উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। আশির দশকে পিয়ংইয়ংয়ে ১৩ জন জাপানি নাগরিক অপহরণ ঘিরে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে কথা বলতে তিনি এই সাক্ষাৎ করতে চান বলে জানান।গত ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনও জাপানি নেতা এই পদক্ষেপ নেন নাই।
সোমবার (৩ নভেম্বর) জাপানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কয়েক দশক আগে উত্তর কোরিয়া কর্তৃক অপহৃত জাপানি নাগরিকদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে আমরা ইতোমধ্যেই উত্তর কোরিয়াকে একটি শীর্ষ বৈঠক করার ইচ্ছা জানিয়েছি।”
প্রসঙ্গত, ২০০২ সালে উত্তর কোরিয়া প্রথমবারের মতো পিয়ংইয়ংয়ের এজেন্টরা ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে ১৩ জন জাপানি নাগরিককে অপহরণ করেছিল বলে স্বীকার করে। এর আগে বহু বছর ধরে তারা এ কথা অস্বীকার করেছে।
জাপান দাবি করে, ১৯৭০ এবং ১৯৮০ এর দশকের শেষের দিকে উত্তর কোরিয়ার এজেন্টরা তাদের কমপক্ষে ১৭ জন নাগরিককে অপহরণ করেছিল । এমনকি ২০০২ সালে পাঁচজন নাগরিককে ফিরিয়েও দেওয়া হয়েছিল।
২০১৪ সালের জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, অপহরণগুলো উত্তর কোরিয়ার গুপ্তচরবৃত্তি কর্মসূচির অংশ বলে মনে করা হয়। এসব নাগরিককে পিয়ংইয়ংয়ের গুপ্তচরদের জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি শেখানোর কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।
সে সময় অন্তত ১৭ জন জাপানি নাগরিককে উত্তর কোরিয়া অপহরণ করেছে বলে জাপানের ধারণা। তবে অনেকে বলেছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
টোকিওতে এই ইস্যু নিয়ে আয়োজিত এক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে তাকাইচি জানান, জাপান ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে নতুন ও ফলপ্রসূ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আমি কিম জং উনের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি বৈঠকের বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এদিকে, তাকাইচির এই প্রস্তাবে পিয়ংইয়ং এখনও প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
আরেকদিকে, পিয়ংইয়ং মোট নিহতের সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে এবং জানায়, কিছুঞ্জাপানি নাগরিক ট্র্যাফিক এবং ডুবে যাওয়া দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। কেউ কেউ আত্মহত্যাও করেছে এবং তারা বিষয়টি শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করে।
কিন্তু জাপানি অপহৃতদের পরিবার যারা এখনও নিখোঁজ, যাদের মধ্যে কেউ কেউ যখন অপহৃত হয়েছিল তখন কিশোর ছিল, তাদের জন্য কোনও সমাধান বা ত্রাণ আসেনি। তারা, বছরের পর বছর ধরে জাপানের নেতাদের দরজার গিয়ে ঘুরেছে কিন্তু কোন সমাধান পাননি।
এদিকে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তাকাইচি দুবার অপহৃতদের পরিবারের সাথে দেখা করেছেন। যার মধ্যে একবার এই পরিবারগুলো জাপান সফরের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও দেখা করেছেন। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম মেয়াদের সময় আর কয়েকজন অপহৃতদের পরিবারকে ট্রাম্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
২০০২ সালে দুই দেশ এক অভূতপূর্ব শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেয়। জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো কোইজুমি উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ং সফরে গিয়ে বর্তমান নেতা কিম জং উনের বাবা কিম জং ইলের সঙ্গে দেখা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই সফরটি ছিল প্রথমবারের মতো কোনও জাপানি প্রধানমন্ত্রীর উত্তর কোরিয়া সফর।
জাপানের একাধিক নেতা এর আগেও কিম জং উনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের চেষ্টা করেছেন। তবে তাদের কেউই সফল হননি।
সেই সফরেই পাঁচজন ভুক্তভোগীর প্রত্যাবর্তন নিয়ে আলোচনা করেন। তখন উত্তর কোরিয়া দাবি করেছিল, অপহৃত আটজন ইতোমধ্যে মারা গেছেন। তাকাইচির পূর্বসূরি শিগেরু ইশিবা এই ইস্যুর সমাধানে টোকিও ও পিয়ংইয়ংয়ে লিয়াজোঁ অফিস স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তার এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি।
সমুদ্র দিয়ে বিভক্ত দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এই সমস্যাটি অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি, যাদের অতীতের উপনিবেশবাদ এবং সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পূর্ববর্তী প্রচেষ্টাগুলোকে বারবার ব্যর্থ করে দিয়েছে।
সুলতানা দিনা/