সোনারগাঁর পানাম নগরের পাশে একটি খাল রয়েছে, নাম পঙ্খিরাজ খাল। খালের মধ্যে মাঝে মাঝে বক-হাঁটা পানি, কোথাও আবার শুকনো মাটি। নানা রকম ঝোপঝাড়ে ভরা। খালটা যে অতীতে লাবণ্যময়ী স্রোতস্বিনী ছিল, তা খালের ওপর সপ্তদশ শতকে নির্মিত মোগল আমলের লালচে ইট-সুরকির পানাম সেতুটি দেখেই বোঝা যায়। নতুন আর একটি সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ সে দৃশ্য দেখে দেখে রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম। আহা! কত সেনা-সামন্তের নৌকা যে একসময় এ খাল দিয়ে যেত! এসব ভাবতে ভাবতেই সেখান থেকে রওনা হলাম আমিনপুর গ্রামে মোগল আমলে নির্মিত আরেকটি প্রাচীন নিদর্শন দেখতে। লোকেরা বলে টাঁকশাল, আদতে ছিল মুদ্রাকুঠি, সেকালের শাসকরা সেখানে স্বর্ণমুদ্রা-রৌপ্যমুদ্রা ইত্যাদি মজুত রাখতেন। দুটি মুদ্রাকুঠিরের একটি ধ্বংস হয়েছে, বাকি স্থাপনাগুলোও জরাজীর্ণ। সেগুলো দেখে ফেরার পথে একটা বড় দিঘির পাড়ে হঠাৎ চোখ পড়ল। ভাঁটফুলের গাছগুলো দিঘির পাড়ে ঝোপ করে রয়েছে। সে ঝোপের ওপর সোনার সুতোর মতো জট পাকিয়ে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে রয়েছে স্বর্ণলতা, যেন তা আলোকলতার সাতনরি হার। পরগাছা এই লতা যে গাছের ওপর জন্মে, সে গাছের মাথা সোনার চেইন বা হারের মতো দ্যুতি ছড়িয়ে আলো করে ফেলে। এ কারণেই এর আরেক নাম আলোকলতা। নজরুলসংগীতে শুনি সে নামটাই, ‘কর্ণে অতসী স্বর্ণ-দুল/ আলোক-লতার সাতনরি।’
কবিদের কাছে আলোকলতা নামের কদর থাকলেও আমরা সবাই ওকে চিনি স্বর্ণলতা নামে। গাছের রং সোনার মতো উজ্জ্বল হলুদ, তাই নাম হয়েছে স্বর্ণলতা। যে গাছের ওপর জন্মে, সে গাছের ডালপালায় এর এত বেশি বিস্তার ঘটে যে গাছের ওপরটা আলোময় করে ফেলে। এ জন্য নাম আলোকলতা। সরু লম্বা সুতার মতো গাছ শূন্যে জন্মে বলে এর স্থানীয় নাম শূন্যলতা বা আলগালতা। আলোকলতার ইংরেজি নাম ডডার (Dodder), উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম কাসকাটা চাইনেনসিস (Cuscuta chinensis) ও গোত্র কনভলভুলেসি। অর্থাৎ এটি মিঠা আলু বা কলমির জাতবোন। চীনে ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে সর্বপ্রথম এ গাছটি সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়। তাই এর প্রজাতিগত নামের শেষটুকু হয়েছে চাইনেনসিস। এ প্রজাতির বাংলা নাম চীনা স্বর্ণলতা। সারা পৃথিবীতে কাসকাটা গণের ২০১টি প্রজাতি রয়েছে, আমাদের দেশেও আছে ছয় প্রজাতির স্বর্ণলতা। চীনা স্বর্ণলতা ছাড়াও এ দেশে দেখা যায় আম্র স্বর্ণলতা, মেঠো স্বর্ণলতা, পাহাড়ি স্বর্ণলতা, হলদে স্বর্ণলতা ও আকাশবেল স্বর্ণলতা বা তরুলতা। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে স্বর্ণলতা ঔষধি উদ্ভিদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে এটি এ দেশে আগ্রাসী আগাছা। কুল, ভাঁট, বামুনহাটি, কলাবতী, আসামলতা, কালকাসুন্দাসহ প্রায় ১০০ প্রজাতির গাছের ওপর স্বর্ণলতা জন্মাতে পারে ও সেসব গাছের ক্ষতি করে।
স্বর্ণলতা একটি পরাশ্রয়ী লতানো উদ্ভিদ, যার প্রায় সবটাই কাণ্ড, পাতা এত সংক্ষিপ্ত যে তা প্রায় চোখেই পড়ে না। দেখা যায়, কেবল সরু-মসৃণ সুতার মতো সোনালি রঙের কাণ্ড, যার মাটির সঙ্গে কোনো সংযোগ নেই অথচ জীবন্ত গাছ হিসেবে বেঁচে থাকে। স্বর্ণলতার বেঁচে থাকার কৌশলটা বেশ অদ্ভুত। যে গাছের ওপর ওরা জন্মে, সে গাছের ডালের মধ্যে ওরা ওদের কাণ্ড থেকে হস্টোরিয়া নামক বিশেষ অঙ্গের মাধ্যমে আশ্রয়দাতা গাছের রস ও পুষ্টি গ্রহণ করে। এটা খেয়েই ওরা বেঁচে থাকে ও বৃদ্ধিলাভ করে। বসন্তে লতায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হলদেটে ফুল ফোটে। ফুল ফোটে ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসে, তবে আরও দুই দফায় ফুল ফোটে। ফুলগুলো এত ক্ষুদ্র যে অনেক সময় তা চোখ এড়িয়ে যায়। ঘন ও আঁটোসাঁটো পুষ্পমঞ্জরিতে গাদাগাদি করে ঘিয়ে-হলদে রঙের ফুল ফোটে। ফুলের পাপড়ি পাঁচটি। ফুলের মাঝখানে চাকতির মতো গর্ভাশয় থাকে, ফুল শেষে ফল হয়, প্রতিটি ফলের মধ্যে তিন-চারটি ক্ষুদ্র বীজ থাকে। এর লতা কোনো গাছের ওপর ছড়িয়ে দিলে সেখানে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে গাছ ছেয়ে ফেলে। একবার কোথাও এ গাছ জন্মালে তাকে সহজে উচ্ছেদ করা যায় না। আর এ গাছ যাকে একবার ধরে, তাকে এর লতা থেকে সহজে ছাড়ানো যায় না। সোনারগাঁর সে সোনার লতাগুলোকে দেখি আর ভাবি, বিজ্ঞানের এই জটিল রহস্য আর স্বর্ণলতার স্বভাব কবি নজরুল কী করে জানতেন? তার শেষ সওগাত কাব্যের টাকাওয়ালা কবিতায় পাই সে বর্ণনা, ‘কোন্ অপরাধে প্রায়শ্চিত্ত করিতে আসিনু কোথা?/ অক্টোপাসের মতো কেন মোরে জড়ালে স্বর্ণলতা?’ পানামের টাঁকশালে এসে স্বর্ণলতাকে দেখে মিলে গেল সেই টাকাওয়ালা কবিতার কথাগুলো।