পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ এখন চূড়ান্ত নাটকীয় মোড়ে। তৃণমূলের দুর্গ গুঁড়িয়ে দিয়ে ২০৭টি আসনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসছে বিজেপি। তবে জয়ের আনন্দ ছাপিয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—কে হচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী? এই প্রশ্নের সমাধান করতে বিজেপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতায় আসছেন।
এদিকে মঙ্গলবার (৫ মে) মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিয়েছেন, পরাজয় মেনে নিয়ে তিনি পদত্যাগ করবেন না। তিনি বলেন, “এই ফলাফল প্রকৃত জনরায় নয়, বরং একটি ‘চক্রান্ত’। ভোট লুট করা হয়েছে।” ফলে একদিকে নতুন সরকার গঠনের তোড়জোড়, অন্যদিকে মমতার জেদ—সব মিলিয়ে ওপার বাংলায় এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সৃষ্টি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে বিজেপি। গেরুয়া শিবির এবার বিধানসভায় বিরোধী দল নয়, বরং সরাসরি শাসক দলের ভূমিকায় বসতে যাচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, নতুন মুখ্যমন্ত্রীই হবেন বিধানসভায় শাসক দলের পরিষদীয় দলনেতা। এই নাম চূড়ান্ত করার লক্ষ্যেই বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অমিত শাহকে পর্যবেক্ষক হিসেবে রাজ্যে পাঠাচ্ছেন। তার সঙ্গে সহকারী পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকছেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি। মোদি সরকারের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ অমিত শাহ নিজে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গকে দিল্লি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। আর অমিত শাহর উপস্থিতিতে পরিষদীয় দলের বৈঠকে আজ বুধবারের মধ্যে নির্ধারিত হবে কে হবেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দু নাকি অন্য কেউ?
বাংলার মসনদে কে বসবেন, তা নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। তবে দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুই আসনেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। রাজ্যে বিজেপির এই বিশাল জয়ের অন্যতম কারিগরও তাকেই মনে করা হয়। তবে শুভেন্দু ‘আদি বিজেপি’ না হওয়ায় দলের ভেতরে একটি অংশ শমীক ভট্টাচার্য বা দিলীপ ঘোষের নামও তুলছে। শমীক ভট্টাচার্য আরএসএস-ঘনিষ্ঠ এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতা হিসেবে পরিচিত। আবার বিজেপি ইদানীং রাজস্থান বা ওড়িশার মতো হুট করে নতুন কোনো ‘চমক’ উপহার দিতেও পছন্দ করে। সে ক্ষেত্রে তালিকায় যোগ হতে পারে স্বপন দাশগুপ্ত কিংবা হিন্দুত্ববাদী কোনো সংগঠনের নেতার নাম। আগামী ৯ মে শপথ গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ভাবা হচ্ছে।
মমতার নজিরবিহীন অনড় অবস্থান
এদিকে ভোটের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান ভারতের রাজনৈতিক মহলে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। সাধারণত পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীরা রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এটাই দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক রীতি ও শিষ্টাচার। কিন্তু মমতা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ইস্তফা দেবেন না। তার দাবি, ভোট লুট করা হয়েছে এবং তিনি হারেননি।
তৃণমূল কংগ্রেসের এই সভানেত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘পদত্যাগের কোনো প্রশ্নই নেই। আমি পদত্যাগ করব না।’ তিনি দাবি করেন, এই ফলাফল প্রকৃত জনরায় নয়, বরং একটি ‘চক্রান্ত’। তিনি বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করব না। আমরা হারিনি। আমাদের হারানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে অফিশিয়ালি তারা আমাদের হারাতে পারে, কিন্তু নৈতিকভাবে আমরাই জিতেছি।’
রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মমতা সরাসরি বলেন, ‘কেন যাব? কী উদ্দেশ্যে? আমরা তো হারিনি যে পদত্যাগ করতে যাব। যদি হারতাম, তবে পদত্যাগপত্র জমা দিতাম। এখন সেই প্রশ্নই ওঠে না।’
তিনি আরও বলেন, জোর করে ক্ষমতা দখল করলেই কেউ তাকে পদত্যাগ করাতে পারবে না। পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার দল এই সিদ্ধান্ত নেবে। আমি একা নই, দল আমার সঙ্গে আছে। আমরা সবাই মিলে পরবর্তী কৌশল ঠিক করব।’
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে এমন পরিস্থিতি আগে কখনো তৈরি হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৭ মে। মমতা ইস্তফা না দিলেও ওই দিন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার পদের বৈধতা হারাবে। তবে শিষ্টাচার ভেঙে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার এই জেদ বাংলার ইতিহাসে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিল।
বামদের ভরাডুবি
বিজেপির এই জোয়ারে কার্যত ধুয়েমুছে গেছে বামফ্রন্ট। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটের অন্তত ১৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ না পাওয়ায় সিপিএমের ২১ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলবিরোধী ভোটগুলো পুরোপুরি বিজেপির বাক্সে যাওয়ায় বামেদের এই করুণ দশা।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় তৃণমূল ও বিজেপির ২ জন নিহত
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় দুজন নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বীরভূম জেলার নানুরে এক তৃণমূল কর্মীকে কুপিয়ে খুন করার অভিযোগ উঠেছে। নিহতের নাম আবির শেখ। পরিবারের অভিযোগ, আবিরকে রাস্তায় একা পেয়ে বিজেপির কর্মীরা ঘিরে ধরে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায় এলাকায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ।
এ ছাড়া হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে এক বিজেপি কর্মীকে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। নিহতের নাম যাদব বর (৪৮)। পরিবারের দাবি, ভোটের ফল স্পষ্ট হতেই অন্যদের সঙ্গে আনন্দে মেতেছিলেন তিনি, বেরিয়েছিলেন মিছিলেও। রাত ১১টার দিকে বাড়ির অদূরে যাদবকে তুলে নিয়ে যায় কয়েকজন। পরে তাকে মারধর করা হয়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। পরিবারের লোকজন খবর পেয়ে উদয়নারায়ণপুর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
সূত্র: আনন্দবাজার