প্রায় তিন মাসের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির পথে এগোলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। দুই দেশের আলোচকরা একটি খসড়া মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ) নিয়ে কাজ করছেন, যা যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে চুক্তির ভাষা, বাস্তবায়নের ধাপ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে এখনও গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, প্রস্তাবিত মেমোরেন্ডামে প্রথমে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং সেই সময়ের মধ্যে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও পারমাণবিক সমঝোতার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার প্রশ্নে গুরুত্ব
আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা। গত তিন মাস ধরে প্রণালীতে নৌচলাচল বাধাগ্রস্ত থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালী অবিলম্বে এবং কোনো ধরনের টোল ছাড়াই আন্তর্জাতিক নৌযানের জন্য খুলে দিতে হবে।
ওয়াশিংটনের শর্ত অনুযায়ী, ইরানকে প্রণালীতে পাতা মাইন অপসারণ করতে হবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ শিথিল বা প্রত্যাহার করতে পারে।
তবে ইরান প্রণালীতে নিজেদের সার্বভৌম অধিকার স্বীকার করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে, যা নিয়ে এখনও দর কষাকষি চলছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রধান বিরোধ
মেমোরেন্ডাম স্বাক্ষরিত হলে পরবর্তী ৬০ দিনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পৃথক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো ইরানের কাছে থাকা ৪৪০ কেজির বেশি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ।
ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না। ওয়াশিংটন চাইছে ইউরেনিয়ামের মজুত আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ধ্বংস করা হোক অথবা বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হোক। অন্যদিকে, তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর দীর্ঘমেয়াদি কঠোর বিধিনিষেধ মেনে নিতে অনাগ্রহী।
জব্দকৃত সম্পদ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
ইরান দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে আটকে থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি নিরাপদ ও কার্যকরভাবে চালু না হওয়া পর্যন্ত এসব অর্থ ছাড় করা হবে না।
খসড়া আলোচনায় আরও রয়েছে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়। পারমাণবিক আলোচনায় অগ্রগতি এবং ইরানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে।
লেবানন ও আঞ্চলিক সংঘাতের প্রশ্ন
ইরান চাইছে সম্ভাব্য সমঝোতা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নয়, বরং লেবাননসহ অন্যান্য আঞ্চলিক ফ্রন্টেও যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করুক। তবে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাত কীভাবে এই কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট অবস্থান সামনে আসেনি।
গভীর অবিশ্বাস রয়ে গেছে
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস আলোচনার বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ইরানের অভিযোগ, আলোচনার সময়ও তাদের ওপর সামরিক চাপ ও হামলা অব্যাহত ছিল।
তেহরান বলছে, তারা কেবল কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতির ওপর নয়, বাস্তব পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেবে।
সবশেষ পরিস্থিতি
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, আলোচকরা একটি অস্থায়ী কাঠামো নিয়ে নীতিগতভাবে একমত হলেও এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন বাকি রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও প্রস্তাবিত চুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেননি।
একই সময়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে হরমুজ প্রণালী, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার- এই তিনটি প্রধান ইস্যুতে উভয়পক্ষ কতটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে তার ওপর। সূত্র: সিএনএন
অমিয়/