ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে গতকাল ইউরোপের বিভিন্ন শহরে গত শনিবার বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। তারা গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, এই যুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের ওপর একটি গণহত্যা। শনিবার জাতিসংঘ ঘোষিত ফিলিস্তিন সংহতি দিবস উপলক্ষে এসব বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা থামেনি। উপত্যকাজুড়ে স্থল, নৌ ও আকাশপথে ইসরায়েলের চলমান হামলায় ফিলিস্তিনি নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। গতকাল রবিবার (৩০ নভেম্বর) গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই হিসাব দিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭০ হাজার ১০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ৯০০-এর বেশি মানুষ। নিহতদের মধ্যে শিশু ও নারীসহ বহু বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন। সর্বশেষ নিহতদের মধ্যে রয়েছে দুই শিশু, যাদের বয়স ৮ ও ১০ বছর। গাজার খান ইউনুসের পূর্বে বানি সুহেইলায় ড্রোন হামলায় তারা মারা যায়।
এদিকে ফিলিস্তিনি সংহতি দিবস উপলক্ষে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। বিক্ষোভকারীরা ফিলিস্তিনি পতাকা উড়িয়ে ইসরায়েলকে গণহত্যার জন্য অভিযুক্ত করেন। একজন বিক্ষোভকারী সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা এখনো ন্যায়বিচার থেকে অনেক দূরে।’ আরেকজন বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ জানি যে এই যুদ্ধ ভুল। কিন্তু ক্ষমতাধররা কি তা অনুভব করেন না?’
ফ্রান্স প্যালেস্টাইন সলিডারিটি অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান অ্যান তুইয়াঁ বলেন, সাত সপ্তাহ পার হলেও যুদ্ধবিরতি কোনো সমাধান আনতে পারেনি। তার ভাষায়, ‘যুদ্ধবিরতি একটি ধোঁয়াশা। ইসরায়েল প্রতিদিনই তা লঙ্ঘন করছে, সাহায্য সরবরাহে বাধা দিচ্ছে এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস করছে। আমরা স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও গণহত্যার অবসান চাই।’
লন্ডন, রোম, জেনেভা ও লিসবনেও হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। লন্ডনে আয়োজকদের দাবি, প্রায় এক লাখ মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। তারা ইসরায়েলের ‘অপরাধের’ বিচার দাবি করেন এবং অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। ইতালির রাজধানী রোমে বিক্ষোভে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ এবং পরিবেশ আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, এখানে প্রায় এক লাখ মানুষের জমায়েতের আশা করা হচ্ছিল। আলবানিজ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইসরায়েল শুধু গাজায় নয়, পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে। পুরো ভূমিতে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যে অপরাধ চলছে, তা পরিষ্কারভাবে দেখুন। ইসরায়েলকে থামাতে হবে এবং আমরা তা করব।’
গাজায় হামলা অব্যাহত
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েল গাজায় হামলা অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর তারা গাজায় ‘ইয়েলো লাইন’ পর্যন্ত পিছিয়ে গেলেও এখনো অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। যুদ্ধবিরতির পর অন্তত ৫০০টি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে ৩৪৭ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ৮৮৯ জন আহত হয়েছেন।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম অফিসের পরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা জানান, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল কমপক্ষে ৫৩৫ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তার ভাষায়, ‘গাজায় মানবিক পরিস্থিতি নজিরবিহীনভাবে খারাপ হচ্ছে এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের ফলে অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।’
আন্তর্জাতিক বিরতির মধ্যেও হামলা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ছে বলে মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে আসছে।
ড্রোন হামলায় নিহত দুই ভাই- ফাদি ও জুমা তামের আবু আসির চাচা আলা আবু আসি বলেন, ‘ওরা নিরীহ বাচ্চা। ওদের কোনো রকেট বা বোমা নেই। তারা তাদের প্রতিবন্ধী বাবার জন্য জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়েছিল। আমরা গিয়ে ওদের দেহ খণ্ড খণ্ড অবস্থায় পাই।’
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘এত মানুষের হত্যা, পুরো জনগোষ্ঠীকে বারবার বাস্তুচ্যুত করা এবং সহায়তায় বাধা দেওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।’ গাজা সিটির সাংবাদিক হিন্দ খোদারি জানান, আন্তর্জাতিক সমর্থন পেলেও গাজার মানুষ প্রতিদিন শুধু বাঁচার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, অনেক মানুষ এখনো তাঁবুতে থাকেন। তাদের কাছে ওষুধ নেই। শিশুরা শিক্ষা পাচ্ছে না। যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও মানুষ ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছেন।
দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের পূর্বে বনি সুহেইলা শহরে ড্রোন হামলায় দুই ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে বলে গতকাল চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা আল-জাজিরাকে বলেন, সকালে আল-ফারাবি স্কুলের কাছে বেসামরিক মানুষের একটি দলের ওপর ড্রোন থেকে বোমা নিক্ষেপ করা হলে জুমা ও ফাদি তামার আবু আসসি নামের দুই ভাই ঘটনাস্থলেই মারা যায়।
এ ছাড়া গতকালও গাজার বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি বাহিনী স্থল, নৌ ও বিমান হামলা চালায়। খান ইউনিসের উত্তর-পূর্বে আল-কারারা শহরে বিমান হামলায় তিনজন আহত হয়েছেন। গাজার পূর্বাঞ্চলীয় তুফাহ এলাকা এবং দক্ষিণের রাফা শহরের পূর্বেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, এর আগের দিন ইয়েলো লাইনের বাইরে বনি সুহেইলায় ড্রোন হামলায় আরেক ফিলিস্তিনি নিহত হন।