যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও গত ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ার ড্রোন হামলা ও সামনের সারিতে সংঘর্ষের খবর দিয়েছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা। অথচ গত শনিবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ শেষের দিকে বলে মনে করছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে শান্তি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইউক্রেন ও রাশিয়া ৯ মে থেকে ১১ মে পর্যন্ত যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে চার বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত রবিবার বলেন, মস্কো বড় আকারের ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ হামলা থেকে বিরত ছিল, তবে দীর্ঘ ফ্রন্টলাইনের বিভিন্ন অংশে রুশ বাহিনী তাদের আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পাল্টা অভিযোগ করে জানায়, ইউক্রেনই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তাদের দাবি–গত এক দিনে তারা ৫৭টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ‘সমপর্যায়ের জবাব’ দিয়েছে। তবে গত সোমবার তারা যুদ্ধক্ষেত্রের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো তথ্য দেয়নি।
ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে একজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক গভর্নর। দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসনে দুজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া পাশের মাইকোলাইভ অঞ্চলে তিনজন, উত্তরাঞ্চলীয় খারকিভে পাঁচজন এবং পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্কে চারজন আহত হয়েছেন বলে আঞ্চলিক প্রশাসনের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ফ্রন্টলাইনে ১৮০টি সংঘর্ষ রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া রুশ বাহিনী রোববার বিভিন্ন বসতি ও সামরিক অবস্থানে হামলায় ৮ হাজার ৩৭টি ‘কামিকাজে’ ড্রোন ব্যবহার করেছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সোমবার জানান, ইউক্রেনের সঙ্গে ড্রোন চুক্তিতে প্রায় ২০টি দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে এবং এর মধ্যে চারটি চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষর হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে জেলেনস্কি ড্রোনযুদ্ধে ইউক্রেনের অভিজ্ঞতাকে কূটনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ সফরের সময় তিনি একাধিক প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা চুক্তি করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জেলেনস্কি লেখেন, ‘প্রায় ২০টি দেশ বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পৃক্ত রয়েছে। এর মধ্যে চারটি চুক্তি ইতোমধ্যে সই হয়েছে এবং সেসবের আওতায় প্রথম দফার চুক্তিপত্র এখন প্রস্তুত করা হচ্ছে।’
এপ্রিল মাসে ইউক্রেন জার্মানি, নরওয়ে ও নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও ড্রোন চুক্তি সই করে। এর আগে মার্চের শেষ দিকে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা অংশীদারত্ব গড়ে তোলে কিয়েভ।
গত মাসে ইউক্রেন আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সহযোগিতা চুক্তি করেছে।
জেলেনস্কি আরও জানান, বিশ্বের আরেকটি অঞ্চলের সঙ্গে ড্রোন চুক্তির আওতায় নতুন নিরাপত্তা সহযোগিতা শুরু করতে যাচ্ছে ইউক্রেন, যদিও তিনি কোন অঞ্চল তা উল্লেখ করেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব চুক্তির মাধ্যমে ইউক্রেন ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ জ্বালানি পেতে শুরু করেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
জেলেনস্কি আশা করছেন, তার ‘ড্রোন কূটনীতি’ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি এবং ইউক্রেনের কৃষিপণ্যের নতুন বাজার নিশ্চিত করতেও সহায়তা করবে।
‘ইউক্রেন যুদ্ধ শেষের পথে’
এদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত শনিবার বলেছেন, তার ধারণা ইউক্রেন যুদ্ধ ‘শেষের দিকে এগোচ্ছে।’ মস্কোতে সাম্প্রতিক বছরের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে বিজয়ের অঙ্গীকার করার কয়েক ঘণ্টা পরই তিনি এই মন্তব্য করেন।
পুতিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার মনে হয় বিষয়টি শেষের দিকে যাচ্ছে।’ ইউক্রেন যুদ্ধকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ইউরোপের জন্য নতুন নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে তিনি প্রস্তুত আছেন। এ ধরনের আলোচনায় তার পছন্দের অংশীদার হবেন জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর জেরহার্ড শ্রোডের।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের ফলে রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক ১৯৬২ সালের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর সবচেয়ে বড় সংকটে পড়ে। সেই সময় বিশ্ব পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কায় ছিল। ক্রেমলিন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় হওয়া শান্তি আলোচনা আপাতত স্থগিত রয়েছে। পুতিন বারবার বলে আসছেন, মস্কোর ভাষায় ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’-এর সব লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।
ক্রেমলিনে বক্তব্য দেওয়ার সময় পুতিন যুদ্ধের কারণ হিসেবে পশ্চিমা ‘গ্লোবালিস্ট’নেতাদের দায়ী করেন। তার দাবি, ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর পতনের পর ন্যাটো পূর্বদিকে সম্প্রসারণ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পশ্চিমা দেশগুলো। কিন্তু পরে তারা ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাব বলয়ে টানার চেষ্টা করে।
পুতিনের এই বক্তব্য আসে ৯ মে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজের কয়েক ঘণ্টা পর। সোভিয়েত ইউনিয়নের নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ের স্মরণে এই জাতীয় দিবস পালন করা হয়। যুদ্ধে নিহত ২ কোটি ৭০ লাখ সোভিয়েত নাগরিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই মূলত এই আয়োজন।
তবে এবারের আয়োজন ছিল অনেকটাই সীমিত। সাধারণত রেড স্কয়ারে আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংক ও বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা প্রদর্শন করা হলেও এবার ক্রেমলিনের দেয়ালের বিপরীতে বড় পর্দায় রুশ সামরিক সরঞ্জামের ভিডিও দেখানো হয়।
ইউক্রেনে রুশ বাহিনী চার বছরেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ করছে। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত বাহিনীর যুদ্ধকালীন সময়ের চেয়েও দীর্ঘ, যা রাশিয়ায় ‘গ্রেট প্যাট্রিয়টিক ওয়ার’ নামে পরিচিত।
১৯৯৯ সালের শেষ দিন থেকে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকা পুতিন এখন মস্কোয় যুদ্ধ নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মুখে আছেন। এই যুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। ইউক্রেনের বিশাল এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং রাশিয়ার ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
রাশিয়া ও ইউরোপের সম্পর্কও এখন স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে। রুশ বাহিনী এখনো ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনবাস পুরোপুরি দখল করতে পারেনি। সেখানে কিয়েভের বাহিনী দুর্গনগরভিত্তিক প্রতিরক্ষা লাইন ধরে রেখেছে। যদিও চলতি বছরে রাশিয়ার অগ্রগতি ধীর হয়েছে, তবুও মস্কো বর্তমানে ইউক্রেনের মোট ভূখণ্ডের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত একটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন, যা মস্কো ও কিয়েভ–উভয়ই সমর্থন করে। পাশাপাশি দুই পক্ষ ১ হাজার যুদ্ধবন্দি বিনিময়ে সম্মত হয়েছে।
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এটা থামতে দেখতে চাই। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রাণহানির দিক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা। প্রতি মাসে ২৫ হাজার তরুণ সৈন্য মারা যাচ্ছে। এটা পাগলামি।’
তিনি আরও বলেন, তিনি যুদ্ধবিরতি ‘আরও দীর্ঘায়িত’ হতে দেখতে চান। এদিকে মস্কো বা কিয়েভ, কোনো পক্ষ থেকেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের খবর পাওয়া যায়নি। গত সপ্তাহে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্টোনিও কস্টা বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা এবং ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে কথাবার্তার ‘সম্ভাবনা’ রয়েছে।
ইউরোপীয়দের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তিনি রাজি কি না এমন প্রশ্নে পুতিন বলেন, তার কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হলেন শ্রোডার। পুতিন বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর শ্রোডারই বেশি গ্রহণযোগ্য।’
ইউরোপীয় নেতারা বলে আসছেন, ইউক্রেনে রাশিয়াকে পরাজিত করতেই হবে। তারা পুতিনকে যুদ্ধাপরাধী ও স্বৈরশাসক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং সতর্ক করেছেন, যদি তিনি এই যুদ্ধে জয় পান, তাহলে ভবিষ্যতে ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশেও হামলা চালাতে পারেন। রাশিয়া এসব অভিযোগকে ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। সূত্র: রয়টার্স