মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইন সংক্রান্ত সরকারি নথি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া একটি বিলে স্বাক্ষর করেছেন। দীর্ঘ কয়েক মাসের আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর এই ঘটনাকে একটি বড় মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বিল পাসের ফলে মার্কিন বিচার বিভাগের (ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস) হাতে এখন ৩০ দিন সময় রয়েছে এপস্টাইনের বিরুদ্ধে ফেডারেল তদন্তের যাবতীয় তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করার। তবে, চলমান কোনো অপরাধ তদন্ত বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হতে পারে—এমন সংবেদনশীল নথি তারা আটকে রাখতে পারবে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প অনেকটা নাটকীয়ভাবেই এই বিলের বিরোধিতা থেকে সরে আসেন। জেফরি এপস্টাইনের ভুক্তভোগী এবং নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্যদের চাপের মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত এই পদক্ষেপে সম্মতি দেন। তার সমর্থনের পর কংগ্রেসের উভয় কক্ষে বিপুল ভোটে বিলটি পাস হয়। অথচ কিছুদিন আগেও ট্রাম্প এই নথি প্রকাশের প্রয়োজনীয়তাকে ডেমোক্র্যাটদের সাজানো নাটক বা দৃষ্টি সরানোর কৌশল হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিলে সই করার পর তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন যে, তিনি এই বিলে স্বাক্ষর করেছেন এবং হয়তো এবার ডেমোক্র্যাটদের আসল সত্য এবং এপস্টাইনের সঙ্গে তাদের গোপন সম্পর্ক বেরিয়ে আসবে।
যদিও ট্রাম্প চাইলে নিজেই নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই নথি প্রকাশ করতে পারতেন, তবুও এটি আইনপ্রণেতাদের মাধ্যমে পাস হয়ে তার কাছে আসে। প্রতিনিধি পরিষদে ৪২৭-১ ভোটে এবং সিনেটে সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি পাস হয়। প্রতিনিধি পরিষদে একমাত্র লুইজিয়ানার রিপাবলিকান ক্লে হিগিন্স এর বিরোধিতা করেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, এর ফলে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের নাম প্রকাশ হয়ে যেতে পারে, যারা কেবল তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন কিন্তু কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন।
নতুন এই আইনের অধীনে অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে নথিগুলো প্রকাশ করতে হবে। প্রকাশিতব্য ফাইলগুলোর মধ্যে এপস্টাইনের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক তদন্তের নথি, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের জবানবন্দি, অভিযানের সময় জব্দ করা সামগ্রী, বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ, ফ্লাইট লগ এবং এপস্টাইনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য থাকবে। তবে বিলের অন্যতম কারিগর রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, নতুন করে তদন্ত শুরুর বাহানায় কিছু ফাইল হয়তো আটকে রাখা হতে পারে। যদিও পাম বন্ডি জানিয়েছেন, বিচার বিভাগ সততা ও গুরুত্বের সঙ্গেই বিষয়টি দেখবে এবং তদন্ত চালিয়ে যাবে।
ট্রাম্প তার ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় এই ফাইলগুলো প্রকাশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। রিপাবলিকান প্রতিনিধি মার্জরি টেইলর গ্রিন, যিনি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক, তিনিও এই বিলের জন্য জোর দাবি জানিয়েছিলেন। বিল পাসের পর গ্রিন ঘোষণা দিয়েছেন যে, প্রকাশিত ফাইলে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম থাকলে তিনি তা হাউজ ফ্লোরে দাঁড়িয়ে পড়ে শোনাবেন।
এদিকে গত সপ্তাহে এপস্টাইনের এস্টেট থেকে কংগ্রেসের মাধ্যমে ২০ হাজারেরও বেশি পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করা হয়, যা এই নতুন ফাইলগুলো থেকে আলাদা। সেখানে দেখা যায়, ২০১৮ সালের কিছু বার্তায় এপস্টাইন ট্রাম্প সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে ট্রাম্পের অনেক গোপন তথ্য তার জানা। তবে ট্রাম্প বরাবরই এপস্টাইনের সঙ্গে কোনো অবৈধ সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন যে বহু আগেই তাদের বন্ধুত্ব শেষ হয়ে গিয়েছিল। ট্রাম্পের মতে, এপস্টাইন মূলত ডেমোক্র্যাটদেরই বন্ধু ছিলেন।
ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফরের পরিবার ট্রাম্পের এই স্বাক্ষরকে ‘স্মরণীয়’ ঘটনা বলে উল্লেখ করেছে। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, ক্ষমতা বা দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিটি অপরাধীর নাম প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই চলবে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে যৌন পাচারের দায়ে অভিযুক্ত জেফরি এপস্টাইন জেলখানায় আত্মহত্যা করেন। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স অ্যান্ড্রু, ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন এবং হার্ভার্ডের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ল্যারি সামার্সের মতো বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে। ল্যারি সামার্সের সঙ্গে এপস্টাইনের ইমেইল চালাচালির খবর প্রকাশের পর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত শুরু করায় সামার্স সম্প্রতি শিক্ষকতা থেকে ছুটিতে গিয়েছেন।
জেফরি এপস্টাইনের ‘গোপন নথি’ বা Epstein Files বলতে মূলত হাজার হাজার পৃষ্ঠার আইনি দলিল, তদন্তের রিপোর্ট, এবং ব্যক্তিগত নথিকে বোঝায়, যা কুখ্যাত মার্কিন ধনকুবের এবং যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের বিরুদ্ধে চলা তদন্ত ও মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সহজ কথায়, এই নথিগুলোতে এপস্টাইনের তৈরি করা যৌন পাচার চক্র (sex trafficking ring) এবং বিশ্বের অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/