পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইসলামাবাদ বলছে, এটি কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ নয়, বরং ধারাবাহিক হামলার জবাব। তবে এই পাল্টাপাল্টি আক্রমণ এখন দুই দেশের সম্পর্ককে সরাসরি সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
পাকিস্তানের দাবি, বৃহস্পতিবার রাতে তালেবানরা ডুরান্ড লাইনজুড়ে একাধিক পাকিস্তানি সামরিক চৌকি ও স্থাপনায় ‘বড় পরিসরের অভিযান’ চালায়। পাকিস্তানের বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ সেই হামলার সরাসরি জবাব। ইসলামাবাদ বলছে, তাদের সীমান্তরক্ষী ও সেনাসদস্যদের ওপর আক্রমণ হলে জবাব দেওয়া হবে। এটি আত্মরক্ষার অধিকার।
সন্ত্রাসী আস্তানা ইস্যু
দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে, আফগানিস্তানের মাটিতে পাকিস্তানি তালেবান গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আশ্রয় ও সহায়তা পাচ্ছে। ইসলামাবাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক আত্মঘাতী হামলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা আফগান ভূখণ্ড থেকেই হয়েছে। পাকিস্তান দাবি করেছে, এ বিষয়ে তাদের কাছে ‘প্রমাণ’ আছে। যদিও কাবুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।
যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে কাতারের মধ্যস্থতায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। কিন্তু ইস্তাম্বুলে আলোচনায় স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় তা ভেঙে পড়ে। এরপর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে দ্রুত অবনতি ঘটে। সীমান্তে ছোটখাটো সংঘর্ষ বাড়তে বাড়তে এখন তা বড় সামরিক অভিযানে রূপ নিয়েছে।
নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা
পাকিস্তানের নেতৃত্ব বলছে, অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ বেড়ে যাওয়ায় তাদের ‘ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে’। ইসলামাবাদের একটি মসজিদে বড় ধরনের হামলাসহ বিভিন্ন সহিংস ঘটনার জন্য তারা আফগান মাটি থেকে ‘রপ্তানিকৃত সন্ত্রাসবাদকে’ দায়ী করছে। সরকারের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
বিদেশি প্রক্সি যুদ্ধের অভিযোগ
ইসলামাবাদ আরও অভিযোগ করেছে, আফগান তালেবান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিশেষ করে ভারতের ‘প্রক্সি’ হিসেবে কাজ করছে। পাকিস্তানের দাবি, তাদের প্রতিবেশী ভূখণ্ড ব্যবহার করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। তবে এই অভিযোগেরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
লক্ষ্য এখন সরাসরি সরকার
পূর্বের অভিযানে সাধারণত জঙ্গি আস্তানা লক্ষ্যবস্তু হলেও সাম্প্রতিক হামলায় তালেবান সরকারের স্থাপনা ও সামরিক সদরদপ্তর সরাসরি টার্গেট হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সংঘাতের প্রকৃতি বদলে দিয়েছে। এখন তা কেবল সীমান্ত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান নয়, বরং কার্যত রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র সংঘাতের ঝুঁকিতে পৌঁছেছে।
মানবাধিকারের উদ্বেগ
আফগান কর্তৃপক্ষ হামলার নিন্দা জানিয়ে দাবি করেছে, বেসামরিক বাড়িঘর ও স্কুলে আঘাত লেগেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নারী ও শিশুসহ বহু মানুষ হতাহত হয়েছে। স্বাধীনভাবে এসব তথ্য যাচাই করা কঠিন হলেও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
রাশিয়া, ইরান এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তি অবিলম্বে সংঘাত বন্ধ করে কূটনৈতিক পথে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায় আশঙ্কা করছে, এই উত্তেজনা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তা পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা ছড়িয়ে দিতে পারে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সীমান্তের উত্তেজনা এখন কেবল নিরাপত্তা ইস্যু নয়। এটি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, কূটনৈতিক ব্যর্থতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের জটিল সমীকরণে রূপ নিয়েছে।