ইরানে এখন উদ্ধার করা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবিস্ফোরিত অস্ত্র নিয়ে ব্যাপক তোড়জোড় চলছে। দেশটির সামরিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এই অস্ত্রভান্ডারকে সক্ষমতা বৃদ্ধির বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। সংঘাতের ময়দান থেকে উদ্ধার করা আধুনিক সমরাস্ত্রগুলো এখন ইরানের সামরিক গবেষণাগারে নতুন জ্ঞান যোগ করছে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভি গত ২৬ এপ্রিল জানায়, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) হরমোজগান প্রদেশে ১৫টির বেশি ভারী মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করেছে। এই শক্তিশালী অস্ত্রগুলো এখন ইরানের প্রযুক্তি ও গবেষণা ইউনিটগুলোর হেফাজতে রয়েছে। উদ্ধার করা অস্ত্রের তালিকায় আমেরিকার বিখ্যাত বাঙ্কার-বাস্টার বোমা ‘জিবিইউ-৫৭’ ও জাঞ্জান এলাকা থেকে পাওয়া কয়েক হাজার ছোট বোমা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ৪০ দিনের লড়াই শেষে ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরবর্তী সময় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করেন। এই লড়াইয়ের পর ইরানি ভূখণ্ডে পড়ে থাকা আধুনিক অস্ত্রগুলো এখন তেহরানের বড় সম্পদে পরিণত হয়েছে।
ইরানের স্টুডেন্ট নিউজ নেটওয়ার্ক (এসএনএন) ১ মে এই অস্ত্রভান্ডারকে ‘অবাঞ্ছিত উপহার’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্র এখন দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের গবেষণাগারে রূপ নিয়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের ছোড়া এসব অস্ত্রকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে তেহরান। এসএনএন দাবি করছে, ফেলে যাওয়া এই অস্ত্রগুলো উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ব্যবহৃত হবে। পশ্চিমা দেশগুলোর আসল আতঙ্ক হলো, ইরান এসব আধুনিক সমরাস্ত্রের ‘গোপন প্রযুক্তি’ বুঝে ফেলার চেষ্টা করছে।
নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান দীর্ঘদিন ধরে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর নির্ভর করছে। এর আগে ইরান সফলভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘হক’ ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আরকিউ-১৭০’ ড্রোন জব্দ করার ঘটনাটি ছিল একই ধরনের কৌশল। এসএনএন বলছে, ওই ঘটনার পর থেকে ইরান কেবল অনুকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা এখন উদ্ভাবনের পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
কায়হান পত্রিকার সম্পাদক হোসেন শারিয়া তামদারি পরামর্শ দিয়েছেন, এই প্রযুক্তিগুলো চীন ও রাশিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া উচিত। একে তিনি ‘আমাদের জন্য সুসংবাদ এবং আমেরিকার জন্য দুঃসংবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তার দাবি, যুদ্ধ চলাকালে বিপুলসংখ্যক উন্নত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ‘টমাহক’, ‘এজিএম-১৫৮’ ও ‘এমকিউ-৯’ ড্রোন ব্যর্থ হয়েছে। এগুলোর কারিগরি রহস্য উদ্ধার করা ইরানের জন্য বড় অর্জন।
সরকারি গণমাধ্যমের ব্যক্তিরাও একই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। একজন টিভি উপস্থাপক বলেন, ‘এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং করে ভবিষ্যতে শত্রুদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা যাবে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারপন্থিরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। কেউ কেউ খুব শিগগির এসব অস্ত্রের ব্যাপক উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন।
তেহরানের পৌর কর্মকর্তা এহসান খারামিদ একে ‘জ্ঞানের জন্য এক নতুন সংগ্রামের সূচনা’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোও মনে করে এই অস্ত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির গোপন দিকগুলো উন্মোচন করতে পারে।
বিশ্লেষক এহসান তাকদোশি মনে করেন, এ ঘটনার ফলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে কয়েক হাজার কোটি ডলার ব্যয় করতে বাধ্য হবে। এর ফলে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপে তারা আরও সতর্কতা অবলম্বন করবে। তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘এটি চাবি ছাড়া একটি জটিল তালা বোঝার মতো। এর আসল সুবিধা সরাসরি ব্যবহারের মধ্যে নয়। এর প্রযুক্তি বোঝা ও পুনরায় তৈরি করার সক্ষমতা অর্জনের মধ্যে এর সার্থকতা নিহিত।’ ইরানের এই নতুন তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সূত্র: বিবিসি