সৌদি আরব প্রকাশ্যে ইয়েমেনের প্রধান দক্ষিণী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন এ মাসে দখল করা দেশের পূর্বাঞ্চলের দুটি প্রদেশ থেকে সরে যায়। এই আহ্বান এমন এক সময়ে এসেছে, যখন হুতি বিদ্রোহীদের বিরোধী শাসক জোটের ভেতরে বিভাজন আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ বৃহস্পতিবার এ দাবি জানায়। মন্ত্রণালয়টি ডিসেম্বরের শুরুতে তেলসমৃদ্ধ হাদরামাউত ও আল-মাহরা প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) সামরিক তৎপরতাকে “অযৌক্তিক উত্তেজনা” হিসেবে বর্ণনা করে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ইয়েমেনের সব পক্ষ ও উপাদানের মধ্যে সহযোগিতার গুরুত্বের ওপর সৌদি আরব জোর দিচ্ছে, যাতে সবাই সংযম প্রদর্শন করে এবং এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয়, যা নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করতে পারে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
সৌদি আরব আরও জানায়, মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা চলছে, যার লক্ষ্য হলো এসটিসির বাহিনীকে দুটি প্রদেশের বাইরে তাদের আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া এবং ওই এলাকাগুলোর ক্যাম্পগুলো ন্যাশনাল শিল্ড ফোর্সেসের কাছে হস্তান্তর করা।
রিয়াদ বলেছে, তারা এখনো আশাবাদী যে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা জরুরি ও সুশৃঙ্খলভাবে পিছু হটবে, যাতে স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কাছ থেকে আগে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা পাওয়া এসটিসি ডিসেম্বরের শুরুতে দ্রুত ওই দুই প্রদেশে প্রবেশ করে। সামান্য প্রতিরোধের মুখে তারা গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা, সরকারি ভবন এবং সীমান্ত ক্রসিংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
গোষ্ঠীটি ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অস্থায়ী রাজধানী আদেনে অবস্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদও দখলে নেয়।
২০১৫ সাল থেকে চলমান ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত উভয়ই ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এসটিসি সৌদি সমর্থিত একটি বৃহত্তর জোটের অংশ, যার নাম প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল—এই কাউন্সিলই দেশটির প্রতিনিধিত্ব করে।
১২ ডিসেম্বর সৌদি আরব ও আরব আমিরাত একসঙ্গে একটি প্রতিনিধিদল আদেনে পাঠিয়ে সমাধানের আলোচনা শুরু করলেও, এখনো পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি।
সৌদি আরবের সঙ্গে হাদরামাউতের ৬৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং দেশটি প্রদেশটিকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। অন্যদিকে, ওমান তাদের সীমান্তবর্তী আল-মাহরা প্রদেশ নিয়েও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এই দুই প্রদেশেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ ও জ্বালানি সম্পদ, যেগুলোকে এসটিসি একটি স্বাধীন দক্ষিণী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য মনে করে।
দক্ষিণ ইয়েমেন পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে গঠিত হয় এসটিসি। দক্ষিণ ইয়েমেন ১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান ছিল।
গোষ্ঠীটির নেতা আইদারুস আল-জুবাইদি ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদস্য হলেও, তিনি ক্রমেই যে সরকারের অংশ বলে বিবেচিত, তার বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
পিছু হটার বদলে এসটিসি প্রতিবেশী আবিয়ান প্রদেশে তাদের অভিযান আরও বিস্তৃত করেছে এবং ঘোষণা দিয়েছে, হুতি বিদ্রোহীদের কাছ থেকে ইয়েমেনের রাজধানী সানাও দখল করাই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। সম্প্রতি আল-জুবাইদি সমর্থকদের বলেন, দক্ষিণাঞ্চল এখন “একটি সংকটজনক ও অস্তিত্বমূলক সন্ধিক্ষণে” দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে “ভবিষ্যতের দক্ষিণ আরব রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার” জন্য কাজ করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, এই উত্তেজনা ইয়েমেনের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে দিতে পারে এবং এর ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে হুতিরা—যারা ২০১৪ সাল থেকে সানাসহ উত্তর ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/