ভারতের মহারাষ্ট্রের বারামতি বিমানবন্দরের কাছেই রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারকে বহনকারী লিয়ারজেট ৪৫ প্রাইভেট জেটটি বিধ্বস্ত হয়ে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বিকেলে দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেটি একটি ‘অনিয়ন্ত্রিত’ বিমানবন্দর, যেখানে ফ্লাইট ট্রাফিকের তথ্য স্থানীয় ফ্লাইং স্কুলের পাইলটরা পরিচালনা করেন।
দেশটির বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে দুর্ঘটনার দিকে পরিচালিত ঘটনাবলীর ক্রমও তুলে ধরা হয়, যার মধ্যে সম্ভাব্য উদ্বেগজনক বিষয় হলো পাইলট ‘অবতরণ ছাড়পত্রের রিডব্যাক দেননি’, অর্থাৎ, বিশ্বব্যাপী প্রোটোকলের মতো বিমানটি অবতরণ অনুমোদনের পুনরাবৃত্তি থেকে কোনো বার্তা পায়নি।
কী কী হয়েছিল
সকাল ৮টা ১৮ মিনিটে দিল্লিভিত্তিক ননশিডিউলড এয়ার ট্রান্সপোর্ট অপারেটর ভিএসআর ভেঞ্চার্স প্রাইভেট লিমিটেডের মালিকানাধীন এবং ভিটি-এসএসকে হিসেবে নিবন্ধিত বিমানটি বারামতি বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। বিমানটি মুম্বাই থেকে সকাল ৮টা ১০ মিনিটে ছেড়েছিল। মুম্বাই থেকে বারমতির দূরত্ব ২৫৬ কিলোমিটার এবং উড়ানের সময় ৪৫ মিনিটেরও কম।
বিমানটির পরবর্তী কল ছিল বারামতি বিমানবন্দর থেকে ৩০ নটিক্যাল মাইল বা ৫৫ দশমিক ৬ কিমি দূরে। এই সময়ে পুনে বিমানবন্দর বিমানটি স্থানীয় বিমান পরিবহন নিয়ন্ত্রকের কাছে হস্তান্তর করে এবং ক্যাপ্টেন শাম্ভবী পাঠককে আবহাওয়ার অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে তার বিবেচনার ভিত্তিতে অবতরণ করার পরামর্শ দেন।
সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, শাম্ভবী পাঠককে বাতাস এবং দৃশ্যমানতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল - অবতরণের আগে পাইলটরা বিশ্বব্যাপী গ্রাউন্ড স্টাফ বা এটিসি-র কাছে সাধারণ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন। তাকে বলা হয়েছিল যে দৃশ্যমানতা প্রায় তিন হাজার মিটার বা তিন কিলোমিটার, যা বিমান বিশেষজ্ঞরা এনডিটিভি-কে বলেছেন যে ‘মোটামুটি মানসম্পন্ন এবং অবতরণের চেষ্টা করার জন্য যথেষ্ট’ বলে বিবেচিত হয়।
এরপর বিমানটি ১১ নম্বর রানওয়েতে চূড়ান্ত অবতরণ করার কথা জানায়। ঠিক এর পরপরই, পাইলট জানান যে ল্যান্ডিং স্ট্রিপ বা অবতরণ পথটি ‘দেখা যাচ্ছে না’। তখন তাকে ‘গো-অ্যারাউন্ড’ বা অবতরণ বাতিল করে পুনরায় আকাশে উড্ডয়ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়; যা একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর, যদি বিমানটি সম্পূর্ণ থেমে যাওয়ার আগে যেকোনো মুহূর্তে প্রাথমিক অবতরণ বাতিল করা হয়।
গো-অ্যারাউন্ডের পর বিমানটির অবস্থান সম্পর্কে আবারও জানতে চাওয়া হয়। এ সময় পাইলট পুনরায় চূড়ান্ত অবতরণের কথা জানান। রানওয়ে এখন দেখা যাচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে পাইলট নিশ্চিত করেন যে রানওয়ে দৃশ্যমান।
এরপর সকাল ৮টা ৩৪ মিনিটে বিমানটিকে অবতরণের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে, এখানেই বিতর্কের বিষয়টি উঠে আসে- অবতরণের এই অনুমতির বিপরীতে পাইলটের পক্ষ থেকে কোনো ‘রিডব্যাক’ বা ফিরতি নিশ্চিতকরণ বার্তা আসেনি।
বিমানটি নীরব হয়ে যায়
সকাল ৮:৪৩ মিনিটে বিমানটি 'নীরব' হয়ে যায় বলে জানা যায়; অর্থাৎ, এটি সংকেত পাঠানো বন্ধ করে দেয়। এই সংকেতটি বিমান থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে পাঠানো হয়, যাতে ভূমি বা গ্রাউন্ড স্টেশন এবং আশেপাশে থাকা অন্যান্য বিমান রিয়েল-টাইমে ওই বিমানটির সঠিক অবস্থান, উচ্চতা, গতি এবং পরিচয় শনাক্ত করতে পারে।
বারামতী বিমানবন্দর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে সংকেতগুলো বন্ধ হয়ে যায়। সেই মুহূর্তে বিমানটি ভূমি থেকে এক কিলোমিটারের কিছু বেশি উচ্চতায় ছিল এবং এর গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৩৭ কিলোমিটার।
দুর্ঘটনা ও বিস্ফোরণ
এরপর ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল ৮টা ৪৬মিনিট ২ সেকেন্ডে মহারাষ্ট্রের বারামতী বিমানবন্দরের কাছেই একটি হাইওয়ের সিসিটিভি ফুটেজে আগুনের গোলক এবং বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। পরে জরুরি পরিষেবাগুলো দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং রানওয়ের বাম পাশে বিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়।
ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া দৃশ্যে আগুন, ধোঁয়া এবং বিমানের দুমড়েমুচড়ে যাওয়া অংশ দেখা যাচ্ছিল; সেখানে জরুরি পরিষেবাকর্মী এবং আতঙ্কিত স্থানীয় জনতা ভিড় জমিয়েছিলেন, যারা প্রত্যেকেই সাহায্যের চেষ্টা করছিলেন।
এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি) এই ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে।
অজিত পাওয়ারের স্ত্রী সুনেত্রা রাজ্যসভার সাংসদ। তার দুই ছেলে পার্থ ও জয়। তিন দশকেরও বেশি সময়ের এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন তিনি- যার মধ্যে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে তার কাকা শরদ পাওয়ারের দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) ভেঙে বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে রাজ্য সরকার গঠন করার মতো আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনাও রয়েছে।
এনসিপি প্রধানে অজিয়ের পাওয়ারের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা বিদিপ যাদব, দুই পাইলট - সুমিত কাপুর এবং সম্ভাবী পাঠক এবং একজন বিমান পরিচারিকা নিহত হয়েছেন। - এনডিটিভি
অমিয়/