ইসরায়েলি সরকারি নথির বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থানের অংশবিশেষ দখলের পরিকল্পনা করছে। এদিকে, ফিলিস্তিনি ভূমি চুরির সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে বসতি স্থাপনকারীরা রাতারাতি সেখানে একটি নতুন ফাঁড়ি স্থাপন করেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবারের এই ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল যখন ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দায়মুক্তি নিয়ে এবং প্রায়শই সামরিক বাহিনীর সমর্থনে চলমান লাগামহীন বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা দমনে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে।
ইসরায়েলের সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি প্রধান রোমান যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, সেবাস্তিয়ার বিশাল এলাকা অধিগ্রহণের অভিপ্রায় ঘোষণা করেছে।
বসতি স্থাপন বিরোধী নজরদারি সংস্থা ‘পিস নাও’ জানিয়েছে, এই স্থানটি প্রায় ১৮০ হেক্টর বা ৪৫০ একর জুড়ে বিস্তৃত। এটি হবে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভূমিতে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় দখলদারত্ব।
সংস্থাটির মতে, ১২ নভেম্বর প্রকাশিত ইসরায়েলি আদেশে সেবাস্তিয়া এলাকায় তারা যেসব জমির খণ্ড দখল করতে চায় তার তালিকা দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলের হারেৎজ পত্রিকা রিপোর্ট করেছে যে, সেবাস্তিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি বিকাশের লক্ষ্যে অধিকৃত অঞ্চলের উত্তরে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি বাজেয়াপ্ত করাই এর উদ্দেশ্য। পত্রিকাটি আরও জানায়, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর জন্য ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের মাত্র ১৪ দিন সময় দেওয়া হয়েছিল।
ধারণা করা হয়, প্রাচীন সামারিয়া রাজ্যের রাজধানী সেবাস্তিয়ার ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে আছে। খ্রিস্টান এবং মুসলমানরা বিশ্বাস করেন যে এখানেই জন দ্য ব্যাপ্টিস্টকে সমাহিত করা হয়েছিল।
ইসরায়েল ২০২৩ সালে এই স্থানটিকে একটি পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। ইতোমধ্যেই খনন কাজ শুরু হয়েছে এবং ‘পিস নাও’ ও অন্য একটি মানবাধিকার সংস্থার মতে, সরকার এই স্থানটির উন্নয়নে ৩ কোটি শেকেলের (৯.২৪ মিলিয়ন ডলার) বেশি বরাদ্দ করেছে।
‘পিস নাও’ জানিয়েছে, এর আগে ইসরায়েল কর্তৃক দখলকৃত ঐতিহাসিক জমির বৃহত্তম খণ্ডটি ছিল পশ্চিম তীরের দক্ষিণে সুসিয়া গ্রামে, যার আয়তন ছিল ৭০ একর।
বসতি স্থাপনকারীদের অবিরাম হামলা
এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হলো যখন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা বেথলেহমের কাছে একটি নতুন অবৈধ বসতি স্থাপন উদযাপন করছে। একই সঙ্গে তারা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক এবং তাদের সম্পত্তির ওপর নির্বিঘ্নে তাদের তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে।
আজ শুক্রবারও বসতি স্থাপনকারীরা পুরো অঞ্চল জুড়ে ধারাবাহিক হামলা চালায়। তারা সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ করে এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালায়। এরপর ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে উপস্থিত হয়ে উল্টো ফিলিস্তিনিদেরই গ্রেপ্তার করে।
স্থানীয় সূত্র ওয়াফা বার্তা সংস্থাকে জানিয়েছে, নাবলুসের দক্ষিণে হুওয়ারায়, নিকটবর্তী একটি অবৈধ বসতি থেকে কয়েক ডজন বসতি স্থাপনকারী শহরের উত্তরাঞ্চলে হামলা চালিয়ে একটি গাড়ির স্ক্র্যাপয়ার্ডে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এদিকে, রামাল্লার পশ্চিমে, কাফর নিমা গ্রামের কাছে বসতি স্থাপনকারীরা তাদের খামারের সামনে একটি মাটির প্রতিবন্ধক স্থাপন করেছিল। চারজন ফিলিস্তিনি সেটি সরানোর চেষ্টা করলে ইসরায়েলি সৈন্যদের উপস্থিতিতে বসতি স্থাপনকারীরা তাদের মারধর করে। পরবর্তীতে ইসরায়েলি বাহিনী ওই চার ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করে।
অন্যদিকে, ওয়াফা বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, শুক্রবার অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের কাফর আকাব এলাকায় অভিযানের সময় ইসরায়েলি বাহিনী দুই ফিলিস্তিনি কিশোরকে হত্যা করেছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কর্মীরা ১৬ এবং ১৮ বছর বয়সী দুই কিশোরকে সরাসরি গুলিতে গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসা দেয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাদের মৃত ঘোষণা করা হয়।
এদিকে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ইসরায়েল এ বছর পশ্চিম তীরের তিনটি শরণার্থী শিবির থেকে ৩২,০০০ ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক বিতাড়িত করে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করে থাকতে পারে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/