পৃথিবীর ইতিহাসে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং দেশ-জাতির প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন এমন বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধান আছেন।
তাদের মধ্যে বোধকরি, সবার আগে রোমানিয়ার সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব দেওয়া নিকোলাই চসেসকুর নাম আসবে। চলুন দেখে নেয়া যাক নির্মম বিচারের মুখোমুখি হওয়া এই রাষ্ট্রপ্রধানের পরিণতি।
নিকোলাই চসেসকুর অধ্যায় শুরু হয় ১৯৬৫ সালে। এসময় পশ্চিমাদের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের শীতল যুদ্ধ একেবারে তুঙ্গে। রোমানিয়াসহ পূর্ব ইউরোপ তখন বলা চলে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতের পুতুল। ঠিক এমন সময় রোমানিয়ার এই রাষ্ট্রনেতা রুখে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, তার দেশে মস্কোর ছড়ি ঘোরানো আর চলবে না।
ক্ষমতা গ্রহণের পর, চসেসকু ১৯৬৮ সালের ২১শে আগস্ট তার ভাষণে প্রেস সেন্সরশিপ শিথিল করেন এবং চেকোস্লোভাকিয়ার উপর ওয়ারশ চুক্তির আক্রমণের নিন্দা করেন, যার ফলে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।
দেশের মানুষ তো বটেই পশ্চিমাদের সমর্থন পেয়ে কমিউনিস্ট হয়েও ধীরে ধীরে হাটতে শুরু করেন সংস্কারের পথে। কিন্তু ক্ষমতা পেয়ে সেই নায়ক সবাইকে চমকে দিয়ে ভয়ঙ্কর এক বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। প্রায় ১৫ বছরের (১৯৬৫ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত) ইতিহাসের অন্যতম বিভীষিকাময় স্বৈরশাসক হয়ে ওঠেন তিনি।
তার শাসন শীঘ্রই সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে এবং পূর্ব ব্লকের সবচেয়ে দমনমূলকদের মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। তার গোপন পুলিশ-সিকিউরিটেট, দেশের অভ্যন্তরে গণ নজরদারির পাশাপাশি তীব্র দমন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব সীমা পার করে ফেলে।
জানা যায়, জনসংখ্যার প্রতি ৪৩ জনের জন্য তার একজন এজেন্ট বা ইনফর্মার (সিকিউরিটেট) ছিলেন। তারা শুধু নাগরিকদের ফোন, চিঠি বা কথোপকথনই নজরদারি করত না, পরিবারের সদস্যদের ওপরও নজর রাখত। ডাক্তাররা রোগীদের গোপনে রেকর্ড করতে বাধ্য হন, শিশুরা স্কুলে কী বলছে তা রিপোর্ট করা হতো। এর ফলে দেশজুড়ে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়।
পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে রাখতে তারা মিডিয়া এবং প্রেসকে নিয়ন্ত্রণ করত। তার জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত নীতি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা অবৈধ গর্ভপাতের সংখ্যা বাড়িয়ে তোলে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এতিমের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
১৯৭০ সালে ব্যর্থ তেল উদ্যোগের কারণে সৃষ্টি হওয়া অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার ফলে রোমানিয়া বিদেশী ঋণের সৃষ্টি সামাল দিতে বিপাকে পড়ে।
১৯৮২ সালে চাউসেস্কু সরকারকে এই ঋণ পরিশোধের জন্য দেশের কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের বেশিরভাগ রপ্তানি করার নির্দেশ দেন। যার ফলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তার বৈদেশিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে, এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গেও ।
১৯৭১ সালে উত্তর কোরিয়া এবং চীন সফরে গিয়ে কিম ইল সুং ও মাও সেতুং-এর শাসনধারা দেখে তিনি প্রভাবিত হন। এরপর রোমানিয়ায়ও একই ধরনের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ চালু করেন। দেশজুড়ে নিজের এবং স্ত্রী এলেনার ব্যক্তিপূজা শুরু হয়। স্কুলের বই থেকে শুরু করে শহরের বিশাল মূর্তি পর্যন্ত সব জায়গায় তাদের পাওয়া যেতো।
১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর, টিমিসোয়ারা শহরে এক পাদ্রী লাস্লো টোকেশ ধর্মীয় স্বাধীনতার দাবি তোলেন। তাকে গ্রেপ্তার করাকে কেন্দ্রকরে জনতা ক্ষুব্ধ হয়।
১৫ ডিসেম্বর উত্তাল শহরগুলোতে বিক্ষুব্ধ নাগরিকদের ওপর পুলিশের নিপীড়ন শুরু হয়। আর তাতেই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, সাধারণ মানুষ কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ শুরু করে। সেনারা গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়, কিন্তু বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী বুখারেস্টেও।
২১ ডিসেম্বর চসেসকু পরিস্থিতি সামলাতে বিশাল জনসভা ডাকেন। কিন্তু বক্তব্য শুরু হতেই জনতা তার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে শুরু করে। রাষ্ট্র টিভি হঠাৎ সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়।
এরপর ২২ ডিসেম্বর, আরও বড় ঢলে বুখারেস্টের রাজপথ পূর্ণ হয়। সেনারা জনগণের পাশে দাঁড়ায়। চচেস্কু বাসভবনে অবস্থান করলে জনতা ইট-পাটকেল ছুঁড়ে প্রতিবাদ জানায়।
অবশেষে তিনি এবং স্ত্রী এলেনাকে নিয়ে হেলিকপ্টারে পালাতে গিয়ে ধরা পড়েন।
২৫ ডিসেম্বর চসেসকু এবং এলেনাকে বুখারেস্টের এক সামরিক ঘাঁটিতে নেয়া হয়। সেখানে তড়িঘড়ি সামরিক আদালত বসানো হয়। তিনটি অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে: গণহত্যা, অর্থনীতি ধ্বংসের ষড়যন্ত্র, ও রাষ্ট্রের সম্পদ অপচয়।
চসেসকু -এলেনা বিচারকদের ভর্ৎসনা করে দাবি করেন, সব বিদেশি চক্রান্ত, তারা এখনও রোমানিয়ার বৈধ শাসক। তবে তাতে কেউ কান দেয়নি।
মাত্র দুই ঘণ্টায় বিচারকাজ শেষ করে দুজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন সেনা সদস্য সেই রায় কার্যকরও করে ফেলেন। কথা ছিলো হত্যার দৃশ্য সরাসরি টিভিতে সম্প্রচার হবে। কিন্তু উত্তেজনায় ক্যামেরার জন্য অপেক্ষা না করেই গুলি চালিয়ে দেয় সেনারা।
জানা যায়, দুজনের শরীরে ১২০টি গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। তাদের গুলিবিদ্ধ লাশের দৃশ্য ফলাও করে প্রচার হয় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে। যার মধ্য দিয়ে রোমানিয়ায় চার দশকের কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটে।
সুলতানা দিনা/