বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির নাটাই মূলত মধ্যপ্রাচ্যের হাতে। ইরান, ইসরায়েল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনা যখনই বৃদ্ধি পায়, তখনই বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকটের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়। এর মূল কারণ একটাই—মধ্যপ্রাচ্যের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা অবিশ্বাস্য পরিমাণ তেল ও গ্যাসের মজুত। কিন্তু কেন বিশ্বের অন্য সব অঞ্চলকে পেছনে ফেলে এই বিশেষ অঞ্চলটিই প্রাকৃতিক সম্পদের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে লাখ লাখ বছরের এক বিস্ময়কর ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মধ্যে।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশাল সম্পদের পেছনে রয়েছে পৃথিবীর ভূ-স্তরের জটিল বিন্যাস। আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি বছর আগে দক্ষিণ-পূর্বে অ্যারাবিয়ান প্লেট এবং উত্তর ও পূর্ব দিকে ইউরেশীয় প্লেটের মধ্যে এক বিশাল সংঘর্ষ শুরু হয়। এই দুটি টেকটোনিক প্লেটের মুখোমুখি সংঘাত এখনো চলমান। এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘর্ষের ফলে ভূ-গর্ভের শিলাস্তরগুলো প্রচণ্ড তাপ ও চাপে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। পারস্য উপসাগরের দুই তীরের ভূ-প্রকৃতি তাই একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। একদিকে তৈরি হয়েছে ১৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ জাগরোস পর্বতমালা, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে বিশাল গম্বুজ আকৃতির ভূ-কাঠামো। এই গম্বুজগুলোই প্রাকৃতিক আধার হিসেবে শত শত কোটি ব্যারেল তেল ও গ্যাস কয়েক কোটি বছর ধরে আগলে রেখেছে।
মাটির গভীরে হাইড্রোকার্বন বা তেল-গ্যাস তৈরির মূল উপাদান হলো জৈব পদার্থ। কোটি কোটি বছর আগে এই অঞ্চলটি অগভীর সমুদ্রের নিচে ছিল। সেখানে জুওপ্ল্যাঙ্কটন এবং ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের মতো সামুদ্রিক জীব মারা যাওয়ার পর পলিমাটির নিচে জমা হতে থাকে। বিশেষ করে জুরাসিক এবং ক্রিটেসিয়াস যুগে (২০ কোটি থেকে সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে) এই জৈব উপাদানের স্তরগুলো বিশাল আকার ধারণ করে। সাধারণত কোনো শিলাস্তরে অন্তত ২ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকলে তাকে উৎকৃষ্ট মানের ‘সোর্স রক’ বা তেলের উৎস বলা হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের হানিফা, তুওয়াইক বা খুজেস্তানের মতো শিলাস্তরগুলোতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশ থেকে শুরু করে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এই অস্বাভাবিক সমৃদ্ধিই অঞ্চলটিকে তেলের সাগরে পরিণত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্রগুলোর সক্ষমতা পৃথিবীর অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ৩০টির বেশি ‘সুপারজায়ান্ট’ তেলক্ষেত্র রয়েছে, যার প্রতিটিতে মজুত আছে অন্তত ৫০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল। রাশিয়ার সাইবেরিয়া বা আমেরিকার পারমিয়ান বেসিনে বিশাল মজুত থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের কূপগুলোর উৎপাদন হার অনেক বেশি। উত্তর সাগর বা রাশিয়ার সেরা কূপগুলোর তুলনায় পারস্য উপসাগরের একটি কূপ থেকে দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি তেল উত্তোলন করা সম্ভব। এর মূল কারণ হলো এখানকার শিলাস্তরের ছিদ্রযুক্ত গঠন এবং প্রাকৃতিক ফাটল, যা তেলের প্রবাহকে অনেক সহজ করে দেয়।
সৌদি আরবের ঘাওয়ার তেলক্ষেত্রটি এর উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি বিশ্বের বৃহত্তম তেলক্ষেত্র, যেখান থেকে ভবিষ্যতে আরও ৭০ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। আবার সাউথ পার্স-নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্রটির শক্তি হিসাব করলে দেখা যায়, এটি ২০০ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের সমান জ্বালানি সরবরাহ করতে সক্ষম। পৃথিবীর মাত্র ৩ শতাংশ ভূখণ্ড হয়েও এই অঞ্চলটি বিশ্বের মোট তেলের অর্ধেক এবং গ্যাসের ৪০ শতাংশ মজুত নিয়ন্ত্রণ করছে।
মানুষের কাছে এই সম্পদের পরিচয় অনেক পুরোনো। শেষ বরফ যুগের শেষে প্রায় ১৪ হাজার বছর আগে পারস্য উপসাগর গঠিত হওয়ার সময় থেকেই নদী ও উপত্যকায় প্রাকৃতিকভাবে তেলের নিঃসরণ লক্ষ করা যেত। প্রাচীন যুগের মানুষ নৌকাকে পানি নিরোধক করতে এবং ঘর তৈরির কাজে এখানকার বিটুমিন ব্যবহার করত। তবে আধুনিক যুগে ১৯০৮ সালে ইরানে প্রথম তেলের সন্ধান পাওয়ার পর দৃশ্যপট বদলে যায়। ১৯৫০ এবং ৬০-এর দশকে যখন আধুনিক অনুসন্ধান শুরু হয়, তখন বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে দেখেন যে ভূ-প্রকৃতি এখানে কতটা উদার।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও এখানে ফুরিয়ে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মতে, গত ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে উৎপাদন চলার পরেও এই অঞ্চলে আরও বিশাল তেলের ভান্ডার আবিষ্কৃত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। আধুনিক হরাইজন্টাল ড্রিলিং এবং ফ্র্যাকচারিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এখান থেকে আরও প্রায় ৮৬ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং ৯.৫ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হতে পারে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, অনন্য টেকটোনিক অবস্থান, সমৃদ্ধ শিলাস্তর এবং বিশাল প্রাকৃতিক আধারের সমন্বয় মধ্যপ্রাচ্যকে পৃথিবীর একক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী জ্বালানি শক্তিতে পরিণত করেছে, যার কোনো বিকল্প এই গ্রহে বর্তমানে নেই। সূত্র: বিবিসি বাংলা