৪ দশমিক ৭০ ডলার’, পাকিস্তানে ‘১৩৬ দশমিক ৯৪ ডলার’, নেপালে ‘১২৫ দশমিক ০৫ ডলার’, মালয়েশিয়ায় ‘১৩১ দশমিক ১৪ ডলার’, সৌদি আরবে ‘১২৬ দশমিক ৯১ ডলার’, কাতারে ‘১২৭ দশমিক ৯৭ ডলার’।
অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে দাম বেশি। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি গ্রাম দাম ‘১৫২ দশমিক ৩৯ ডলার’ বা ‘১৮ হাজার ৫৪৭ টাকা’।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানির সুযোগ সীমিত, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রভাবেই দাম নির্ধারিত হয়।
বাজুসের সহসভাপতি মাসুদুর রহমান বলেন, ‘সরকার বা সেন্ট্রাল ব্যাংক যদি স্বর্ণ সরবরাহ করত, বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকত। আমাদের দেশে রিসাইকেল্ড গোল্ডই বেশি চলে, এ জন্য দাম একটু বেশি হয়।’ তারা আরও বলেন, লাগেজের আওতায় এক ভরি স্বর্ণ আনলে শুল্ক কম দিতে হয়। কিন্তু বৈধ আমদানিতে অনেক বেশি শুল্ক এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকে।
স্বর্ণের দাম কি কমতে পারে?
বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণে বিনিয়োগ কতটা নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। বাজারের ধারাবাহিক অস্থিরতার কারণে সঠিক পর্যালোচনা দেওয়া কঠিন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি, যুদ্ধ পরিস্থিতিসহ নানা বিষয় স্বর্ণের বাজারকে প্রভাবিত করে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে নিশ্চিত কিছু বলা কঠিন। তবে অতীত অভিজ্ঞতা ও বাজারের ধারা দেখে ব্যবসায়ীরা মনে করেন, আগামী কয়েক বছরে স্বর্ণের দাম কমার সম্ভাবনা নেই। বরং বাড়ার প্রবণতা আছে।
বাজুসের সহসভাপতি মাসুদুর রহমান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত, ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ এবং ডলারের অবমূল্যায়নের কারণে স্বর্ণের দাম দ্রুত কমছে না। জিও-পলিটিক্যাল টেনশন না কমলে এবং যুদ্ধ চলতে থাকলে স্বর্ণের দাম কমার সম্ভাবনা খুব কম।’
যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস বলেছে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ‘৪ হাজার ৯০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা এখন ৪ হাজার ২০০ ডলারের আশপাশে।’
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘স্বর্ণের দাম অনিশ্চয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ব্যাংকিং সুদের হারের ওপরও নির্ভর করে। আগে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রিজার্ভ হিসেবে ডলারকে গুরুত্ব দিত, এখন স্বর্ণের পরিমাণ বাড়ছে।’ স্বর্ণের দাম আরও বাড়বে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাজার খুবই অস্থির। ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্ত এবং ডলারের সুদের হারের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে।’ বাংলাদেশে স্বর্ণের বাড়তি দাম নিয়ে তিনি বলেন, ‘যেসব দেশে স্বর্ণ উৎপাদন ও সরকারি আমদানির সুযোগ বেশি, সেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দাম মিলবে না। ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ ও বাজারের অস্বচ্ছতা পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ করে, যা স্বর্ণ চোরাচালানের সুযোগ বাড়ায়।’ সূত্র: বিবিসি