রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলার প্রায় চার বছর পর ইউক্রেন এখন সামরিক ও অর্থনৈতিক খাতে টিকে থাকার মতো নগদ অর্থের ঘাটতিতে পড়েছে। ফলে রাশিয়ার ইউরোপে থাকা রাশিয়ার শত শত বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অনির্দিষ্টকালের জন্য জব্দ করে তা ইউক্রেনকে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপ।
ইউরোপের মতে, আগামী দুই বছরে ইউক্রেনের বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে যে ১৩৫.৭ বিলিয়ন ইউরো লাগবে, তার সমাধান লুকিয়ে আছে ইউরোপে জমে থাকা রাশিয়ার ‘হিমায়িত’ সম্পদে। এসব সম্পদের বড় অংশ সংরক্ষিত আছে বেলজিয়ামের ব্যাংক ইউরোক্লিয়ারে। আগামী সপ্তাহে ব্রাসেলসের সম্মেলনে ইইউ নেতারা এই পরিকল্পনায় সই করতে চান।
রাশিয়া সতর্ক করে বলেছে, এই পরিকল্পনা সরাসরি ‘চুরির’ সমান। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) জানিয়েছে, তারা মস্কোর আদালতে ইউরোক্লিয়ারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
‘ন্যায়সঙ্গত’ বলছে ইউক্রেন
মোটামুটি ২১০ বিলিয়ন ইউরো রাশিয়ার সম্পদ এখন ইইউতে হিমায়িত অবস্থায় আছে; এর মধ্যে ১৮৫ বিলিয়ন ইউরো শুধুই ইউরোক্লিয়ারে।
ইইউ ও ইউক্রেনের দাবি, এই অর্থেই ইউক্রেন পুনর্গঠনে ব্যবহার করা উচিত। ব্রাসেলস একে বলছে “ক্ষতিপূরণের ঋণ”, যা দিয়ে ইউক্রেনের অর্থনীতিকে ৯০ বিলিয়ন ইউরো সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার হিমায়িত সম্পদ দিয়ে রাশিয়া যে ধ্বংস করেছে তা পুনর্গঠন করা ন্যায়সঙ্গত—আর সেই অর্থ তখন আমাদেরই হয়ে যাবে।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ বলেছেন, এই অর্থ ইউক্রেনকে ভবিষ্যতের রুশ হামলা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে।
ব্রাসেলসে রাশিয়ার এই মামলা আগেই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু অসন্তুষ্ট শুধু মস্কো নয়।
বেলজিয়াম আশঙ্কা করছে পুরো পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে তাদের ওপর বিশাল আর্থিক দায় এসে পড়তে পারে।
ইউরোক্লিয়ারের প্রধান নির্বাহী ভ্যালেরি উরবাঁ-ও সতর্ক করছেন, এটি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
ইউরোক্লিয়ারেরও রাশিয়াতে ১৬-১৭ বিলিয়ন ইউরো আটকে আছে।
বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্থ দে ওয়েভার কয়েকটি “যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায্য শর্ত” রেখেছেন, যা পূরণ না হলে তিনি পরিকল্পনাটি মেনে নেবেন না এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থায় যাওয়ার কথাও বলেছেন।
ইইউ কী করতে চায়?
আগামী বৃহস্পতিবারের সম্মেলনের আগে ইইউ সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টায় ব্যস্ত।
এখন পর্যন্ত ইইউ রাশিয়ার সম্পদ সরাসরি ছোঁয়নি, তবে সম্পদ থেকে যে বাড়তি লাভ হয়েছে, তা ইউক্রেনকে দেওয়া হয়েছে ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ৩.৭ বিলিয়ন ইউরো। আইনি দিক থেকে এটি নিরাপদ, কারণ সুদকে রাশিয়ার সরকারি সম্পদ হিসেবে ধরা হয় না।
কিন্তু ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক সামরিক সহায়তা কমে গেছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে ওয়াশিংটন মূলত অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়ার পর ইউরোপের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় অর্থের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জোগাতে ইইউর দুটি প্রস্তাব আছে মোট ৯০ বিলিয়ন ইউরো।
প্রথমটি হলো, বাজার থেকে ঋণ তুলে তা ইইউ বাজেট দিয়ে গ্যারান্টি দেওয়া। বেলজিয়াম এটাই চায়। কিন্তু এতে ইইউ রাষ্ট্রনেতাদের সর্বসম্মত ভোট দরকার, যেখানে হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া বাধা দিচ্ছে।
বিকল্পটি হলো, রাশিয়ার হিমায়িত সম্পদ থেকে সরাসরি ইউক্রেনকে ঋণ দেওয়া। সম্পদগুলো আগে সিকিউরিটিজে ছিল, এখন বেশিরভাগই নগদে পরিণত হয়েছে এবং ইউরোক্লিয়ার এগুলো ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ধরে রেখেছে।
ইইউ কমিশন বলছে, বেলজিয়ামের উদ্বেগ যথার্থ এবং তারা সেই উদ্বেগ দূর করতে পদক্ষেপ নিয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইইউতে রাশিয়ার মোট ২১০ বিলিয়ন ইউরোর সম্পদের বিপরীতে বেলজিয়ামকে সুরক্ষা দেওয়া হবে।
যদি ইউরোক্লিয়ার রাশিয়ায় থাকা নিজের সম্পদে ক্ষতির মুখে পড়ে, তাহলে ইইউতে রাশিয়ার নিজস্ব ক্লিয়ারিং হাউসের সম্পদ থেকে সেই ক্ষতি উত্তোলন করা হবে।
আর রাশিয়ার কোনো আদালত যদি বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে রায় দেয়, তা ইইউতে মান্য হবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হচ্ছে, ইইউ রাষ্ট্রদূতরা শুক্রবার রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ অনির্দিষ্টকালের জন্য হিমায়িত রাখার বিষয়ে সম্মত হতে চলেছেন।
আগে প্রতি ছয় মাসে সদস্যদেশের সর্বসম্মত ভোটে এটির মেয়াদ বাড়াতে হতো, যা বেলজিয়ামের জন্য ঝুঁকি তৈরি করত। এবার তারা ইউরোপীয় আইন (Article 122) অনুযায়ী জরুরি অবস্থা দেখিয়ে সম্পদ দীর্ঘমেয়াদে স্থির রাখবে।
কেন বেলজিয়াম এখনো সন্তুষ্ট নয়
বেলজিয়াম বলছে, তারা ইউক্রেনের ঘনিষ্ঠ সমর্থক কিন্তু আইনি ঝুঁকি আর অর্থনৈতিক দায় নিয়ে তারা চিন্তিত।
দেশটির সাধারণত বিভক্ত রাজনীতিও এবার প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় চাপের মাঝেও তিনি শুক্রবার লন্ডনে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হয়েছেন।
কেও লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক আইন বিশেষজ্ঞ ভিরলে কোলার্ট বলেন, “বেলজিয়াম ছোট অর্থনীতি। দেশের জিডিপি প্রায় ৫৬৫ বিলিয়ন ইউরো। ভাবুন, যদি তাদের ১৮৫ বিলিয়ন ইউরোর দায় তুলতে হয়!”
তার মতে, ইউরোক্লিয়ারকে ইইউকে ঋণ দিতে বাধ্য করা ইউরোপীয় ব্যাংকিং নিয়ম ভঙ্গ করবে।
তিনি বলেন, “ব্যাংকগুলোর মূলধন ও তরলতার নিয়ম মানা জরুরি কারণ সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা যায় না। এখন ইইউ ইউরোক্লিয়ারকে ঠিক সেটাই করতে বলছে।
ব্যাংকের স্থিতি রক্ষার জন্যই এসব নিয়ম। আর কিছু হলে বেলজিয়ামকে ইউরোক্লিয়ারকে বাঁচাতে এগোতে হবে। তাই বেলজিয়াম সুরক্ষা চাইছে। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/