লোকসভা নির্বাচনের পর কংগ্রেসের ফলাফল মিশ্রিত ছিল—ছয়টি উপনির্বাচনে একা লড়াই শোচনীয় ফল দিয়েছিল, তবে কালীগঞ্জে বামেদের সমর্থনে তুলনামূলক ভালো ফল হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে এবার কংগ্রেস একাই নির্বাচনে অংশ নিতে চাইছে।...

চূড়ান্ত সূচি ঘোষণা না হলেও পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আবহ তৈরি হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি নজর তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির দিকে এবং দুই দলই ইতোমধ্যে নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু করেছে। এ প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক মহলে আলোচনায় রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের কথিত ‘সখ্যতা’ নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ। পাশাপাশি তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির মামলা ঝুলে থাকা এবং কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই আবহেই তৃণমূল–বিজেপি সংঘাত তীব্র হয়েছে এবং নির্বাচনী লড়াইকে তুঙ্গে তুলতে গত সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ সফর করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
কলকাতায় পৌঁছেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যুযুধান পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নিজেদের মধ্যে মারামারি করে লাভ নেই। টিকিট বিলি করার ১০০ শতাংশ দায়িত্ব তার নিজের। তিনি সব খবর রাখেন। যাকে টিকিট দেওয়ার যোগ্য বলে মনে করবেন তাকেই দেওয়া হবে। নিজেদের মধ্যে মন কষাকষি করে কোনো লাভ হবে না।
বৈঠক নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা না হলেও বিজেপি সূত্রে জানা গেছে, আলোচনা হয়েছে নির্বাচনি প্রস্তুতি, রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংগঠনের অবস্থা নিয়ে। এক মাস আগে দেওয়া কাজগুলোর অগ্রগতিও খতিয়ে দেখেন অমিত শাহ। এরপর তিনি উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুরে গিয়ে আনন্দপুরী মাঠে কর্মী সম্মেলন করেন। যেখানে বনগাঁ, বসিরহাট, বারাসত ও ব্যারাকপুর সাংগঠনিক জেলার কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
উত্তরে এবং দক্ষিণে বিজেপির জোড়া কর্মী সম্মেলনে যোগ দিতে পশ্চিমবঙ্গে আসেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কলকাতা পৌঁছে সকালে দক্ষিণবঙ্গের ব্যারাকপুর। বিকেলে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি। দুই কর্মসূচি সেরে দিল্লি ফিরে যান শাহ। তার প্রথম কর্মসূচি ছিল ব্যারাকপুরে। আনন্দপুরী মাঠে কর্মী সম্মেলনের আয়োজন হচ্ছে। বনগাঁ, বসিরহাট, বারাসত এবং ব্যারাকপুর- এই চারটি সাংগঠনিক জেলার বিজেপি কর্মীদের সেখানে ডাকা হয়েছে। গত মাসে কলকাতার জেলা ও মণ্ডলস্তরের কর্মীদের নিয়ে বাইপাস-সংলগ্ন একটি প্রেক্ষাগৃহে শাহের কর্মসূচি আয়োজিত হয়েছিল।
বিজেপির অন্দরে দিলীপ-শুভেন্দু সম্পর্ক বরাবরই ‘মধুর’। লোকসভা ভোটে দিলীপের আসন পরিবর্তন এবং তার পরাজয়ের পর তা মধুরতর হয়েছিল। যা ‘মধুরতম’ হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে দিলীপ সস্ত্রীক দিঘার জগন্নাথ ধাম দর্শনে যাওয়ার পরে। তখন দিলীপ দলের মূলস্রোত থেকে খানিকটা দূরেই ছিলেন বা তাকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি অমিত শাহ কলকাতা সফরে এসে দিলীপকে আবার মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনেন। তখন থেকেই বিজেপির অন্দরে দিলীপ-শুভেন্দু সম্পর্ক নিয়ে জল্পনা নতুন করে শুরু হয়েছিল। শুভেন্দুর দিলীপের প্রিতি ক্রমবর্ধমান সৌজন্য সেই জল্পনা আরও বাড়িয়েছে। নিলীপের সঙ্গে দূরত্ব মিটিয়ে ফেলার কোনো বার্তা কি উচ্চতর নেতৃত্বের কাছ থেকে পেয়েছেন শুভেন্দু? এ প্রশ্নের আনুষ্ঠানিক উত্তর বিজেপির কোনো নেতা দিতে চান না। কারণ, তাতে শুভেন্দু আর দিলীপের মনোমালিন্যের তত্ত্বকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে রাজ্য বিজেপির প্রথম সারির এক নেতা জানাচ্ছেন, তেমন কোনো স্পষ্ট নির্দেশ নেই। তবে কলকাতায় বৈঠক করতে এসে শাহ যখন দিলীপকে ডেকে নিয়েছিলেন, তখনই সর্বত্র বার্তা চলে গিয়েছিল। সবাই বুঝে গিয়েছিলেন, রাজ্যে যারা দলের প্রথম সারির মুখ, তাদের প্রত্যেককেই আপাতত পারস্পরিক সম্মান রেখে চলতে হবে।
অন্যদিকে তৃণমূল মহলে এক মাসের ব্যবধানে দু-দুবার হয়েছে দলীয় বৈঠক। প্রথমে রাজ্যের সব বিএলএদের নিয়ে আলোচনায় বসলেও, সর্বশেষ আলোচনাটা হয়েছে রুদ্ধদ্বার। প্রথম বৈঠকেই কাউন্সিলর ও বিএলএদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন মমতা। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিগত অসংগতি দেখিয়ে যাদের ডাকা হয়েছে, সেই ভোটারদের তালিকা চেয়েছেন তিনি। বর্তমানে এসআইআর শুনানিতে ডাকা প্রায় প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই শব্দবন্ধনী ব্যবহার করছে নির্বাচন কমিশন। তাই তৃণমূল সুপ্রিমো বুঝিয়ে দিয়েছেন, অল্পবিস্তর ভুলে যাদের নাম বাদ পড়ছে, শুনানিতে ডাকা হচ্ছে, শুধু তাদের তালিকাই প্রদান করতে হবে বিএলএদের। একুশের নির্বাচনে ভবানীপুরের ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডে সব থেকে বেশি লিড পেয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। নন্দীগ্রামের ঘটনার পর মান রক্ষা করেছিল ভবানীপুর। রাজনৈতিক মহল বলে, ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডের লিডেই ভর করে আবার ক্ষমতার শীর্ষে বসেছিলেন তিনি। আবার নির্বাচন এসেছে। ভোটমুখী বাংলায় এখন ‘হট টপিক’ এসআইআর। কিন্তু এ ভোটার তালিকার পরিমার্জনের কাজ মিটে গেলে তৃণমূল আর ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডে লিড পাবে না, এমনটাই দাবি করেছিলেন রাজ্যে বিরোধী দলনেতা। এসআইআর শুরুর আগে শুভেন্দু বলেছিলেন, ‘ভবানীপুর তৃণমূলের জন্য নিরাপদ আসন ছিল না, আজও নেই। কারণ ভবানীপুরে সংখ্যালঘু আসন মাত্র ২০ শতাংশ। তাও চেতলার ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডের ১৭ হাজার ভোট লিড নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিতেছেন। এসআইআর-এ বাংলাদেশি সংখ্যালঘুদের নাম বাদ যাওয়ার পর ওই আসনেও লিড পাবেন না।’ আজ এসআইআর যখন একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে, তৃণমূল সুপ্রিমোর নজরও সেই ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডে। শুক্রবার বিএলএদের নিয়ে আয়োজিত বৈঠকে মমতা অভিযোগ তুলেছেন কারচুপির। তার কথায়, ’৭৭ নম্বর ওয়ার্ডে ইচ্ছাকৃতভাবে বহু ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।’ তাই কাউন্সিলর ও বিএলএদের এই মর্মে সতর্ক থাকতে বলেছেন তিনি।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ওই লোকসভা নির্বাচনে ভবানীপুর কেন্দ্রের আটটি করপোরেশন ওয়ার্ডের মধ্যে পাঁচটিতেই জিতেছিলেন বিজেপি প্রার্থী দেবশ্রী চৌধুরী। আর মাত্র তিনটি ওয়ার্ডে এগিয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী মালা রায়। ভবানীপুরে মালা রায় পেয়েছিলেন মোট ৬২,৬৪১ ভোট। অন্যদিকে দেবশ্রী চৌধুরী পেয়েছিলেন ৫৪,১৯৪ ভোট। অর্থাৎ ভোটের ব্যবধান কমে এসেছিল মাত্র ৮,২৯৭-এ। এ কেন্দ্রে লোকসভা নির্বাচনে বামপ্রার্থী সায়রা হালিম পেয়েছিলেন ১৩ শতাংশ ভোট। সেই ভোটের কিছুটা বিজেপির দিকে সুইং করলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবানীপুরে জেতার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে এ কেন্দ্র থেকে ৫৭.৭১ শতাংশ ভোট পেয়ে শোভন দেব চট্টোপাধ্যায় জয়ী হয়েছিলেন। নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ কেন্দ্র থেকে উপনির্বাচনে দাঁড়ান। সেবার তিনি ২০ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু তার আগে ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু মমতার ভোটভাগ্য মোটেই ভালো ছিল না। সেবার তিনি বিজেপি ও বামেদের ভোট কাটাকাটিতে জিতে গিয়েছিলেন। পেয়েছিলেন মাত্র ৪৭.৬৭ শতাংশ ভোট। কংগ্রেসের দীপা দাশমুন্সী পেয়েছিলেন ২৯.২৬ শতাংশ। আর বিজেপির চন্দ্র বোস পেয়েছিলেন ১৯.১৩ শতাংশ ভোট। বোঝাই যাচ্ছে বিরোধীদের মোট ভোটের নিরিখে ২০১৬ সালে মমতা নিজের কেন্দ্রে পিছিয়ে পড়েছিলেন।
গত লোকসভা নির্বাচনের পর কংগ্রেসের ফলাফল মিশ্রিত ছিল—ছয়টি উপনির্বাচনে একা লড়াই শোচনীয় ফল দিয়েছিল, তবে কালীগঞ্জে বামেদের সমর্থনে তুলনামূলক ভালো ফল হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে এবার কংগ্রেস একাই নির্বাচনে অংশ নিতে চাইছে। প্রদেশ সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের নীতি অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের এক শীর্ষনেতাকে বহু কোটি টাকা অফার করে বামেদের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। প্রাক্তন সভাপতি অধীর চৌধুরী বিষয়টি জানতেন, কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের (রাহুল গান্ধী) থেকে সাড়া না পেয়ে ধরে নিয়েছেন যে রাজ্যের কংগ্রেস শীর্ষনেতা তৃণমূলের নির্দেশ মেনে চলবেন।
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম কংগ্রেসের জোট-নীতি নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতার অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, অধীর চৌধুরীর সময় বামফ্রন্টের সঙ্গে আসন সমঝোতা হলেও বর্তমান সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের অবস্থান স্পষ্ট নয় এবং তিনি এআইসিসির নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন। কংগ্রেসকে ঠিক করতে হবে তারা বিজেপি, তৃণমূল না বামেদের সঙ্গে যাবে—এমন মন্তব্যও করেন সেলিম। তিনি জানান, বামফ্রন্টের শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত এবং শিগগিরই তা ঘোষণা হবে। বামেদের প্রথম অগ্রাধিকার ফ্রন্টের ঐক্য; এরপর বিজেপি ও তৃণমূলবিরোধী অন্যান্য শক্তির সঙ্গে আলোচনা হবে। তবে সেলিম স্পষ্ট করে দেন, শুধু কথা বলাই যথেষ্ট নয়—টেকসই লড়াইয়ের মানসিকতা থাকতে হবে।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক



