ভারতের দিল্লির লালকেল্লার কাছে আত্মঘাতী বোমা হামলার ৩ দিন আগে আত্মগোপনে চলে যান মূল সন্দেহভাজন ডা. উমর। এসময় নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখেন ডা. উমর নবি। ফলে শত চেষ্টা করেও পরিবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।
এর তিন দিন পরই বোমা চালানো হয়। এরপর পুলিশ ডা. আদিল ও ডা. মুজাম্মিলকে গ্রেপ্তারের পরপরই উমর জানতে পারেন মূল সন্দেহভাজন হিসেবে এখন তাকে খোঁজা হচ্ছে। ওই দুই চিকিৎসকের জিজ্ঞাসাবাদের পরই হরিয়ানার ফরিদাবাদ থেকে ২ হাজার ৯০০ কেজি বিস্ফোরক পদার্থ উদ্ধার হয়, যার মধ্যে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটও রয়েছে।
তারপর গত পাঁচ দিনে ভারতের হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট এবং জম্মু ও কাশ্মীরে পরিচালিত যৌথ ধারাবাহিক অভিযানে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো একটি বড় হোয়াইট-কলার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সন্ধান পায়। এসব অভিযানে মোট চারজন ডাক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অভিযান থেকে মোট ৫ হাজার ৮১৩ কিলোগ্রামেরও বেশি বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন রকম অস্ত্র, অ্যাসল্ট রাইফেল, পিস্তল, টাইমার, ব্যাটারি এবং আইইডি তৈরির উপকরণ উদ্ধার করা হয়েছে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলো জানায়, এই নেটওয়ার্কটি ভারতে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করছিল। তাদের দাবি, নেটওয়ার্কটি পাকিস্তান এবং অন্যান্য দেশে অবস্থিত বিদেশী হ্যান্ডলারদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। তাদের নেটওয়ার্কের সঙ্গে ইসলামিক স্টেট খোরাসান (আইএসআইএস-কে), জইশ-ই-মোহাম্মদ এবং আনসার গাজওয়াত-উল-হিন্দ (এজিইউএইচ) এর সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
তদন্তে জানা গেছে, বেশ কয়েকজন ডাক্তারকে নিয়ে গঠিত উচ্চশিক্ষিত প্রথম শ্রেণির পেশাজীবীদের এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক জৈশ-ই-মোহাম্মদ, আনসার গাজওয়াত-উল-হিন্দ (এজিইউএইচ) এবং আইসিসের হয়ে কাজ করছিল।
গত কয়েক দিনে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা একাধিক স্থানে অভিযান চালিয়ে এমন এক ভয়াবহ এক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে, যারা আদর্শগতভাবে চরমপন্থা দ্বারা প্রভাবিত।
এক অভিযানে হরিয়ানার ফরিদাবাদে কাশ্মীরের এক চিকিৎসকের ভাড়া নেওয়া দুই বাসা থেকে ২ হাজার ৯০০ কেজির বেশি (প্রায় ৩ টন) বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করা হয়। এই দুই বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামার বাসিন্দা চিকিৎসক মুজাম্মিল শাকিল। তিনি ভারতে প্রথম শ্রেণির পেশাজীবীদের জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত করতেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার কয়াল গ্রামের মানুষ জানতে পেরেছে, ৩৩ বছর বয়সী চিকিৎসক উমরই সন্দেহভাজন আত্মঘাতী হামলাকারী।
এর পর থেকেই স্তব্ধ হয়ে আছেন ডা. নবির পরিবারের সদস্যরা। তার ভাবি মুজাম্মিল বলেন, ‘শুক্রবার নবি আমাদের ফোন করে বলেছিল, পরীক্ষার কাজে ব্যস্ত আছে, তিন দিনের মধ্যেই বাড়ি ফিরবে। আমরা তাকে পড়াশোনা করাতে অনেক কষ্ট করেছি। সে কোনো দিন রাজনীতি বা সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত ছিল না। এটা বিশ্বাস করা অসম্ভব।’
দিল্লির বোমা হামলায় ১২ জন নিহত ও প্রায় দুই ডজন মানুষ আহত হওয়ার পর জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ চিরুনি অভিযানে নামে।
কয়াল গ্রামে ডা. নবির বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ তার মা ও দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করেছে। সূত্র জানিয়েছে, আত্মঘাতী হামলাকারীর ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্য উমরের মায়ের ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছে। আজ তার বাবাকেও পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্দেশ্যে। মানসিক অবস্থার কারণে গতকাল তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
আলফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডা. নবির সহকর্মী ও বন্ধু ডা. সাজাদ বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে আছেন। পুলিশ তাকে কেবল উমরের বিষয়ে জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করছে নাকি তিনিও বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে অভিযুক্ত, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
এ ছাড়া কয়েল থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের সাম্বুরা গ্রামে পুলিশ আমির ও উমর রশিদ নামে দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করেছে। পেশায় প্লাম্বার (নলমিস্ত্রি) আমিরকে এ ঘটনার মূল হোতা বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ, তার একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তাকে একটি গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে, যা এই হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
আমিরের পরিবার বলছে, সে কখনো জম্মু-কাশ্মীরের বাইরে যায়নি, তাই ফরিদাবাদের কোনো গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
পরিবার জানায়, সোমবার রাত ১০টা ৩০ মিনিটে পুলিশ তাদের বাড়িতে অভিযান চালায় এবং তৎক্ষণাৎ আমির ও উমরকে আটক করে। এখন পর্যন্ত পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি, তারা আসলেই কোনো সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিল কি না।
জানা গেছে, অক্টোবর ১৯ তারিখে শ্রীনগরের নওগামে জইশ-ই-মোহাম্মদের পোস্টার পাওয়ার পর থেকেই পুলিশ এই মামলা নিয়ে কাজ শুরু করে। স্থানীয় থানার সূক্ষ্ম তদন্তে এক বৃহৎ ষড়যন্ত্রের চিত্র সামনে আসে, যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন ডা. আদিল।
তাকে গত সপ্তাহে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার কাছ থেকে জিজ্ঞাসাবাদে আনন্তনাগের এক হাসপাতালের আলমারি থেকে একটি অ্যাসল্ট রাইফেল উদ্ধার হয়। তার পর জিজ্ঞাসাবাদেই আরেক চিকিৎসক, আলফালাহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ডা. মুজাম্মিল আহমদকে গ্রেপ্তার করা হয়। মুজাম্মিলের জবানবন্দির পরই পুলিশ বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকের হদিস পায়।
কর্তৃপক্ষ জানায়, লালকেল্লা বিস্ফোরণে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, ফুয়েল অয়েল ও ডেটোনেটর ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে, যা ফরিদাবাদে ২ হাজার ৯০০ কেজি বিস্ফোরক ও দাহ্য পদার্থ উদ্ধারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে তদন্তভার জাতীয় তদন্ত সংস্থার (এনআইএ) হাতে তুলে দিয়েছে।
সুলতানা দিনা/